স্বাস্থ্য নীতিতে ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি

স্বাস্থ্য নীতিতে ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি

‘প্যালিয়েটিভ’ শব্দের বাংলা অর্থ হলো প্রশমন। ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’ বলতে নিরাময় হবে না এমন রোগী বা যেসব রোগীর ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে বা থাকে না, তাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আত্তিকভাবে সহযোগিতা করাকে বুঝায়। প্যালিয়েটিভ কেয়ারের মাধ্যমে রোগীর বিদ্যমান কষ্ট কমিয়ে আনা যায়।

আজ ১১ অক্টোবর, বিশ্ব হসপিস ও প্যালিয়াটিভ কেয়ার দিবস। দিবসটি দীর্ঘমেয়াদি ও অনিরাময়যোগ্য রোগীর অধিকার, সুখ এবং মানসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে উদযাপিত হয়। ২০১৪ সালে জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংসদে প্রথমবারের মতো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং তার সদস্য দেশগুলোকে প্যালিয়াটিভ কেয়ারকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার রেজুলিউশন পাস করা হয়। এই বছর দিবসের প্রতিপাদ্য হলো- ‘প্রতিশ্রুতি অর্জনের লক্ষ্য- প্রশমন সেবায় সর্বজনীন প্রবেশাধিকার।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে একসঙ্গে ১ লাখ মানুষের প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রয়োজন, তার মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ এই সেবা পেয়ে থেকে। এই সেবা বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রিক। এটি সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজন স্বাস্থ্য নীতিতে এর অন্তর্ভুক্তি। প্যালিয়েটিভ কেয়ার নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞ এবং হসপিস বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ডা. শাহিনুর কবির।  

প্যালিয়েটিভ কেয়ার কী এবং এটি কাদের প্রয়োজন?

ডা. শাহিনুর কবির: প্যালিয়েটিভ কেয়ার হচ্ছে – যেসব রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বা আর ভালো হবেন না, যেমন ক্যানসার আক্রান্ত রোগী যারা স্টেজ ৪-এ আছেন, কিডনি বিকল হয়ে গেছে প্রতিদিন ডায়ালাইসিস করার প্রয়োজন হয়, অ্যাডভান্সড স্টেজে এলঝাইমার, ডিমেনশিয়া – এই রোগগুলো কখনও ভালো হয় না। কিংবা একটা মানুষের ৮০ বা ৯০ বছর হয়ে গেছে, তার শারীরিক অনেক সমস্যা তৈরি হয়ে গেছে, তার কিন্তু সেসব রিভার্স হয়ে আগের জায়গায় ফেরত আসবে না। এই মানুষগুলো ধীরে ধীরে কষ্ট পেতে পেতে একসময় মৃত্যুবরণ করবেন। এখানে আসলে মেডিক্যাল সায়েন্সের খুব বেশি কিছু করার নেই। এখানে করার আছে যে মেডিক্যাল সায়েন্স তাকে কিছু কমফোর্ট দিতে পারে আর কেয়ার দিতে পারে। কেয়ারের মধ্যে আবার কতগুলো ভাগ আছে। যেমন – শারীরিক সমস্যা, ব্যাথা আছে , বমি আছে এগুলো ম্যানেজ করা ফিজিক্যাল বিষয়। এছাড়া সাইকোলজিক্যাল বিষয় আছে, কারণ তার তো মানসিক কষ্টও আছে। সামাজিক একটা বিষয় হচ্ছে যে, এমন অবস্থায় যিনি বিছানায় পড়ে আছেন তার কিন্তু সমাজের কারও সঙ্গে আদানপ্রদান হচ্ছে না। তিনি কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছেন না। মানুষ স্বভাবতই আড্ডা, গল্প, আদানপ্রদানে অভ্যস্ত। আরেকটি বিষয় হচ্ছে আত্মিক। প্যালিয়েটিভ কেয়ার হচ্ছে শারীরিক, সামাজিক, মানসিক এবং আত্তিক বিষয়গুলো পুরোটা একসঙ্গে নিয়ে একজন মানুষকে সেবা দিয়ে থাকে। যাতে করে সেই মানুষটির সুস্থ না হওয়ার এই যাত্রাটি কিছুটা সহজ ও আরামদায়ক হয়। মৃত্যুটি যাতে শান্তির হয়।         

এই সেবাটি কীভাবে দেওয়া যেতে পারে এবং কারা দিতে পারেন?

ডা. শাহিনুর কবির: এই সেবা কয়েকভাবে দেওয়া যেতে পারে। বাসায় দেওয়া যেতে পারে, হসপিস কিংবা প্যালিয়েটিভ কেয়ার সংস্থা আছে, সেখানে দেওয়া যেতে পারে। যেকোনও একটা ব্যবস্থাতেই এই সেবা দেওয়া যেতে পারে। এই সেবা দেবেন মুলত চিকিৎসক, প্যালিয়েটিভ কেয়ারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ, যেসব নার্স প্যালিয়েটিভ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, ফার্মাসিস্ট, মেডিকেল সোশ্যাল ওয়ার্কার। সবাই মিলে যে একটা কেয়ার দেয় তখন একটা পরিপূর্ণ কেয়ার হয়, সেটাকে প্যালিয়েটিভ কেয়ার সাপোর্ট বলে।

এই সেবা কমিউনিটি নির্ভর হতে পারে, সামাজিকভাবেও হতে পারে। রোগী যেখানেই থাকুক সেখানেই প্যালিয়েটিভ কেয়ার সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব।

প্যালিয়েটিভ কেয়ার কখন গ্রহণ করা উচিত?

ডা. শাহিনুর কবির: ধরুন, ক্যানসার আক্রান্ত একজন রোগী যখন কেমোথেরাপি নেয়, তখনও কিন্তু একটা প্যালিয়েটিভ সাপোর্ট দরকার পড়ে। তাহলে তার জীবন ভালো থাকে। ক্যানসার চিকিৎসায় যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সেগুলো ম্যানেজ করা, মানসিক সাপোর্ট দিলে চিকিৎসা ভালো হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট দরকার হয় একটা মানুষ যখন শেষ স্টেজে চলে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য বলেছে, যখন কঠিন রোগ শরীরে বাসা বাঁধে তখন থেকেই প্যালিয়েটিভ কেয়ার শুরু করা উচিত। কিন্তু এশিয়া অঞ্চলে কিংবা অন্যান্য দেশে একদম শেষ মুহূর্তে সাপোর্টটি নেয়। অর্থাৎ যখন আর কোনও চিকিৎসা থাকছে না তখন এই সাপোর্ট নেওয়া শুরু করা হয়। কিন্তু উচিত ছিল একদম শুরু থেকে প্যালিয়েটিভ সাপোর্ট শুরু করা। বাংলাদেশে এখনও এটা প্রচলিত না। আমাদের এখানে প্যালিয়েটিভ সেবা মানে বুঝা হয় যে ‘শেষ সময়ের চিকিৎসা’ । কিন্তু মৃত্যুর পরও কিন্তু সেবা দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের খোঁজ খবর নেওয়া, মৃত্যুর পর তাদের ভিজিট করা হয়। এভাবে একটা সেবা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে এই সেবা কতটুকু মেলে? 

ডা. শাহিনুর কবির: বাংলাদেশে একইসঙ্গে ১০ লাখ লোকের প্যালিয়েটিভ কেয়ার দরকার। কারণ আমাদের দেশে যে ক্যানসার আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়, তার ৭৫ শতাংশই ধরা পড়ে চতুর্থ স্টেজে। অর্থাৎ এই রোগীদের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাহলে একটা বড় অংশ ক্যানসার চিকিৎসা পাচ্ছে অথবা পাচ্ছে না তাদের সবারই কিন্তু প্যালিয়েটিভ কেয়ার দরকার আছে। বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ১ শতাংশ মানুষ প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেবা পাচ্ছে। আবার যতগুলো সেবা কেন্দ্র আছে টা সব ঢাকার মধ্যে। ঢাকায় এই সেবা পুরোপুরি দেয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) এবং আরেকটি হচ্ছে আমাদের হসপিস বাংলাদেশ। এই দুই জায়গায় পূর্ণরূপে প্যালিয়েটিভ কেয়ার সার্ভিস পাওয়া যায়। একইসঙ্গে হসপিস বাংলাদেশ হোম কেয়ার, টেলিমেডিসিন সাপোর্টও দিয়ে থাকে। এছাড়া আরও কিছু সার্ভিস আছে সেগুলো অনকলোজি সেন্টারের সঙ্গে ছোট করে তৈরি করা। সেখানে শুধু ক্যানসারের রোগীরাই সেবা পায়। খুব বেশি না, ১২-১৩টি সংস্থা এই সেবা দিয়ে থাকে।

বাংলাদেশে প্যালিয়েটিভ কেয়ারে মুল চ্যালেঞ্জগুলো কি?

ডা. শাহিনুর কবির: চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে সরকারের তরফ থেকে স্বাস্থ্য নীতিতে এখনও প্যালিয়েটিভ কেয়ার অন্তর্ভুক্ত না। স্বাস্থ্য নীতিতে অন্তর্ভুক্ত না হলেও এই বিষয়ে পড়ান হয়, এমডি কোর্স আছে, প্রতিবছর শিক্ষার্থী বের হচ্ছে এই কোর্স করে। কিন্তু তারা কোনও পোস্টিং পাচ্ছে না। সরকারের স্বাস্থ্য নীতিতে যদি না থাকে তাহলে তো পদ তৈরি হবে না, সারাদেশেও ছড়াবে না। বেসরকারি খাতে এই সেবা শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক। এই সেবা সারা দেশে ছড়ানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে স্বাস্থ্য নীতিতে নেই। স্বাস্থ্য নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করলে তাহলে হয়তো তহবিল আসবে, সরকারিভাবে পদ সৃষ্টি হবে। পদ সৃষ্টি হলে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে যাবে। প্যালিয়েটিভ কেয়ার কিন্তু সচরাচর সেবা না। এখানে আসলে যে মানুষগুলো কাজ করবে তাদের মন থেকে মমতাময়ী হতে হবে। না হলে কিন্তু থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মতো শুধু একটা প্রতিষ্ঠান দাড় করানো হবে। কারা সেবাটা দিবে সেটি কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আসলে মানবিক হতে হবে।

পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কি আছে?

ডা. শাহিনুর কবির: আমাদের এখানে যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সেটি পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। এটা যদি বিস্তৃতি বাড়ানো হয় বা তৃণমূল পর্যায়ে বাড়ানো হয় তাহলে যেই সেবাকেন্দ্র বর্তমানে চালু আছে সেখানে যদি পেলিয়াটিভ কেয়ার চালু করা যায় তাহলে কিন্তু আলাদা ভাবে ফান্ড দরকার নেই। প্যালিয়েটিভ কেয়ার যেকোনও জায়গায় বসে দেওয়া যায়। এটার জন্য আলাদা কাঠামো তৈরি করার দরকার নেই। সরকারের নীতির মধ্যে থাকতে হবে, না থাকলে বাস্তবায়ন হবে না।      

Comments

0 total

Be the first to comment.

মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনা: বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে ছাড়পত্র পেলো আরও দুজন   BanglaTribune | স্বাস্থ্য

মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনা: বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে ছাড়পত্র পেলো আরও দুজন  

রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড...

Sep 21, 2025
ডেঙ্গুতে একদিনে ১২ মৃত্যু BanglaTribune | স্বাস্থ্য

ডেঙ্গুতে একদিনে ১২ মৃত্যু

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ জনের মৃত্যু হয়ে...

Sep 21, 2025

More from this User

View all posts by admin