বাক্যের শেষে দাঁড়ি বসানো ঈশ্বরের কাজ: লাসলো ক্রাসনাহোরকাই

বাক্যের শেষে দাঁড়ি বসানো ঈশ্বরের কাজ: লাসলো ক্রাসনাহোরকাই

সাহিত্যে নোবেলজয়ী লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই হাঙ্গেরির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রোমানিয়া সীমান্তবর্তী ছোটো শহর গিউলায় ১৯৫৪ সালের ৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পাঁচটি উপন্যাস এবং বেশকিছু ছোটোগল্প ও প্রবন্ধ লিখেছেন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে: ২০১৫ সালে ম্যান বুকার, ২০১৩ সালে সেরা অনূদিত বই এবং ১৯৯৩ সালে জার্মান বেস্টেনলিস্ট পুরস্কার।

তার প্রথম উপন্যাস ‘সাটানটাঙ্গো’(১৯৮৫)-তে কমিউনিস্ট ব্যবস্থার পতনের ঠিক আগে হাঙ্গেরির গ্রামাঞ্চলে একটি পরিত্যক্ত সমবায় খামারের দুর্দশাগ্রস্ত বাসিন্দাদের একটি গোষ্ঠীকে শক্তিশালী ব্যঞ্জনার মাধ্যমে চিত্রিত করা হয়েছে। চলচ্চিত্র পরিচালক বেলা টারের সহযোগিতায় ১৯৯৪ সালে উপন্যাসটি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। ইউরোপিয় বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য আর বুদ্ধের দর্শনের মিশ্রণে সৃষ্ট তার লেখাপত্র তাকে এনে দিয়েছে ‘হাঙ্গেরির সন্ত’পরিচয়। পাতার পর পাতা অসমাপ্ত বাক্য দিয়ে গল্প টেনে নিয়ে যাওয়া তার সিগনেচার স্টাইল। দা প্যারিস রিভিউ, দা ইয়েল রিভিউ, লিটারেচার অ্যাক্রস ফ্রন্টিয়ার্স, দা হোয়াইট রিভিউ ও অ্যাসিম্পটোট জার্নালে দেয়া তার সাক্ষাৎকারগুলোর চুম্বক অংশ সংকলন ও অনুবাদ করা হয়েছে।             প্রশ্ন: আপনার লেখক জীবনের শুরুর দিনগুলি স্মরণ করে আলাপ শুরু করা যাক।লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: ষাটের দশকের শেষ এবং সত্তর দশকের শুরুর কথা, সত্যি বলতে আমি লেখক হতে চাইনি। চেয়েছিলাম শুধু একটি বই লিখেই ভিন্ন কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তে। বিশেষত সংগীত নিয়ে কিছু করার ইচ্ছা ছিল আমার। সব সময় দরিদ্র মানুষের সাথেই থাকতে চেয়েছি। বাস করেছি খুবই দরিদ্র এক গ্রামে। চাকরির বাজার ছিল খারাপ। প্রতি ৩-৪ মাস অন্তর অন্তর স্থান পরিবর্তন করা লাগত বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে পালানোর জন্য। সে অর্থে আমি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলাম না। ছোট গ্রামে, অপরিচিত শহরে বাস করেছি এবং বসে বসে নিজের প্রথম উপন্যাসটি লিখেছি।

প্রশ্ন: সেই প্রথম লেখা প্রকাশ করেছিলেন কীভাবে?  লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: ১৯৮৫ সালের ঘটনা ওটা। আমার এখনো মাথায় ধরে না যে কীভাবে আমার প্রথম উপন্যাস Satantango প্রকাশিত হলো। কেন না, আমাদের দেশের কমিউনিস্ট রেজিমের জন্য সেটা কোনো সহজপাচ্য উপন্যাস ছিল না। তবে, বইটা শেষমেষ বের হলো তৎকালীন এক প্রকাশনা সংস্থার প্রধানের বদান্যতায়, যে একদা গোপন পুলিশের প্রধান ছিলেন, প্রমাণ করতে চাইছিলেন, তার এখনো এতটুকু ক্ষমতা আছে যে, এই ধরনের একটি উপন্যাস তিনি প্রকাশ করতে পারেন।   

প্রশ্ন: তখন আপনার জীবিকা নির্বাহের উপায় কী ছিল? লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: কিছুদিন খনি শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছিলাম। তা ছিল খুব হাস্যকর এক অভিজ্ঞতা, কাজ কিছুই পারতাম না, অন্যান্য শ্রমিক বন্ধুরা আমার অজ্ঞতা ঢেকেঢুকে রাখত। তার বাইরে একবার কয়েক মাস শ’খানেক গরুর রাত্রিকালীন দেখভালের জন্য নৈশপ্রহরী হিসেবেও কাজ করেছি। সবচেয়ে সুন্দর কাজের অভিজ্ঞতা ছিল, বুদাপেস্ট শহর থেকে দূরে বিবিধ গ্রামে নির্মিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে কাজ করা। গ্রামের ওই লাইব্রেরিই ছিল গ্রামের বাসিন্দাদের বিনোদনের একমাত্র খোরাক। প্রতি শুক্রবার কিংবা শনিবার ওই কেন্দ্রে সংগীত সন্ধ্যার আয়োজন করা হতো। তরুণদের জন্য তা ছিল দারুণ উপভোগের সময়। এসব করতে করতে আমার মদ্যপানের অভ্যাস জেঁকে বসেছিল। হাঙ্গেরিয়ান সাহিত্যে একটি কথার প্রচলন ছিল যে প্রকৃত প্রতিভাধররা পুরোপুরি মাতাল। ফাঁকেতালে আমিও হদ্দ মাতাল হয়ে পড়েছিলাম। তারপর, আমাদের সামনেই আমাদের সময়ের হাঙ্গেরির সবচেয়ে বড়ো ক্রেইজ পিটার হাজনকজি মারা গেলেন মাত্র ৪০ বছর বয়সে। তারও উড়নচণ্ডী মদ্যপ জীবন ছিল। আমি ততদিনে লেখালেখির গভীর অন্তর্মুখী অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। আমি বাজি ধরে মদ্যপান ছেড়ে দিলাম।

প্রশ্ন: আপনার পড়ার অভ্যাসের ব্যাপারে কিছু বলুন। কাফকার মতো ক্ল্যাসিক লেখকদের বাইরে আপনি আর কী পড়েন?লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: যখন আমি কাফকা পড়ি না, তখন আমি কফকা নিয়েই ভাবি। যখন কাফকা নিয়ে ভাবি না, তখন কাফকা নিয়ে চিন্তাভাবনার অভাব বোধ করি। কিছুদিন এই অবস্থার ধারাবাহিকতা চললে পরে আবার একটা কাফকার বই নিয়ে বসে যাই। এভাবেই চলতে থাকে।একই নিয়ম খাটে হোমার, দান্তে, দস্তয়েভস্কি, প্রুস্ট, এজরা পাউন্ড, বেকেট–েএদের লেখাপত্রের ব্যাপারেও।

প্রশ্ন: আপনার সৃজনশীলতার প্রক্রিয়া জানতে চাই। জানতে চাই আপনার লেখালেখির অভ্যাস নিয়ে।লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমি কোনো ডেস্কে বা ল্যাপটপের সামনে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে লেখার অপেক্ষায় থাকি না। আমি বরং সার্বক্ষণিক কাজ করতে থাকি মস্তিষ্কের ভেতরে। বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতটা হলো, যখন আমি লেখা শুরু করি, তখন খুবই কঠিন পরিস্থিতিতে ছিলাম। একা থাকতে পারতাম না, লেখার জন্য আলাদা কোনো ডেস্কও ছিল না। তাই আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম বাক্যগুলো মস্তিষ্কের ভেতর লিখতে।এভাবে আমি এখনো মস্তিষ্কের ভেতর কাজ করতে থাকি—সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত জায়গায়, অপ্রত্যাশিত সময়ে; অর্থাৎ, আমি সর্বদা লেখার মধ্যেই থাকি। একবার লিখে ফেলার পর আমি সেটা সাধারণত আর অত সংশোধন করি না, কারণ সেই কাজ আমি ইতোমধ্যেই মস্তিষ্কে করে ফেলেছি।

প্রশ্ন: লেখার জন্য কোনো অনুপ্রেরণার প্রয়োজন হয় আপনার?লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমি দরজা জানালা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিয়ে কাজ করি। লেখার সময় শুধুই লেখা। তখন প্রকৃতি দেখার আনন্দ বা নারীর সৌন্দর্য উপভোগ করা চলবে না। মনকে লেখার দিকে ধাবিত করতে আমার কোনো প্রেরণার প্রয়োজন হয় না।

প্রশ্ন: বিশাল, বিস্তৃত বাক্যে লেখা আপনার সিগনেচার স্টাইল। এটা আপনি তৈরি করলেন কীভাবে?লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: কাজটা আমার জন্য কঠিন হয়নি, কারণ আমি কখনো সচেতনভাবে তাতে প্রবেশই করিনি। আমি বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করতাম। আমার বন্ধুভাগ্য মন্দ ছিল না, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যেত একসময়ে একজন বন্ধুর সঙ্গেই সময় কাটাতাম। তখন আমাদের একে অপরের সঙ্গে আলাপ হতো দীর্ঘ মনোলগে। একদিন, এক রাতে হয়ত আমিই কথা বলতাম। আর পরের দিন বা রাতে আমার সে বন্ধুই শুধু কথা বলত। এভাবেই আমার এই লেখার স্টাইল তৈরি। এটা কোনো সচেতনভাবে বেছে নেয়া প্রক্রিয়া না। বরং এই ধরনের ছন্দে-সুরে বাক্যে রচনার স্টাইলটা আসলে অন্যকে বোঝানোর ইচ্ছা থেকেই এসেছে।

প্রশ্ন: আপনার এই সিদ্ধান্ত তবে অন্য লেখকদের শৈলী দ্বারা অনুপ্রাণিত নয়, যেমন প্রুস্ত বা বেকেট?লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমি যখন কিশোর ছিলাম, তখন পছন্দের লেখকদের ভাষা বা শৈলীর অনুকরণের বদলে তাদের জীবনযাপন অনুকরণের অনুপ্রেরণা বেশি কাজ করত। কাফকার সঙ্গে আমার বিশেষ একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, কারণ আমি তাকে খুব কম বয়সে পড়া শুরু করেছিলাম। তখন আমি এতটাই তরুণ যে, তার The Castle-এর প্লট আমার মাথার উপর দিয়ে চলে গিয়েছিল। আমার একজন বড়ো ভাই ছিল, আমি তাকে অনুকরণ করতে গিয়েই তার বই চুরি করে পড়া আরম্ভ করি, আর এ করতে গিয়েই কাফকাকে আবিষ্কার করি।এবং সম্ভবত এজন্যই আমি আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা করেছি—কাফকার মতো হতে। আইন ছাড়া আমি অপরাধ মনোবিজ্ঞানের প্রতিও টান অনুভব করতাম আমার অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার জন্য, তবে সত্তর দশকের শুরুতে, এই বিষয়টি হাঙ্গেরিতে নিষিদ্ধ ছিল। এটি পশ্চিমা জ্ঞান—ঠিক এ জন্যই সেটা কমিউনিস্ট দেশে সন্দেহজনক। অবশ্য আইনে পড়াশোনার যন্ত্রণাও আমি তিন সপ্তাহের বেশি নিতে পারিনি। তারপর আমি ছেড়ে যাই—শুধু আইন বিভাগ নয়, পুরো শহরটাকেও।

প্রশ্ন: বার্লিনে এসে থিতু হলেন কেন?লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: ১৯৮৭ সালে আমি প্রথমবারের মতো এই শহরে দীর্ঘ সময় কাটাই। তখন থেকেই বার্লিনের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তখনকার পশ্চিম বার্লিনকে মনে হয়েছিল পৃথিবীর সমস্ত ক্ষতবিক্ষত আত্মার নীড়। সবধরণের শিল্পী এবং শিল্পীযশপ্রার্থীরা সে সময় এসে ভিড় জমাতেন বার্লিনে। আমার সত্যিই ভালো লাগত এই শহরে প্রায়ই মহান শিল্পীদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে আড্ডা দেয়ার এবং তাদের এক বর্ধিত পরিবারের অংশে পরিণত হওয়ার সুযোগ পেয়ে।

প্রশ্ন: আপনার উপন্যাসগুলোতো একে অপরের থেকে অনেক আলাদা—শৈলী, গঠন, বিষয়বস্তু—সব দিক থেকেই।লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: ঠিক তাই, একদম তাই। আমার উপন্যাস বা ছোটগল্পগুলোয়—আমি যে ভাষা ব্যবহার করি, সে ভাষা ভিন্ন কিছু নিয়ে কথা বলার নিমিত্তে তৈরি ভিন্ন এক ভাষা।

প্রশ্ন: আপনি কি আপনার ছোটোগল্পগুলো ইউরোপীয় ধারার অনুসরণে লেখেন?লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: না, আমার ছোটোগল্পগুলো ইউরোপীয় ধারার নয়—ওগুলো আমার নিজস্ব ধারার। আমি যেভাবে লিখি, সেটাই আস্তে আস্তে এক ধরনের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে—আমার নিজের ঐতিহ্য।

প্রশ্ন: আপনিতো বেলা টারের সঙ্গে চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন। [যারা এখনো Werckmeister Harmonies দেখেননি—যেটা ক্রাসনাহোরকাইয়ের উপন্যাস The Melancholy of Resistance-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি—তাদের আমি দৃঢ়ভাবে পরামর্শ দেব এটা দেখতে।]ক্রাসনাহোরকাই: ওটা আলাদা এক অভিজ্ঞতা। সিনেমাগুলি আমার বই থেকেই তৈরি হয়, কিন্তু আমি কোনো চিত্রনাট্যকার নই। আমি বেলাকে কেবল দর্শনভিত্তিক প্রেক্ষাপটটা ব্যাখ্যা করি—আমরা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত সেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করি। ওখান থেকেই বেলার সিনেমার জন্ম হয়। এটাই আমাদের কাজের ধরন। আমি কখনোই চাই না আমার বইয়ের ‘সাহিত্যিক রূপান্তর’ হোক—কারণ আমার কাছে সেটা একদম অপ্রয়োজনীয়। আমার বইয়ের কোনো ভিন্ন ফরম্যাটে অভিযোজিত হবার দরকার নেই। তবে, বেলা টারের যে একটা প্রবল ইচ্ছা বা নেশা আছে—আমার কাজগুলোকে সিনেমায় রূপ দিতে চান তিনি, এটা সুন্দর। আমারও তখন লক্ষ্য থাকে তাঁর কল্পনাশক্তিকে সহায়তা করা।

প্রশ্ন: আপনার বই নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আপনি কী মনে করেন, লেখা অনুবাদ হওয়ার সুবিধা–অসুবিধা, বা বিপদ কী কী?লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: সুবিধা বা অসুবিধার বিষয়ে আমি কিছু বলব না। তবে বিপদের বিষয়ে বলতে পারি—কারণ আমার মতে, আসলে কোনো বিপদ নেই। অনূদিত কাজটি কোনোভাবেই মূল কাজের অনুরূপ হয় না। এটা ভাবা একেবারেই অযৌক্তিক হবে যে, অনুবাদ মূল কাজের সমতুল্য। অনূদিত কাজ হলো অনুবাদকের কাজ, লেখকের নয়। লেখকের কাজ হলো মূল ভাষায় গল্পটি বলা। অনূবাদকের কাজ হলো নতুন এক সৃষ্টির নিশ্চয়তা অনুবাদকের ভাষাতেই। অনুবাদকই এর স্রষ্টা। এটি মূল কাজের সঙ্গে কিছুটা মিল রাখে—যেমন পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সাথে কিছুটা মিল রাখে। লেখক তা পড়ে দেখেন—অনুবাদ ভালো লাগলে খুশি হন, খারাপ হলে রেগে যান। আমি আমার বইয়ের অনুবাদ নিয়ে একবারই রেগেছি— আমার বই WAR AND WAR-এর জার্মান অনুবাদের জন্য। সেটি একটি খারাপ বই হয়ে গিয়েছিল, যা মেরামত করা প্রায় অসম্ভব ছিল। নতুন অনুবাদ করা আর সম্ভব ছিল না। এই একটা অভিজ্ঞতা ছাড়া আমার লেখাপত্রের সব অনুবাদ আমাকে বিস্ময়ে ভরিয়ে দিয়েছে। আমার অসাধারণ অনুবাদকরা আছেন।

প্রশ্ন: আপনার বইগুলিতে বারবার ব্যবহৃত এক মোটিফ হলো আগমন, যা প্রায়ই প্রত্যাবর্তন বা গৃহপ্রত্যাবর্তনের ধারণার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আমি বিশেষভাবে আগ্রহী গৃহপ্রত্যাবর্তনের ধারণায়, আপনি মনে করেন আপনার কতটি ‘বাড়ি’ আছে এবং সেই সম্পর্কে আপনার অনুভূতি কেমন?লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমি মনে করতে পারি না, শৈশবের পর থেকে কোনো জায়গায় আমি কখনো ‘বাড়ি’ বোধ করেছি। হয়ত কিছু ভাগ্যবান মানুষ আছে যারা প্রায় যেকোনো জায়গায় নিজেদের ঘরে তা বোধ করতে পারে। আমি তাদের মধ্যে নই। কিন্তু আমি এটাও উপলব্ধি করি যে কোনো জায়গায় ঘরে থাকার মতো বোধ করার অনুভূতিকে—সহজে অবহেলা করা উচিত নয়।  তবে এটা স্পষ্ট যে, এই অনুরাগের সঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। তাই, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যে জানে সে কোথাও ‘বাড়ি’ বোধ করতে পারছে না—তবুও সে কোনো এক বাড়িতে শেষপর্যন্ত ফিরে আসে বা ফিরে আসার ইচ্ছে রাখে। হতে পারে তার সে বাড়ি এক শুষ্ক গাছের তনু, অথবা এমন একটি কামরা যা আর কোথাও নেই, অথবা অতীতের মেঘের আড়াল।

প্রশ্ন: আপনার বইগুলির সচেতন পাঠে মনে হয়, আপনার সব বইতেই পৃথিবীর অ্যাপোকিলিপ্স হাজির, অর্থাৎ পরিসমাপ্তি এসে হাজির হয়েছে। উপন্যাস লেখকেরা সে অর্থে দুই প্রকার হয়। কেউ কেউ প্রতিটি উপন্যাসকে আলাদা একটি শিল্পকর্মের নিরিখে দেখে, আবার কেউ কেউ মনে করে তারা সারাজীবন ধরে মূলত একটাই উপন্যাস লিখেছেন, যে সব উপন্যাস একসাথে মিলে যায়।লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: আমি হাজার বার বলেছি যে আমি সব সময় শুধু একটি বই লিখতে চেয়েছিলাম। প্রথমটি আমাকে সন্তুষ্ট করেনি, এ কারণেই আমি দ্বিতীয়টি লিখলাম। দ্বিতীয়টিও আমাকে সন্তুষ্ট করেনি, তাই আমি তৃতীয়টি লিখলাম, এরকম চলল। আমি সত্যিই হয়ত আমার গোটা জীবনে শুধু একটি বই লিখেছি।

প্রশ্ন: আপনি কি কখনো এমন কিছু লিখতে চান যা এই সকল বর্ণনা, থিম, করণকৌশলের সম্পূর্ণ বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন?লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: না। যদি Johann Sebastian Bach এর মতো গ্রেট সংগীতজ্ঞ সারাজীবন অপরিবর্তিত থাকেন, তবে আমার আর আপত্তি করার কী আছে?

Comments

0 total

Be the first to comment.

কিরণ দেশাইয়ের সাক্ষাৎকার BanglaTribune | সাক্ষাৎকার

কিরণ দেশাইয়ের সাক্ষাৎকার

বুকার প্রাইজ ২০২৫ এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া 'দ্য লনলিনেস অব সোনিয়া অ্যান্ড সানি' উপন্যাসের লে...

Nov 03, 2025

More from this User

View all posts by admin