সুলতানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ হয় না

সুলতানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ হয় না

আল মাহফুজ ⚫

তখন ছবি আঁকা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন সুলতান। শেষ প্রদর্শনী হয়েছিল তার দুই যুগ আগে। নড়াইলের পুরুলিয়া গ্রামের বহু পুরাতন বাড়িতে সবার অগোচরে থাকতেন। সবার বলতে ঠিক সবার নয়, গৃহপালিত পশু-পাখি প্রকৃতিই ছিল তার সহচর। কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী তাকে অনুরোধ করেছিলেন শিল্পকলা একাডেমির জন্য কিছু ছবি আঁকতে। সুলতান ছবি এঁকেছিলেন সেই প্রদর্শনী সামনে রেখে।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে এস এম সুলতানের আঁকা জলরং, তৈলচিত্র, স্কেচ ও চারকোলের বেশ কিছু চিত্রকর্ম নিয়ে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে জমকালো এক প্রদর্শনী হয়। সুলতান তখন যেন নতুন কান্তিতে শ্যামল মহিমায় উদ্ভাসিত হলেন। বহুমাত্রিক লেখক আহমদ ছফাসহ অনেকেই এগিয়ে এলেন নিজের দেশের মানুষের কাছে ‘লাল মিয়া’কে পরিচিত করাতে।

অথচ তার আগে বহির্বিশ্বের কাছে সুলতানের নাম বেশ প্রশংসিত। তার চিত্রকর্মের রোশনাইয়ে ঝিকিমিকি করেছে বহু দেশ। প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, ভারতের শিমলায়। সেই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেছিলেন কাপুরতলার মহারাজা। দ্বিতীয় প্রদর্শনী হয়েছিল তিন বছর পর, লাহোর ও করাচিতে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের আমন্ত্রণ পেয়ে ঘুরে এলেন মার্কিন মুলুক। বিলেতের লেস্টার গ্যালারিতে সুলতানের ছবি স্থান পায়। তিনিই প্রথম এশীয়, যার আঁকা ছবি পাবলো পিকাসো, সালভাদোর দালি, পল ক্লি, মাতিসের মতো বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের ছবির সঙ্গে প্রদর্শিত হয়।

আঁকার জন্য তিনি একেবারে সাধারণ কাগজ, গাবের রঙ এবং চটের ক্যানভাস ও কয়লা ব্যবহার করতেন। এ বিষয়ে তার বক্তব্য হলো– ‘বিদেশি ক্যানভাসের প্রচুর দাম। তাই পাটের চটের ওপর আঁকার চেষ্টা করলাম। শিরীষ ব্যবহার করে দেখলাম, বর্ষাকালে লুজ হয়ে যায়। তখন মাথায় এলো, জেলেদের জালে দেয়া গাবের রঙ ব্যবহার করার। তাতে ছবি নষ্ট হবার আশঙ্কা কম। ছত্রাকও পড়বে না।’

এভাবে ছবি আঁকার সরল উপাদান তৈরি করে শিশু-কিশোরদের ছবি আঁকা শিখিয়েছেন সুলতান। নিজের এলাকায় গড়ে তুলেছিলেন ‘শিশুস্বর্গ’ নামের পাঠশালা। শুধুমাত্র আর্টের জন‍্য গড়েন ‘নন্দনকানন’। তবে নানা প্রতিকূলতায় ‘শিশুস্বর্গ’ নিয়ে বেশিদূর এগোতে পারেননি এই বংশীবাদক-চিত্রকর।

দৃঢ় জাতি গঠনে শিশুদের মন বিকাশের বিকল্প নেই। শিশুদের জন‍্য সুলতানের ছিল অনন্ত দরদ আর অফুরন্ত ভালোবাসা। যেসব শিশু তার কাছে আশ্রিত ছিল, তাদের জন্য নিজের ঘর ছেড়ে দিয়েছিলেন। সুলতান শিশুদের জন্য তৈরি করেছিলেন একটি বড় কাঠের নৌকা। তার অভিলাষ ছিল, সেই নৌকায় চড়ে সমুদ্র পরিভ্রমণে বের হবে দেবদূতেরা। সমুদ্র থেকেই হয়তো খুঁজে নেবে শিল্প চর্চার হীরা-চুনি-পান্না।

সুলতানের ছবিতে প্রাণ পেতো এ ভূখণ্ডের শক্তসমর্থ পুরুষ ও নারীর যৌথ খামার। একইসাথে তার ছবিগুলোতে প্রকাশিত হয় গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের শ্রেণি-দ্বন্দ্ব। তিনি তার ছবির বলিষ্ঠ সাবজেক্টের বিষয়ে বলতেন, ‘আমার অতিকায় ছবিগুলোর কৃষকের অতিকায় অতিকায় দেহটা এই প্রশ্নই জাগায় যে, ওরা কৃশ কেন? ওরা রুগ্ন কেন- যারা আমাদের অন্ন যোগায়। ফসল ফলায়।’

তার ছবিতে নারী চরিত্রগুলো নাজুক নয় বরং কোথাও কোথাও তারা একটু বেশিই সবল আর প্রাণশক্তিতে ভরা। দৈনন্দিন কাজে মত্ত থেকে তারা যেন সূর্যের যাত্রাকে আরও কর্মিষ্ঠা ও স্বতঃস্ফূর্ত করে তোলে। এই ভাবনাগত জরীন জায়গা ছিল সুলতানের ছবি আঁকার প্রেরণা বা অবলম্বন।

চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক নূরুল আলম আতিক এক অনুষ্ঠানে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এস এম সুলতান একজনই। তার তুলনা চলে না ভারতবর্ষের কোনো শিল্পীর সঙ্গে। সাহিত্যে যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, চিত্রকলাতেও তেমনি এস এম সুলতান। তাদের কোনো পূর্বসূরি-উত্তরসূরি নেই। তারা তাদের মতো স্বতন্ত্র।’

১৯৮২ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার পান সুলতান। এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে তাকে ভূষিত করা হয় ম্যান অব এশিয়া হিসেবে। একই বছর একুশে পদকও পান। প্রাপ্তির খাতায় জমা হয় আরও অনেক পুরস্কার। অথচ সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমরা তাকে পর্যাপ্ত মূল্যায়ন করতে পেরেছিলাম? আধুনিক চিত্রশিল্পের বিকাশের কালে কি তিনি শিল্পরসিকদের চোখের আড়ালেই ছিলেন না?

দুনিয়াবিখ্যাত লেখক গুন্টার গ্রাস একবার ঢাকায় এসেছিলেন। শিল্পকলা একাডেমিতে সুলতানের ছবি দেখে যারপরনাই অবাক হয়েছিলেন। ঝাঁকড়া চুলের এই শিল্পীর যথার্থ মূল‍্যায়ন দেখতে না পেয়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন– ‘সুলতানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ হয় না।’ গুন্টার গ্রাসের এই উক্তির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে অনুধাবন করা যায় শিল্পকর্মে সুলতানের অনন্য অবস্থান। এই উক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সুলতান বাংলাদেশের হৃদয়কে ধারণ করেছিলেন..

আহমদ ছফা তার বাঙালি মুসলমানের মন বইতে লিখেছিলেন, ‘বাংলার বদলে সুলতান যদি আরব দেশে জন্ম নিতেন, মরুচারী বেদুইনদের ছবি আঁকতেন। যদি জন্মাতেন নরওয়ে-সুইডেনে, তাহলে সমুদ্রচারী জেলেদের সভ্যতার পথিকৃৎ হিসেবে আঁকতেন। নেহায়েত বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছেন বলেই এই কৃষকদের সভ্যতার জনয়িতা ধরে নিয়ে ছবি এঁকেছেন।’

তিনি নমঃশূদ্র নর-নারীর আদরের গোঁসাই, যিনি সুলতান নাম ধারণ করে ধরাধামে এসেছিলেন। তিনি আধেক ছন্নছাড়া সন্ত, আধেক লক্ষ্মীছাড়া শিল্পী। ইঁদুর-বেড়াল, হাঁস-মুরগী নিয়ে যিনি সংসার পেতেছেন। মনের আনন্দে ছবি এঁকেছেন। ফর্মের নিরীক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে মানুষের ভেতরের শক্তির উত্থানকে গুরুত্ব দিয়েছেন। সভ্যতার সবচেয়ে মূল্যবান পেশিগুলো এঁকেছেন। সুলতান, আপনি আমাদের ক্ষমা কইরেন..

শুঁয়োপোকার মৃত্যুতে প্রজাপতির জন্মশুঁয়োপোকা আন্ডারপাসে ঢুইকা আমরা প্রজাপতি হইয়া যাইআমাদের ঘাম জুড়ায় ‘প্রজাপতি গুহায়’বিরাট বজরায় চইড়া আজও শিশুস্বর্গে যাইতে পারি নাইনারীর কচুরি ধইরা পাড়ি দিতে পারি নাই নড়াই নদীসেইখানে যাইতে পারলে কনফেস করতাম কনফেস..ইউনিফাইড ড্রেস পইরা রোজ দুপুরে আমাদের পাড়া দিয়াহাইটা যাইতো যে সরল গোঁসাই,আমরা ‘রেলগাড়ি’ বইলা পেছন পেছন ছুটতামআস্তাকুঁড়ের রাস্তাকুকুররে নিয়ম কইরা ঢিল মারতামরঙ মাখাইয়া সঙ সাজাইতামঅথচ তার পেট ভরাইতে পারি নাইনা খায়া না খায়া শেষতক মইরাই গেলো একদিন!

তুমি আমারে ক্ষমা কইরো সুলতানতোমার শোভা বাড়াইসি কারওয়ান বাজার আন্ডারপাসেতোমার শোভা বাড়াইসি সোনারগাঁয়ের বাউল বাগানেতবু আমি কনফেস করি—তুমি আমারে ক্ষমা কইরো সুলতান..

Comments

0 total

Be the first to comment.

বৃষ্টিতে ভিজতে আর বাধা নেই JamunaTV | মতামত

বৃষ্টিতে ভিজতে আর বাধা নেই

হামীম কেফায়েত ⚫কোটাবিরোধী আন্দোলনের শুরুতে আমি বিরক্ত ছিলাম। দুইদিন পরপর রাস্তাঘাট বন্ধ, হট্টগোল আম...

Aug 05, 2025

More from this User

View all posts by admin