মালয়েশিয়ায় মানবপাচার এবং ১ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর সাবেক সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইনের (তসলিম) প্রতিষ্ঠান শাহীন ট্রাভেলসহ ১৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের বিরুদ্ধে ১৩টি নিয়মিত মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রবিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকালে দুদকের উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য জানান। এর আগে গত ১১ মার্চ ১২ এজেন্সির বিরুদ্ধে ১২টি মামলা দায়ের করেছিল দুদক।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো হচ্ছে- আকাশ ভ্রমণ, উইনার ওভারসিজ লিমিটেড, শাহীন ট্রাভেলস, নাভিরা লিমিটেড, আদিব এয়ার ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস, ইউনাইটেড ম্যানপাওয়ার কনসালটেন্স লিমিটেড, গ্রীনল্যান্ড ওভারসিজ, পিআর ওভারসিজ, জাহারত অ্যাসোসিয়েট লিমিটেড, অপূর্ব রিক্রুটিং এজেন্সি, মেসার্স জান্নাত ওভারসিজ, মিডওয়ে ওভারসিজ এবং সাউথ পয়েন্ট ওভারসিজ লিমিটেড।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আকতারুল ইসলাম জানান, ১৩টি ওভারসিজ কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালকসহ অন্য আসামিরা বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের সময় সিন্ডিকেট করে বায়রার রেজিস্ট্রেশনের শর্ত ভঙ্গ করেছেন। সে কারণে এই ১৩ প্রতিষ্ঠানের ৩১ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলার অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের এই কর্মকর্তা আরও জানান, আসামিরা বিভিন্নভাবে সরকারি দলের প্রভাব খাটিয়ে সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার ৫ গুণ বেশি টাকা নেন শ্রমিকদের কাছ থেকে। তারা মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পাদিত চুক্তির আওতায় শ্রমিক রিক্রুটের জন্য এজেন্ট হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে মালয়েশিয়ায় চাকরির নির্দিষ্ট প্রস্তাবের বিপরীত শ্রমিক পাঠানোর জন্য নির্ধারিত বাছাই ও অর্থ-সংশ্লিষ্ট শর্ত এড়িয়ে জনশক্তি ও শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেন। তারা পরস্পর যোগসাজশে রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতি অনুগ্রহ দেখিয়ে ও রিক্রুটেড শ্রমিকদের অবৈধভাবে ক্ষতিসাধন করে চুক্তির বাইরে বিভিন্ন ধাপে বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নেন।
আসামিরা চুক্তিবদ্ধ আইনসঙ্গত পারিশ্রমিক ছাড়া অবৈধ পারিতোষিক সুবিধা ও অবৈধ অর্থ গ্রহণ করেন। তাছাড়া চুক্তিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড করা ও চুক্তি মোতাবেক করণীয় কাজ থেকে বিরত থাকার পুরস্কার হিসেবে বায়রার প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে সরকারি দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার সুবিধা ব্যবহার করে অবৈধ পারিতোষিক গ্রহণ করেন। অবৈধভাবে নেওয়া অর্থ অবৈধভাবে হস্তান্তর, স্থানান্তর, রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করেন। পরস্পর যোগসাজশে সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে ৫ গুণ অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ করে মালয়েশিয়ায় পাঠানো কর্মীর কাছ থেকে পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রতি কর্মীর কাছ থেকে নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত টাকা নেন। এতে তারা সর্বমোট ১ হাজার ১৫৯ কোটি ৮২ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাৎ করেন।
১৩ মামলায় যাদের আসামি করা হচ্ছে তারা হলেন, আকাশ ভ্রমণ ওভারসিজের মালিক মনসুর আহমেদ কালাম, উইনার ওভারসিজের মালিক মাহফুজুল হক ও রহিমা হক, শাহীন ট্রাভেলসের মালিক ও হাবের সাবেক সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন (তসলিম), নাভিরা লিমিটেডের এমডি শেখ মোহাম্মদ শাহিদুর রহমান, মাহবুবুর রহমান ও মো. শামীম হাসান, আদীব এয়ার ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের মালিক মো. কে এম মোবারক উল্লাহ, মো. আবুল কালাম আজাদ, নওশাদ আরা আক্তার, হাছনা আক্তার আজাদ, ইউনাইটেড ম্যানপাওয়ার কনসালটেন্স লিমিটেডের মালিক জেড ইউ সায়েদ, নাজমা আক্তার, জুহানা সুবাইতা ও জিসান সায়েদ। গ্রীনল্যান্ড ওভারসিজের রেহানা আরজুমান হাই, পি আর ওভারসিজ লিমিটেডের এমডি গোলাম রাকিব ও ইমান আকতার পুনম। জাহারাত অ্যাসোসিয়েট লিমিটেডের মুহাম্মদ শফিকুল আলম (ফিরোজ), নাহিদা আক্তার, রওশন আরা পারভিন ও একেএম মোশারফ হোসেন। অপূর্ব রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক মহিউদ্দিন আহমেদ, মেসার্স জান্নাত ওভারসিজের মালিক লিমা বেগম, মিডওয়ে ওভারসিজ লিমিটেডের এমডি মোহাম্মদ রফিকুল হালদার ভূঁইয়া ও কাজী অদিতি রুবাইয়াত এবং সাউথ পয়েন্ট ওভারসিজ লিমিটেডের এমডি মঞ্জুর কাদের, সাদিয়া মঞ্জুর, আহমেদ আতাউর রহমান, আহমেদ খালেদ লুবনানী ও আহমেদ ফয়সাল রমাদানী।
এর আগে গত ১১ মার্চ মালয়েশিয়ায় মানবপাচার ও ১ হাজার ১২৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও তার পরিবারের সদস্য, ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদউদ্দিন চৌধুরী এবং সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদের প্রতিষ্ঠানসহ ১২টি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
এ পর্যন্ত ২৫টি ওভারসিজের ৬৪ জনের বিরুদ্ধে ২৫টি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। তাদের বিরুদ্ধে সর্বমোট দুই হাজার ২৮৮ কোটি ৪৩ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।