নোবেল পুরস্কার নিয়ে ‘বাজি’ বা ‘পোলিং’ হয়ে আসছে দীর্ঘদিন থেকেই। মূলত সম্ভাব্য বিজয়ীদের নিয়ে জুয়া খেলা বা বাজি ধরা, যা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রচারিত হয়। কে কী কারণে এ পুরস্কার পেতে পারেন, এসব নিয়ে চলে হিসাব–নিকাশ। এ বছরও সাহিত্যে কে নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন, এ নিয়ে চলছে অঙ্ক কষাকষি। পোলিংও করছে অনেক ওয়েবসাইট। দেখা যায়, কোনো বছর কোনো প্রতিষ্ঠানের জরিপের ফলাফল মিলে যায়। কোনো বছর আবার মেলে না।
এ বছর এমন কয়েকটি ওয়েবসাইট সম্ভাব্য পুরস্কারপ্রাপ্তের ছোট তালিকা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে THE BERLINER একটি। এখানে ম্যাথিল্ড মন্টপেটিটের একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখায় বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। তিনি জানান, চার বছর ধরে তাঁর বুক ক্লাব প্রতিবছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার কে জিতবেন, তা অনুমান করার জন্য একটি পুল পরিচালনা করছে। গত তিনবারই তাঁর অনুমান সত্য হয়েছে। ম্যাথিল্ড মন্টপেটিট বলেন, ‘আমরা সাধারণত সবাই পাঁচজন লেখকের নাম পাই এবং বিজয়ী হন একজনই। আমরা এটিকে গুরুত্বসহকারে নিই। তবে সাহিত্য এত গুরুত্বপূর্ণ যে কে সন্ত হচ্ছেন, তা নিয়ে মাথা ঘামানো কখনোই উচিত নয়।’
সাত বছর ধরে, ধরেন ২০১৮ সালে, যখন পোলিশ ঔপন্যাসিক ওলগা টোকারচুক জিতেছিলেন, তখন থেকে দেখা যাচ্ছে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন এ বছর একজন পুরুষ লেখক তো পরের বছর নারী লেখক।
২০১৯ সালে পিটার হান্ডকে তো ২০২০ সালে লুইস গ্লুক। পরের বছর ২০২১ সালে আবদুলরাজাক গুরনাহ, ২০২২ সালে অ্যানি আর্নো। মানে একবার পুরুষ সাহিত্যিক তো অন্যবার নারী সাহিত্যিক। কোরিয়ার হান কাং গত বছর জিতেছিলেন, তাই এ বছরের বিজয়ী হবেন একজন পুরুষ। এদিক বিবেচনা করলে যেন নোবেল কমিটি সাহিত্যের ব্যাপারে বসেই আছে নারী-পুরুষের লিঙ্গবৈষম্য কমানোর জন্য। এবারের পুরুষ লেখক তবে কে? এ বিষয়ে ম্যাথিল্ড মন্টপেটিট প্রাথমিকভাবে অনুমান করছেন, বিজয়ী লেখক হতে পারেন ভারতীয় অমিতাভ ঘোষ। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল বিজয়ী হওয়ার পর আর কোনো ভারতীয় এ পুরস্কার পাননি। তিনি মজা করে বলছেন, অরুন্ধতী রায় ও সালমান রুশদি হতে যাচ্ছেন না, দুঃখিত। কারণ, একজন অ্যাকটিভিস্ট, অন্যজন বেশি খ্যাত।
সেদিক থেকে অমিতাভ ঘোষ কল্পকাহিনি ও অ-কল্পকাহিনি উভয়ই লেখেন। আরও অনেক বড় পুরস্কার জিতেছেন। তবে খুব বেশি নয়। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি উপনিবেশবাদ, আফিম যুদ্ধ ও সমসাময়িক প্রভাব সম্পর্কে যে দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেন, সেটি নোবেল কমিটি পছন্দ করে। তিনি বিজেপি সম্পর্কে স্পষ্টভাষী, কিন্তু বিদেশে থাকেন, তাই রাজনীতিতে খুব বেশি বিভ্রান্ত নন।
ম্যাথিল্ড মন্টপেটিট এরপরই ভারতীয়দের হতাশ করেছেন এই বলে, তিনি এত কিছুর পরও অমিতাভকে তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন। তিনি সে জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।
বাদ দেওয়ার কারণ কী—নোবেল কমিটি তাঁদেরই পুরস্কার দেয়, যাঁদের খুব কম পাঠক চেনেন। তারা ‘চমক’ দিতে পছন্দ করে, এটা মনে রাখতে হবে।
নিশ্চয়ই মনে আছে আপনাদের, নরওয়েজিয়ান নাট্যকার ইয়ান ফসে ২০২৩ সালে নোবেল পুরস্কার জেতেন। ২০২১ সালে তাঞ্জানিয়ান-ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনা জয়ী হন। কিন্তু তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ লেখক হলেও বেশির ভাগ সাহিত্যমোদীই তাঁদের পুরস্কার পাওয়ার আগে চিনতেন কি?
সবাইকে ‘রত্ন’ চিনতে হবে কেন? আর সবাই যদি ‘রত্ন’ চিনে ফেলে, তাহলে আর নোবেল কমিটির মতো ‘অমূল্য রত্ন’ কেন থাকবে? বিষয়টা সে রকমই।
সাহিত্যে নোবেল রাজনৈতিক। অথচ এটি রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু একটা ‘উদ্দেশ্য সাধন’ তো করতে হবে। তাই না?
প্রায়ই বিজয়ীদের তাঁদের কাজের সামাজিক সম্পৃক্ততার কারণে নির্বাচিত করা হয়। যেমন নারীবাদ, উত্তর-উপনিবেশবাদ, বাস্তুতন্ত্রসহ ইত্যাদি ইত্যাদি। তার মানে এই নয় যে বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। বরং এসব থেকে বিরত থাকতে হবে, যদি পুরস্কার পেতে হয়। কয়েক বছর ধরে রাশিয়ান, ইউক্রেনীয়, আরবি বা হিব্রু থেকে কোনো বিজয়ী নেই।
মজার ব্যাপার হলো, সুইডিশ নোবেল কমিটি ভৌগোলিক ও ভাষাগতভাবে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে এবং ভাবটা এ রকম যে মার্কিনদের ঘৃণা করে। তবে আগে তেমন করত না। সম্প্রতিও পুরস্কৃত করেছে, তবে তাঁরা ঔপন্যাসিক নন। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কবি লুইস গ্লুক জেতার পর ২০২০ সালে বব ডিলান সম্মানিত হন।
তবে অনেক অনেক আগে ১৯৯৩ সালে টনি মরিসন এবং ১৯৬২ সালে তো অবশ্যই জন স্টেইনবেক জিতেছিলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা কখনোই, কখনোই সেই ব্যক্তিকে নোবেল পুরস্কার দেবে না, যাঁকে সবাই নোবেল পুরস্কার দেবে বলে মনে করেন। ফিলিপ রথ, ভ্লাদিমির নাবোকভ, মিলান কুন্দেরা, আর্থার মিলারের ভাগ্যও এমনই ছিল। হারুকি মুরাকামি, কার্ল ওভ নাউসগার্ড ও মার্গারেট অ্যাটউডও এখন আর কখনো জিততে পারবেন বলে মনে হয় না। তবে নিউইয়র্ক টাইমস থেকে শুরু করে সবাই প্রচার করবে কিন্তু হারুকি মুরাকামিরই নাম।
কিন্তু অবাক ব্যাপার, ইংলিশ লিটারেচার ডটকম যাঁদের সম্ভাব্য বিজয়ীর তালিকায় রেখেছে, দেখেন তো তাঁদের আপনি চেনেন কি না? নামগুলো হলো জেরাল্ড মুরনানে। অস্ট্রেলীয় গদ্যকার। হাঙ্গেরির ঔপন্যাসিক লাসজলো ক্রাজনাহোরকাই, রোমানিয়ার মিরসিয়া কার্তেরেস্কু, কানাডার কবি অ্যান কারসন বা মেক্সিকোর ক্রিস্টিনা রিভেরা গারজা।
আবার ল্যাডব্রক্সের বাজির তালিকায় প্রথম স্থানে আছেন চীনের কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্য সমালোচক ক্যান জুয়ে এবং হাঙ্গেরির কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যকার লাজলো ক্রাজনাহরকাই। জাপানের সমসাময়িক কালের প্রভাবশালী নারী লেখকদের অন্যতম হিরোমি ইতো। তিনিও রয়েছেন এ তালিকায়।
আবার সিরিয়ার এক সাহিত্যিক রয়েছেন তালিকায়। অনেক দিন ধরেই আলোচনায় আছেন সিরিয়ার কবি আলী সাইদ অ্যাডোনিস। এ সময়ের আরব সাহিত্যের প্রধান কবিদের অন্যতম তিনি। আরব সাহিত্য বহু বছর থেকে সমাদৃত হচ্ছে না নোবেল কমিটির বিবেচনায়, সে জন্য এবার তার নামও রয়েছে আলোচনায়। আফ্রিকা বাদ যাবে কেন? তাই রয়েছে সোমালিয়ার ঔপন্যাসিক নুরুদ্দিন ফারাহের নাম। ইউক্রেনীয় লেখক ও বুদ্ধিজীবী আঁদ্রে কুরকভের নাম রয়েছে ল্যাডব্রক্সের তালিকায়।
ল্যাডব্রক্সের ভোটারদের বিবেচনায়, দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কো উনের সম্ভাবনা একেবারে কমে গেছে, তা নয়। রয়েছেন আইরিশ কথাসাহিত্যিক জন বানভিল, স্প্যানিশ লেখক এনরিক ভিলা-মাতাস এবং অস্ট্রেলিয়ান লেখক জেরাল্ড মারনেনও আছেন এ তালিকায়।
জেব্রডি সাইটের বিবেচনায় জাপানের সাহিত্যিকের পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কারণ, তাদের সাইটে জাপানিদের পক্ষেই ভোট পড়েছে বেশি। হারুকি মুরাকামি, হিরোমি ইতো, ইওকো ওগাওয়া, ইয়োকো তাওয়াদাসহ বানানা ইয়োশিমোতোর নাম শোনা যাচ্ছে ।
তবে ওই যে বলা হয়েছে, নোবেল কমিটি ভৌগোলিক ও ভাষাগতভাবে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। সে ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কে সাহিত্যে নোবেল লরিয়েট হবেন, এবার তা বলা কঠিন।
সম্প্রতি স্টকহোম ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরির আয়োজনে একটি আলোচনা হয়। এখানেও প্রশ্ন, কে পেতে যাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল? মারিয়া ট্রেজলিং, বো জি একেলুন্ড, আদনান মাহমুতোভিচ তাঁদের মতামত দেন। নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর এ নিয়ে তাঁরা বিশেষ অনুষ্ঠান করবেন।
মারিয়া ট্রেজলিং ও বো জি একেলুন্ড একমত যে নোবেল পুরস্কারের সাহিত্যের ওপর খুব বেশি সরাসরি প্রভাব নেই এখন আর। এটি আসলে সাহিত্যের কোনো স্রষ্টাকে বিশেষ স্পটলাইটেও নিয়ে আসে না।
প্রশ্ন করা হয়েছিল মারিয়া ট্রেজলিংকে, কে পেতে পারেন পুরস্কার? এর জবাবে তিনি বলেন, ‘নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তে আমি সত্যিই অবাক হতে চাই, যদি তারা “সিরিয়াস” সাহিত্যের বাইরে পা রাখে, যেমনটি তারা বব ডিলানকে পুরস্কার দেওয়ার সময় করেছিল। কল্পনা করুন, যদি পুরস্কারটি কোনো বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি লেখককে দেওয়া হয়, যেমন এন কে জেমিসিন বা নেদি ওকোরাফোর!’
মারিয়া ট্রেজলিং জানান, কানাডার অ্যান কারসনকে বিজয়ী হিসেবে দেখলে তিনি খুশি হবেন। আরেকজন কানাডিয়ান, মার্গারেট অ্যাটউডকেও পছন্দ করেন তিনি।অন্যদিকে একেলুন্ডের ভালো লাগবে আমেরিকান লেখক থমাস পিঞ্চন পুরস্কৃত হলে।
তাঁরা দুজনই স্বীকার করেছেন, তাঁদের যেসব সাহিত্যিক পছন্দ, তাঁদের ব্যক্তিজীবনও তাঁরা জানেন। এ দুজনেরই নোবেল কমিটির অনেক সদস্যের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রয়েছে।