গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের নাম কে না জানে! বিখ্যাত এই গিনেস বুকে নাম ওঠানো অনেকের কাছেই স্বপ্ন। তবে এই গিনেস আসলে একজন বিখ্যাত ব্যক্তির পদবি, তাঁর পুরো নাম আর্থার গিনেস। যাঁর হাত ধরে শুরু হয়েছিল গিনেস নামের বিখ্যাত এক বিয়ার ব্যান্ড। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে সেই সময় বসবাসকারী এই গিনেস পরিবারের কাহিনিও কম রোমাঞ্চকর নয়। এই পরিবারের রয়েছে প্রজন্ম ধরে চলে আসা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যা প্রভাব রেখেছে আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসেও। আলোচিত গিনেস পরিবারের সংগ্রাম, সাফল্য আর দ্বন্দ্বকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নেটফ্লিক্সের নতুন সিরিজ ‘হাউস অব গিনেস’; আট পর্বের সিরিজটি মুক্তি পেয়েছে গতকাল রাতেই! সিরিজটি পরিচালনা করেছেন ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’, ‘এসএএস রৌগ হিরোস’ নির্মাতা স্টিভেন নাইট।
অ্যান্থনি বয়েল, লুয়ি পারট্রেজ, এমিলি ফেয়ার্ন, ফিয়ন ও’শে ও জেমস নর্টন অভিনীত এই সিরিজে দেখানো হয়েছে কীভাবে পিতার উইল তাঁদের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। সেই সময়ের রাজনীতি ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে তাঁদের ভবিষ্যৎকে গড়ে তুলেছিল। নাইটের কাজ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন, বাস্তব আর কল্পনাকে মিশিয়ে গল্প বলায় তাঁর জুড়ি নেই। তবে ‘হাউস অব গিনেস’–এর গল্প কতটা সত্যি?
সিরিজের পটভূমিগিনেস পরিবারের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় আর্থার গিনেসের (জন্ম ১৭২৫) হাতে, যিনি প্রথম তৈরি করেছিলেন বিখ্যাত গাঢ় স্টাউট বিয়ার। আজও প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে ১ কোটির বেশি গ্লাস বিক্রি হয় এই পানীয়র। সিরিজটি শুরু হয়েছে ১৮৬৮ সালে, প্রতিষ্ঠাতার নাতি বেঞ্জামিন গিনেসের মৃত্যুর পর থেকে। চার সন্তানকে রেখে মারা যান তিনি। তখনই শুরু হয় উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব—বিশাল সম্পত্তি ও দায়িত্ব একসঙ্গে কাঁধে নিতে হয় তরুণ উত্তরাধিকারীদের।
কতটা সত্যসিরিজটি এগিয়েছে গিনেস ভাইবোনকে কেন্দ্র করে—আর্থার, এডওয়ার্ড, অ্যান ও বেনজামিন। সিরিজের মতো বাস্তবেও গিনেস পরিবারে চার ভাই–বোনই ছিলেন। গিনেসের বড় ছেলে আর্থার আশা করেছিলেন পুরো বিয়ার তৈরি করার কারখানা তিনিই পাবেন, কিন্তু তাঁর বাবার উইল অনুযায়ী তাঁকে ছোট ভাই এডওয়ার্ডের সঙ্গে তা ভাগাভাগি করতে হয়। রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই সিরিজে উঠে এসেছে। যেমন ফেনিয়ান নামে আইরিশ বিপ্লবীরা সত্যিই গিনেস ব্যবসার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।
শুধু তারা নয়, যেসব পার্শ্বচরিত্র এই সিরিজে দেখানো হয়েছে, তাদের অনেকেই বাস্তবে ছিলেন। তবে সিরিজটিতে কিছু নাটকীয় সংযোজনও আছে। সে কথা স্টিভেন নাইট নিজেই স্বীকার করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রধান ঘটনাগুলো বাস্তব, কিন্তু চরিত্রগুলোর ভেতরের দ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্তের সূক্ষ্ম দিকগুলো তৈরি করতে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে।’ সিরিজটিতে উনিশ শতকের ডাবলিন ও নিউইয়র্ক শহরকে দেখানো হয়েছে।
যেভাবে তৈরি হয় সিরিজটিসত্যিকারে গিনেস উত্তরাধিকারী ইভানা লোওয়েলের কাছ থেকে সিরিজটির আইডিয়া এসেছে। তিনি নাইটের সঙ্গে কাজ করেছেন তাঁর পূর্বপুরুষদের গল্প নতুনভাবে বলার জন্য। ইভানা লোয়েল ছিলেন আয়ারল্যান্ডে, পারিবারিক এক জমায়েতে।
তিনি আর তাঁর আত্মীয়রা অন্যমনস্কভাবে টিভিতে ‘ডাউনটন অ্যাবি’ দেখছিলেন। দেখতে দেখতে ইভানার মনে হলো, ‘আমাদের পারিবারিক ইতিহাস তো এর চেয়েও অনেক বেশি রসালো আর সবকিছুই সত্যি।’ নিউইয়র্কে ফেরার পর তিনি লিখে ফেললেন ২০ পৃষ্ঠার টিভির উপযোগী চিত্রনাট্য। যেখানে গিনেস বংশের উত্থান-পতনের কাহিনি, যেখানে আছে ব্যবসায়িক সাফল্য, দাতব্য কাজ, রাজনৈতিক যোগসাজশ আর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ—অসংখ্য পারিবারিক কলহ, কেলেঙ্কারি ও গোপন রহস্য।
প্রথমে লোওয়েল চেয়েছিলেন সিরিজটি শুরু হোক গিনেস ডার্ক স্টাউট রেসিপি তৈরি হওয়ার সময় থেকে। কিন্তু নাইট সিদ্ধান্ত নেন আর্থারের নাতি স্যার বেনজামিন গিনেসের (তিনি ১৮৬৮ সালে মারা যান) মৃত্যুর পরের সময়কে কেন্দ্র করে এই সিরিজের গল্প শুরু করবেন।
নাইট বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ইভানা আসলে তথ্য আর অজানা গল্পের এক ভান্ডার। তাঁর সঙ্গে দেখা করাই ছিল গবেষণার সেরা অভিজ্ঞতা। কারণ, শুধু গল্পই শোনাননি, তাঁর কণ্ঠে ছিল গিনেস পরিবারের আত্মবিশ্বাস, চেতনা আর উন্মাদনাও…আমি তাতে মুগ্ধ হয়ে যাই।’
নির্মাতার ভাষ্যরেডিওটাইমসকে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে নির্মাতা নাইট ব্যাখ্যা করেন কেন তিনি ওই সময়কাল বেছে নিয়েছেন এবং কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সিরিজে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বাস্তব ইতিহাসের দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছিলাম। যে ঘটনাগুলো সত্যিই ঘটেছিল, সেগুলোকে গল্পের একেকটা ধাপ হিসেবে ব্যবহার করেছি। এরপর চরিত্রগুলোকে যেমন ছিল, ঠিক তেমন রেখে সেই ধাপগুলোর মাঝখানে কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যাই। কেন ওই সময় ওই ব্যক্তি ওই কাজ করলেন—সেই কল্পনা থেকে গল্প তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তবতা আমার চোখের সামনেই ছিল দারুণ সব দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য।’
চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত মতামত, গোপন বৈঠক কিংবা দরজা বন্ধ করে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো কাল্পনিক। সিরিজে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র যুক্ত করা হয়েছে। যেমন জেমস নর্টনের শ’ন রাফার্টি, এটি পুরোপুরি কল্পিত চরিত্র। লোওয়েল বিবিসিকে বলেন, ‘এই রাফার্টি চরিত্রটি যুক্ত করার মাধ্যমে গল্পে সংঘাত আর আবেগের মিশ্রণ তৈরি হয়েছে, যা একটি কাহিনিকে আকর্ষণীয় করে তোলে।’
‘হাউস অব গিনেস’ কেবল একটি পরিবার বা একটি ব্র্যান্ডের গল্প নয়, বরং আয়ারল্যান্ডের ইতিহাস, সমাজ ও রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনার মিশেলে নির্মিত এই সিরিজ গিনেস সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে।
ইভানার ব্যক্তিগত ইতিহাসও নাটকীয়৫৮ বছর বয়সী ইভানা লোয়েলের নিজের জীবনও নাটকে ভরা। মা ছিলেন ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক লেডি ক্যারোলিন ব্ল্যাকউড, দাদি মরিন ছিলেন ১৯২০-এর দশকের আলোচিত ‘গোল্ডেন গিনেস গার্লস’ ত্রয়ীর সদস্য। শৈশবে হারিয়েছেন সৎ বাবা, বোন; মায়ের অবহেলা ও অ্যালকোহল আসক্তি তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। এমনকি নিজের পিতৃত্ব নিয়ে বহু বিভ্রান্তির পর অবশেষে ডিএনএ পরীক্ষায় জানতে পারেন তিনি চিত্রনাট্যকার আইভান মফাটের মেয়ে। এসব নিয়ে তিনি লিখেছেন স্মৃতিকথা ‘হোয়াই নট সে হোয়াট হ্যাপেনড’–এ ‘যা হাউস অব গিনেস’-এর মুক্তির সঙ্গে নতুন সংস্করণে আবার প্রকাশিত হচ্ছে।
পরিবার কী বলবে?গিনেস পরিবারের অনেক আত্মীয়; সবাই জানেন সিরিজে উঠবে পারিবারিক কলঙ্কও। তবু ইভানা নিশ্চিত, তাঁরা কিছু মনে করবেন না। ‘আমরা নিজেদের নিয়ে অত গর্ব করি না। বরং সবারই রসবোধ বেশ তীক্ষ্ম,’ বলেন তিনি।
‘ডাউনটন’ নয়, ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’-এর ঘরানাইভানা যেমন চাননি পরিবারের কেউকে খলনায়ক বানাতে, নাইটও বানাননি। বরং এক বাস্তবসম্মত চিত্র—ব্যবসা মানেই কঠোরতা, বিশেষ করে সেই সময়ে। আর তাই ‘হাউস অব গিনেস’ কোনো ‘কস্টিউম ড্রামা’ নয়, বরং দ্রুতগতি আর তীক্ষ্ণ সংলাপময় ড্রামা সিরিজ, অনেকটা ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’-এর ঘরানার। এটি অনেক বেশি অন্ধকার, তীক্ষ্ণ; একেবারে নতুন প্রজন্মের জন্য তৈরি।
তথ্যসূত্র: রেডিও টাইমস, বিবিসি