ক্লান্ত শরীর অথচ চোখে ঘুম নেই। অন্ধকারে তাঁবুর ভেতর শুয়ে আছি, হঠাৎই কানে এল তাঁবুর কাছে প্রাণীর হাঁটাচলা। তাদের ডাকে অরণ্যের গভীর নিস্তব্ধতা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে বাকি থাকল না, দলটা শিয়াল পণ্ডিতদের। মুহূর্তেই পাহারায় থাকা কুকুর মহাশয় দৌড়ে এল গর্জন করতে করতে। শিয়ালরা এক ঝটকায় সটকে পড়ল।
ক্যাম্পসাইটে আসার পরই দেখেছি লেজ নেড়ে নেড়ে ঘুরে বেড়াতে, সেই কুকুর মহাশয়ই এখন অতন্দ্রপ্রহরী। চারদিকে চক্কর দিচ্ছে। জুয়েল হেসে বলল, ‘ওকে কিছু খাবার দিলেই সারা রাতের জন্য সবচেয়ে বিশ্বস্ত পাহারাদার হয়ে যাবে।’
সত্যিই তা–ই হলো। সামান্য খাবারের বিনিময়ে কুকুরটা যেন দায়িত্ব নিল পুরো ক্যাম্পসাইটের। রাতের নিস্তব্ধতা আর শিয়ালের ডাকের ভেতর কুকুরের উপস্থিতি এনে দিল এক অদ্ভুত নিরাপত্তার আশ্বাস।
এই মৌসুমের প্রথম ক্যাম্প। তাঁবু পেতেছি এক প্রাচীন অভিভাবকের ছায়ায়, আনুমানিক ২২০ বছরের পুরোনো এক সূর্যপুরী আমগাছ। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা হরিণমারীর এই গাছের নাম শুনেছি বহুবার, কিন্তু দেখা হয়নি কখনো। আজ অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো।
দিনাজপুরের সিংড়া জাতীয় উদ্যান থেকে সাইকেলে শুরু হয়েছিল আমাদের যাত্রা। আমরা ভ্রমণ বন্ধুরা মাঝেমধ্যে সাইকেল নিয়ে পথে নেমে পড়ি। তবে এবারকার পথচলাটা ছিল অন্যবারের তুলনায় আলাদা। সাইকেলে পেছনে লেগেছে ক্যারিয়ার, সেখানে বসেছে প্যানিয়ার ব্যাগ, ভেতরে গুটিয়ে রাখা তাঁবু ও ক্যাম্পিংয়ের অন্যান্য সরঞ্জাম। যার পোশাকি নাম বাইকপ্যাকিং। হ্যাঁ, এটাই আমাদের প্রথম বাইকপ্যাকিং ট্রিপ।
ঢাকা থেকে এসে আগের রাতটা আমরা সিংড়া জাতীয় উদ্যানের নিস্তব্ধ অরণ্যে কাটিয়েছিলাম। সকালে সিংড়া বনের বুক চিড়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে আসতেই প্রথম থামতে হলো ঠাকুরগাঁও জেলার জয়নন্দ হাটে। সকালের খিদের তাড়নায় সাইকেলের চাকা থেমে গেল, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠল, দূর হয়ে গেল ভোরবেলার ক্লান্তি।
এরপর পথ আমাদের নিয়ে গেল পীরগঞ্জের দিকে। তবে সরাসরি নয়, আমরা ঘুরপথ বেছে নিলাম। পাঁচ-ছয় কিলোমিটার এদিক-ওদিক করে বোচাগঞ্জের সেতাবগঞ্জ ঘুরে চললাম। উদ্দেশ্য একটাই, টাঙ্গন নদের বুকে দাঁড়ানো সাগুনী রাবার ড্যাম আর গা ঘেঁষে থাকা ছোট্ট শালবনের ঘ্রাণ নেওয়া। পথের অতিরিক্ত ঘুরপাকও তখন মনে হচ্ছিল বাড়তি উপহার।
হরিপুর জমিদারবাড়ির ইতিহাস মেখে থাকা দেয়ালগুলো ছুঁয়ে সীমান্তঘেঁষা সড়ক ধরে ছুটে চললাম আমরা। ধীরগঞ্জ বাজার পেরিয়ে সীমান্ত এতটাই কাছে চলে এল যে বাতাসেও অন্য দেশের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। ছোট-বড় বাজার, আর সেইসব বাজারে শত শত কৌতূহলী চোখ ও প্রশ্ন, ‘কোথা থেকে আসছেন?’, ‘কোথায় যাচ্ছেন?’
ধর্মগড় জিরো পয়েন্টে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্য ডুবে গেল। চেকপয়েন্ট বাজারে নেমে এল পাতলা অন্ধকার। বাজার পেরিয়ে কিছুদূর এগোতেই নাগর নদে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়ালাম। নদীর কালো জলে ভারতের সীমান্তের সারি সারি লাইট নেচে উঠছে, আলো পানির ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে গিয়ে বেঁকে যাচ্ছে। রাতের অদৃশ্য স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নদীর ধার ঘেঁষে আঁকাবাঁকা পথে বাতাস কেটে ছুটে চলছিল আমাদের সাইকেলের চাকা।
হঠাৎ কুশলডাঙ্গী বাজারে দাঁড়াতেই যেন উৎসব লেগে গেল। মুহূর্তে আমাদের ঘিরে ধরল কয়েক শ মানুষ। কিন্তু কারও আগ্রহ আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয়; বরং সবাই একসঙ্গে আমাদের ওপর প্রশ্নবাণ চালাতে লাগল, ‘বাড়ি কোথায়?’, ‘কেন এসেছেন?’, ‘এত কষ্ট করে লাভ কী?’ প্রশ্নের তোড়ে আমাদের প্রায় দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
অবশেষে কোনোমতে তাদের নিবৃত্ত করে আমাদের মূল প্রশ্নটি ছুড়লাম, ‘আমরা হরিণমারীর বিখ্যাত আমগাছের কাছে যেতে চাই, কীভাবে যাব?’ উত্তর মিলল একসঙ্গে অনেক রকমের, কেউ একদিকে, কেউ আরেক দিকে পথ বাতলে দিচ্ছে। আমরা বিভ্রান্তির ঘূর্ণাবর্তে, তখনই আবির্ভূত হলেন আমাদের ‘ত্রাণকর্তা’। মাঝ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ভাই, কারও কথা শুনতে হবে না। শুধু আমার কথা শোনেন। আমি এই এলাকার ড্রাইভার।’
ড্রাইভার ভাইয়ের আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিমায় ভরসা পেলাম। তাঁর নির্দেশিত পথ ধরে আবার সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিলাম। অনেক আঁকাবাঁকা পথ, বাজার, সীমান্ত আর অগণিত মানুষের কৌতূহল পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছালাম হরিণমারীর সেই কিংবদন্তি আমগাছের কাছে।
১১৫ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে রাতের অন্ধকারে এই মহিরুহের বুকে এসে ঠাঁই নিলাম। চারপাশে নীরবতা, শুধু পাতার মৃদু দুলুনি। মাথার ওপর ছড়িয়ে আছে বিশাল ডালপালা, যেন শতাব্দী ধরে পথিকদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। তাঁবু খাটিয়ে ভেতরে বসে মনে হলো, আমরা আজ কেবল ভ্রমণকারী নই, এই গাছের দীর্ঘ স্মৃতির সঙ্গীও হয়ে উঠেছি।