বাংলাদেশে আমরা উইল ডুরান্টকে চিনেছি প্রথমত তাঁর ‘The Story of Philosophy’ বইটির আবুল ফজল কর্তৃক অনূদিত ‘দর্শনের ইতিকাহিনী’র মাধ্যমে। আমরা যারা তখনও পর্যন্ত ইংরেজি বই পড়ার মতো, বিশেষ করে দর্শনের মতো গুরুভার গ্রন্থ ইংরেজিতে পড়ার ভাষিক সক্ষমতা অর্জন করিনি, তখন আবুল ফজলকৃত সুপাঠ্য এই অনুবাদটি উইল ডুরান্টের মহিমাকে আমাদের সামনে হাজির করেছিল পূর্ণ মাত্রায়। এই বইটির মাধ্যমেই ডুরান্টের সাথে আমাদের অঙ্গবিহীন প্রথম আলিঙ্গন। পরে তাঁর সম্পর্কে আমাদের কৌতূহল যখন শাখাপ্রশাখায় বিস্তৃত হতে শুরু করে তখন জেনে আশ্চর্য হয়েছি, তিনি সভ্যতা, ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি ও দর্শন নিয়ে এগারো খণ্ডে রচিত ‘The Story of Civilization’ নামক বিশাল কীর্তির রচয়িতা। আরও পরে ‘The Age of Voltire’ বইটি পড়ে আশ্চর্য হয়েছিলাম তাঁর পাণ্ডিত্যের পরিধি ও বিশ্লেষণের বিস্তারে। কিন্তু এই বিশ্ব-মনীষার অন্য যে পরিচয় নতুন প্রজন্মের কাছে অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে আছে তা হলো তিনি ভারতীয় সভ্যতা নিয়েও লিখেছেন। ‘Our Oriental Heritage’ কিংবা ‘The Case for India’ –এই বই দুটোয় সরাসরি ভারতীয় সভ্যতা ও ইতিহাসের কথা এলেও, তাঁর অন্য কিছু গ্রন্থেও আছে ভারতের প্রসঙ্গ। ভারতকে তিনি জানতেন ইতিহাসের তথ্য ও উপাদানের মাধ্যমে যেমন, তেমনি ভারতীয় বৈশ্বিক ভাবুবকতার যারা প্রতিনিধি ছিলেন, তাদের মাধ্যমে তিনি ভারতকে ঘনিষ্ঠ করে নিয়েছিলেন। ভারতীয় ভাবুক ও সৃষ্টিশীলদের কারো কারো সাথে তাঁর ছিল সাক্ষাৎ-পরিচয়, যেমন রবীন্দ্রনাথ; তাঁর রচনার ও চিন্তার অনুরাগী ছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর হৃদ্যতার এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও মূল্যায়ন অঙ্কিত হতে দেখব যখন ‘The Case for India’ বইটি উপহার দিতে গিয়ে লিখলেন: “ভারতবর্ষ যে স্বাধীন হওয়া উচিত, আপনি একাই তার যথেষ্ট কারণ।”* রবীন্দ্রনাথ ১৯৩০ সালে তাঁর সর্বশেষ মার্কিন সফরে নিউ ইয়র্কের কার্নেগি হলে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেখানে বক্তৃতা শুরুর আগে রবীন্দ্রনাথকে শ্রোতামণ্ডলীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক উইল ডুরান্ট। বই উপহার ও পরিচয় জ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এতটাই সৌহার্দ্যে পৌঁছেছিল যে রবীন্দ্রনাথ প্রকাশের পরের বছরই ‘The Case for India’ বইটি নিয়ে লিখেছিলেন এক দীর্ঘ আলোচনা, এবং বলাই বাহুল্য, সেটি ছিল অত্যন্ত অনুকূল ও প্রীতিপূর্ণ। এই বইটির প্রশংসা করার মূল কারণ, প্রতীচ্যের স্বভাবসুলভ প্রভুত্ববোধ বা উচ্চমন্যতা থেকে প্রাচ্যের দেশগুলোর দিকে তাকাতেন ইতিহাসবিদরা। কিন্তু ডুরান্ট ছিলেন ব্যতিক্রম। এই কারণে রবীন্দ্রনাথের কাছে বইটির আলাদা একটি মূল্য তৈরি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর আলোচনায় বইটি সম্পর্কে যা বলেছিলেন তার দুএকটি চুম্বক অংশ নিচে দেয়া হলো:
“উইল ডুরান্ট তার ‘দ্য কেস ফর ইন্ডিয়া’ বইতে এই চেষ্টাটিই করেছেন। একসময় যখন ভ্রমণ মানেই ছিল সত্যিকারের ঝামেলা, তখন অদ্ভুত দেশগুলো ধীরে ধীরে নিজেদেরকে সঠিকভাবে পরিচিত করার জন্য শোরগোল তুলতে শুরু করে। আজকের দিনে ভ্রমণের আরামদায়ক পদ্ধতি হলো স্বাদ এবং হজমের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে, তাড়াহুড়ো করে গোগ্রাসে গিলে ফেলার মতো। ভৌগোলিক অভিজ্ঞতাগুলো ছায়াছবিতে পরিণত হয়েছে এবং প্রচারের আধুনিক উপায়গুলো ভাসা ভাসা অবাস্তবতার উদ্ভাবকদের খুব সহজেই তাদের ব্যবসা চালাতে সক্ষম করেছে।”[১]
“কিন্তু অবশেষে সেই বণিক জয়লাভ করেছে এবং শৌর্যের চেতনায় উচ্চস্বরে হেসেছে বিলুপ্তির আনন্দে। সোভিয়েত রাশিয়ার বাইরে সর্বত্র বস্তুগত শক্তির অন্ধ আনুগত্যে আবিষ্ট অতিবিকশিত জাতীয়বাদী বন্যতার এই প্রতিকূল যুগের কাছে আমরা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার আশা করা বন্ধ করে দিয়েছি, আমরা একটি অচেনা মহাদেশের মানুষ, যাদেরকে বলি হিসেবে ক্ষমতার বেদিতে আনা হয়েছে। আবারও বলছি ডুরান্টের বইতে যখন আমি লক্ষ্য করলাম, যে-মানুষগুলো তার স্বজাতি নয় তাদের দুর্ভোগ ও লাঞ্ছনায় তাঁর বিষণ্ন বেদনার সুর, এবং যে-পরাজিত জাতির আপন কণ্ঠ নমিত হয়ে আছে তাকে ঘিরে বিস্মৃতির নিঃসঙ্গ কক্ষে, সেই জাতির প্রতি তাঁর ন্যায়নিষ্ঠ থাকার ক্ষুব্ধ বাসনা লক্ষ্য করে বিস্মিত হয়েছি। জানি লেখকের পাঠকপ্রিয়তা অর্জনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এমনকি আমাদের কাছে তার বই পরিত্যাজ্য হওয়ার ঝুঁকিতেও পড়তে পারে কারণ জনগণের সঙ্গে—যে জনতার নিজেদের বিধিই বাম—সেই জনগণের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর অবস্থার মোকাবেলা করবে এতোটা নিচে এই বই নামতে অক্ষম।”[২]
কী ছিল এই বইয়ে? এটি ছিল ভারত নিয়ে পশ্চিমের এমন এক ইতিহাসবিদের লেখা যা হয়ে উঠেছিল পশ্চিমের ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিকে এড়িয়ে ভারতের সভ্যতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে মুক্তদৃষ্টিতে দেখার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ইংরেজরা আসার আগে ভারত যে সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে উন্নত এক ভূখণ্ড ছিল তারই এক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে এই বইটিতে। স্পষ্টতই, উইল ডুরান্টের সহমর্মিতা ছিল ভারতীয়দের প্রতি। এই বইটি লেখার আগে ভারত সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছিলেন তিনি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি তাঁর ছিল স্পষ্ট পক্ষপাত। তিনি মনে করতেন, ইংরেজদের শোষণের ফলে ভারতের অর্থনৈতিক অবনতি ঘটেছে। এই প্রবন্ধে আমরা অবশ্য সেই অনুসন্ধানে যাবো না। আমরা শুধু লক্ষ্য করবো রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর ধারণা ও অভিমতসমূহ। ভারতের রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিল্প ও সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গক্রমে হাজির হবে—এটা অবধারিত। ডুরান্ট তাঁর এই বইটিতে প্রথম অধ্যায়েই ভারত সম্পর্কে প্রাথমিক বিবরণে ভারতের সাম্প্রতিক কালের সাহিত্যের উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন:
“Rabindranath Tagore, who, writing local dialect in a subject land, has made himself the most famous poet of our time.” –(The case for India, Will Durant, Strand Book Stall, Mumbai, 2007, p 4)
‘গান্ধী’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধ্যায়েও এসেছে রবীন্দ্রনাথের উল্লেখ, তবে তা গান্ধীর গৃহীত নীতির রাজনৈতিক পদক্ষেপ ও নীতির সমালোচনার সূত্রে। সবাই জানেন গান্ধীর প্রতি ছিল রবীন্দ্রনাথের সীমাহীন শ্রদ্ধা। কিন্তু গান্ধীর কোনো কোনো পদক্ষেপকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। সেই বিষয়টিই ডুরান্ট `গান্ধী’ শীর্ষক অধ্যায়টি আলোচনায় উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন:
"তবে আমাদের এটা মনে করা উচিত নয় যে হিন্দু চিন্তাধারার সকল নেতাই গান্ধীর মতবাদ গ্রহণ করেন। তাঁর সাপ্তাহিক `ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পৃষ্ঠাগুলি হলো সেগুলো যেখানে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে অচ্ছুত শ্রেণির সবাই তাঁকে লেখেন, তাঁর মতামত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং প্রায়শই তাঁকে একটি অনিশ্চিত প্রতিরক্ষায় বাধ্য করেন।"[৩]
এইসব দ্বিমত ও প্রশ্নের পাশাপাশি গান্ধীর রাজনৈতিক নতুন নতুন পদক্ষেপ নিয়ে উচ্ছ্বাস যেমন ছিল, তেমনি এর বিপদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মনে কিছু আশংকাও ঘনীভূত হচ্ছিল। যদিও তাঁদের মধ্যে শ্রদ্ধাপূর্ণ হৃদ্যতার কোনো ঘাটতি ছিল না, কিন্তু ভিন্নমত প্রকাশে তাঁরা বিরত ছিলেন না কখনোই। সেই ভিন্নমত কখনো কখনো তর্কে গিয়ে রূপান্তর হয়েছে। বিশেষ করে চরকায় সুতা কাটার প্রসঙ্গটাই ভারতে দুই প্রধান ব্যক্তিত্বের মধ্যে তর্কযুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল। একই অধ্যায়ে তিনি চরকা বিষয়ে গান্ধী-রবীন্দ্রনাথের তুমুল তর্কটিও তুলে ধরেন:
“অবশেষে ভারতের কবি-ঋষি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বন্ধুর কর্মসূচিতে কিছু অসুবিধার কথা তাঁর নম্র ভঙ্গিতে প্রকাশ করেছেন। আহমেদাবাদের সত্যাগ্রহশ্রম এবং কলকাতার রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাপীঠ শান্তিনিকেতনের মধ্যে একটি সৌজন্যমূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে। কবি সর্বদা সন্তের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার সাথে কথা বলেন, তবে সর্বদা সতর্ক সংকোচনের সাথে। তিনি গান্ধীর মধ্যে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের একটি সুর খুঁজে পান, এবং আরও যেটা খারাপ, তা হলো মধ্যযুগীয় প্রতিক্রিশীলতার এক নির্ভুল গুণ। "ঘুরাও এবং বুনে যাও! —এটা কি নতুন সৃজনশীল যুগের এক সুসমাচার?" চরকাকে আঁকড়ে ধরে থাকা, বিশ্বের সার্বজনীন শিল্পায়নের স্রোত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা, আধুনিক জীবনের জন্য অপ্রাসঙ্গিক আদিম অবস্থায় ফিরে গিয়ে কোনও জাতি মহান হতে পারে বলে মনে করা—এটি আসলে এক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। ভারতকে যুগের সাথে এগিয়ে যেতে হবে, তাকে প্রতিটি জাতির নিপীড়িতদের কথা ভাবতে হবে। ভারতকে পশ্চিমাদের থেকে বিভক্ত করার চেষ্টা করাটা আধ্যাত্মিক আত্মহত্যা।" [৪]
রবীন্দ্রনাথের জবাবে যে গান্ধীজি সন্তুষ্ট হতে পারেননি, ডুরান্ট তা জানতেন। তাঁর বইয়ে তর্কের এই ধারাবাহিকতা আমরা দেখতে পাব। রবীন্দ্রনাথের প্রতি গান্ধীর একরোখা জবাবটি ছিল এরকম:
“যখন আমার চারপাশের সবাই খাবারের অভাবে মারা যাচ্ছে, তখন আমার কাছে একমাত্র অনুমোদনযোগ্য ব্যাপার হলো ক্ষুধার্তদের খাওয়ানো... ক্ষুধার্ত ও অলস মানুষের কাছে, ঈশ্বর একমাত্র গ্রহণযোগ্য যে-রূপে আবির্ভূত হতে পারেন তা হলো কাজ, এবং মজুরি হিসেবে খাদ্যের প্রতিশ্রুতি... প্রত্যেকেরই সুতা কাটতে হবে। রবীন্দ্রনাথও অন্যদের মতো সুতা কাটুন। তাঁর বিদেশি কাপড়চোপড় পুড়িয়ে ফেলুন। আজকে এটাই কর্তব্য। আগামীকালের ভার ভগবান নেবেন। "[৫]
একই অধ্যায়ে ডুরান্ট এই তর্ক সম্পর্কে নিজের ভাষ্য ও প্রতিক্রিয়া যেমন তুলে ধরেন, তেমনি গান্ধীর প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথের জবাবটিও তিনি আমাদের সামনে হাজির করেন:
“যদি তাঁর চিন্তাভাবনার ধরন আমাদের সংশয়বাদী এবং বাস্তববাদী পশ্চিমাদের কাছে অপরিচিত বলে মনে হয়, তাহলে আমাদের মনে রাখা উচিত যে আমাদের চিন্তাভাবনার ধরন হিন্দুদের কাছে খারাপ এবং অর্থহীন বলে মনে হবে। ভারতকে ঐক্যবদ্ধকারী একজন রাজনীতিবিদ হতে পারে না, তাকে সন্ত হতে হয়েছিল। কারণ গান্ধী হৃদয় দিয়ে চিন্তা করতেন, সমগ্র ভারত তাকে অনুসরণ করেছে। ত্রিশ কোটি মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করে, এবং বিশ্বের আর কোনও মানুষের এত আধ্যাত্মিক প্রভাব নেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন:
“তিনি হাজার হাজার বঞ্চিতদের কুঁড়েঘরের দ্বারপ্রান্তে এসে থামলেন, তাদেরই মতো পোশাক পরে। তিনি তাদের সাথে তাদেরই ভাষায় কথা বললেন। অবশেষে এখানেই ছিল জীবন্ত সত্য, কেবল বই থেকে উদ্ধৃতি নয়। এই কারণেই, ভারতের জনগণের দেয়া ‘মহাত্মা’, তার আসল নাম। তার মতো আর কে অনুভব করেছেন সমস্ত ভারতীয়কে নিজের রক্তমাংস হিসেবে? যখন ভারতের দরজায় ভালোবাসা এসে পৌঁছালো, তখন সেই দরজাটি উন্মুক্ত হয়ে গেল... গান্ধীর আহ্বানে ভারত নতুন মহত্ত্বে প্রস্ফুটিত হয়েছিলেন, ঠিক যেমনটি আগে একবার, অতীতে ঘটেছিল, যখন বুদ্ধ সমস্ত জীবের মধ্যে সহানুভূতি এবং করুণার সত্য ঘোষণা করেছিলেন।”
হয়ত গান্ধীও ব্যর্থ হবেন, যেমন এই ঘোর ডারউইনীয় জগতে সন্তরা ব্যর্থ হয়ে থাকেন। কিন্তু জীবন যদি মাঝে মাঝে আমাদের সাফল্যের মুখে এই ধরনের ব্যর্থতা ছুঁড়ে না ফেলে, তাহলে আমরা কীভাবে জীবনকে গ্রহণ করব?”[৬]
‘The Revolution’ শীর্ষক তৃতীয় অধ্যায়ে ইংরেজ-শাসিত ভারতের সেই উত্তাল সময়টির কথা বলেছেন লেখক। বিপ্লব দমনে ইংরেজ শাসক কতটা মরিয়া ও হিংস্র হয়ে উঠেছিল, ডুরান্ট এই গ্রন্থে সেই ইতিহাসটিও তুলে ধরেছেন। ভারতের ইতিহাসে ইংরেজ কর্তৃক জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই ঐতিহাসিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথের নাইটহুড প্রত্যাখ্যানের চিঠিটা উল্লেখ করে ডুরান্ট বলেন:
“একই সময়ে গান্ধী ভাইসরয়কে একই রকম একটি চিঠি পাঠান, যেখানে তিনি আফ্রিকায় সাম্রাজ্যের সেবা এবং যুদ্ধের সময় প্রাপ্ত সম্মাননাগুলি ফিরিয়ে দেন। ৪ নভেম্বর দিল্লিতে জাতীয় কংগ্রেস তার পরামর্শে শান্তিপূর্ণ গণ-অবিচারের আহ্বান জানায়: অর্থাৎ, সমস্ত ব্রিটিশ পণ্য বর্জন, সমস্ত কর প্রত্যাখ্যান এবং হিন্দু ও সরকারের মধ্যে সব ধরনের মেলামেশা বা সহযোগিতা ত্যাগ করা।”[৭]
ডুরান্টের পক্ষপাত ভারতীয়দের প্রতি থাকলেও, এই দেশটির মানুষের কিছু কিছু বিষয়ে পশ্চাদপদতা ও এর ফলাফল সম্পর্কে সজাগ যেমন ছিলেন, তেমনি তা নিঃসংকোচে উল্লেখও করেছেন। ‘The Case for England’ শীর্ষক চতুর্থ অধ্যায়ে ডুরান্ট ভারতে কুসংস্কার ও দারিদ্রের মূল কারণগুলোর সূত্রে বলেন:
“এই বিরাট উন্নতি এবং কৃষি শিক্ষা বিস্তারের জন্য সরকারের পরিশ্রম সত্ত্বেও যদি হিন্দু কৃষক দরিদ্র থেকে যায়, তবে এর কারণ হলো সে পূর্বপুরুষের পদ্ধতি এবং সরঞ্জামের সাথে কুসংস্কারাচ্ছন্নভাবে আবদ্ধ; কারণ সে সুদখোর মহাজনদের কাছে ঋণী, তারই মতো গোটা জাতি, বিপুল যৌতুক এবং ব্যয়বহুল উৎসবের জন্য অর্থ প্রদান করে; এবং ভারতীয় দারিদ্র্যের মূলে রয়েছে অজ্ঞতা এবং বেপরোয়া বংশবৃদ্ধির মূলে রয়েছে তাদের জাতীয়তাবাদী নেতাদের বুদ্ধিমত্তা বা সাহসের অভাব। ভারতের যা প্রয়োজন তা হলো একজন গান্ধী, এমনকি একজন রবীন্দ্রনাথও নন, বরং একজন ম্যালথাস যিনি জনসংখ্যার আইন শেখাবেন এবং একজন ভলতেয়ার যিনি তার হাস্যকর দেবতাদের প্রতি হেসে কুসংস্কার থেকে দেশকে মুক্ত করবেন।"[৮]
‘With Malice toward to Note’ শীর্ষক উপসংহারমূলক অধ্যায়ে ডুরান্ট বলেন:
“ভারত সম্পর্কে আমি দুটি দৃষ্টিভঙ্গি মোটামুটিভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমি জানি যে আমার পক্ষপাতিত্ব বারবার আমার নিরপেক্ষতার ভানকে ভেঙে দিয়েছে। ৩২ কোটি মানুষের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন রবীন্দ্রনাথ, একজন গান্ধী, একজন স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, একজন সরোজিনী নাইডুর উপস্থিতিতে প্রবল বেদনায় আক্রান্ত না হয়ে অনুভূতিহীন থাকা কঠিন; এই ধরনের পুরুষ ও নারীকে দাসত্বে আটকে রাখার মধ্যে কিছু অশ্লীল এবং আপত্তিকর বিষয় রয়েছে। এই বিষয়ে নিরপেক্ষ থাকার অর্থ হলো স্বীকার করা যে আমরা প্রতিটি আশা এবং প্রতিটি আদর্শ হারিয়ে ফেলেছি, এবং আমাদের আমেরিকান পরীক্ষা, এবং প্রকৃতপক্ষে সমস্ত মানব জীবন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। আমাদের নিজস্ব জাতীয় স্বাধীনতার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা, আমাদের বিপ্লব আমাদের স্বাধীনতায় নিজেদের বিকশিত করার যে সুযোগ দিয়েছে, তার জন্য আমাদের ভারতের ওয়াশিংটন এবং জেফারসন, ফ্র্যাঙ্কলিন এবং ফ্রেনিয়াস এবং টম পেইনসের প্রতি শুভকামনা জানাতে বাধ্য করে। আমরা এখনও বিশ্বাস করতে পারি যে প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর আদায় অত্যাচার।"[৯]
চলবে
গ্রন্থপঞ্জি১. English Writings of Tagore, 3rd Volume, Sahitya Akademi, 2002, P 878২. English Writings of Tagore, 3rd Volume, Sahitya Akademi, 2002, P 879৩. The case for India, Will Durant, Strand Book Stall, Mumbai, 2007, p 74৪. The case for India, Will Durant, Strand Book Stall, Mumbai, 2007, p 78৫. The case for India, Will Durant, Strand Book Stall, Mumbai, 2007, p 79৬. The case for India, Will Durant, Strand Book Stall, Mumbai, 2007,p 82-83৭. The case for India, Will Durant, Strand Book Stall, Mumbai, 2007,p 96-97৮. The case for India, Will Durant, Strand Book Stall, Mumbai, 2007, P 119-120৯. The case for India, Will Durant, Strand Book Stall, Mumbai, 2007,—P 144