শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে কালিকাপ্রসাদের স্মৃতিচারণা

শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে কালিকাপ্রসাদের স্মৃতিচারণা

২০০০ সালে একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ‘মানুষ’ কথাটা জোর দিয়ে বললাম। সত্যিকার অর্থেই মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমি বাউল বা ফকিরি পরম্পরায় দীক্ষা নিইনি। কিন্তু মনে মনে এই মানুষটাকে আমার মুর্শিদ মানি। তাঁর নাম বাউল শাহ আবদুল করিম। সিলেটের সুনামগঞ্জের ধলগ্রামে তাঁর বাড়ি ছিল। তাঁর সঙ্গে যে আমার দীর্ঘদিন দেখা হয়েছে, দীর্ঘ সময় তাঁর সঙ্গে থেকেছি, তা নয়। এখন বুঝি, তাঁর সঙ্গে আমার জীবনের কোথাও একটা সূত্র গাঁথা আছে। নইলে যখন শাহ আবদুল করিমকে চিনতামও না, তখন তাঁর গান শিখেছি। আমি সেই অর্থে প্রথম লোকসংগীত শিখি আমার ছোট কাকার কাছে। এক অর্থে যাঁর জন্য দোহার করা। তাঁর মৃত্যুর পর দোহারের জন্ম। তিনি একজন বড় সংগ্রাহক ছিলেন—অনন্ত ভট্টাচার্য। তাঁরও এ রকম একটি দল ছিল। আমাদের যেমন দোহার। তাঁর কাছে জীবনের প্রথম যে গানটি শিখেছিলাম, পরে জানলাম, এটা হচ্ছে শাহ আবদুল করিমের গান। গানটা হচ্ছে, ‘আরে তোমার কি মায়া লাগে না, আমার দুঃখ দেখিয়া, প্রাণ বন্ধুয়া রে...।’তাঁর কাছে এটা আমার প্রথম লোকসংগীত শেখা। বাড়িতে বড় হতে হতে নানান গান কানে এসেছে, সেটা অন্য কথা। কিন্তু সামনে বসে যেটা শেখা, সেটা এই গান। লোকসংগীতে গানের ভণিতা বলে একটা ব্যাপার আছে। সাধারণত গানে লোককবি, বাউল, ফকির এঁদের নাম উচ্চারিত হয়—ওই যে এই করিম কয়, ‘তোমার কাছে মায়া যদি পাই’। তখন এটা, লালন বলে, হাসন বলে যে রকম করে গায়, সে রকমই গেয়েছি।পরে যখন একটু কলেজে পড়ি, তখন জানতে পারলাম, এই লোকটা জীবিত। সেটাই আমার প্রথম একটা বিরাট বিস্ময় হয়েছিল যে আমরা অমুক বলে, তমুক বলে যে কথাগুলো বলি, এঁদের কাউকে আমরা দেখিনি কোনো দিন।

এবার প্রথম ২০০০ সালে দেখলাম, একটা লোক নিজের মুখে বলছে, বাউল আবদুল করিম বলে, এটা যে কী বিস্ময় আমার কাছে! তার নিজের গান নিজে গাইছে। প্রতিটি গান ভণিতাযুক্ত। এই যে ‘বলে বলুক লোকে মন্দ, এতে ক্ষতি নাই, এই করিম কয় তোমার কাছে মায়া যদি পাই।’ করিম নিজেই বলছেন নিজের কথা। প্রথম তাঁকে দেখার এটা একটা বিস্ময় ছিল। তাঁর সম্পর্কে আমি জেনে গেছি এর আগেই। তাঁর সম্পর্কে নানান লোক লিখেছেন। তিনি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের একজন ফেনোমেনন এবং এই সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো বাউল পদকর্তা, ফকির পদকর্তা এ রকম সমস্ত গান লিখেছেন, ভাবা যায় না। কয়েকটা কথা তাঁর সম্পর্কে না বললেই নয়। আমি যে তাঁর সম্পর্কে সব জানি, সেটা তো নয়।

তাঁর জন্ম ধরুন ১৯১৬ সালে। সেটাও খুব ইম্পর্ট্যান্ট নয়। তাঁর জন্ম আজকেও হতে পারত। আমার মনে হয়, অনেক গান তিনি গতকাল লিখে দিয়ে গেছেন। এমন সব গান তিনি লিখে দিয়ে গেছেন। আর আরেকটা বিচিত্র ব্যাপার আমি ভাবছিলাম। আমাদের যে বাউল ফকিরি ট্র্যাডিশন যেটা আছে, পরম্পরা যেটা আছে, অনেকে সেটাকে লোকসংগীত বলেন না। এটারও কারণ আছে। এটা একটা দীর্ঘ যুক্তিতর্কের বিষয়। যাঁরা বলেন, তাঁরা একটা বড় কারণে বলেন।এই যে গানগুলোর সুর হয়, সেটা তাঁর অঞ্চলের লোকসুর হয়। মানে আপনি লালনের গান যখন গাইবেন, দেখবেন এই গানে কীর্তনের প্রভাব আছে।নদীয়ায় কীর্তনের একটা ঐতিহ্য আছে। আপনি রাঢ়ের যখন বাউলগান শুনবেন, দেখবেন ঝুমুরের প্রভাব আছে। কারণ, এই অঞ্চলের সুর হচ্ছে ঝুমুর বা আগে শাহনূর, হাসন রাজা, শীতালং শাহ, এঁদের গানে ভাটিয়ালি প্রভাব আছে। শাহ আবদুল করিমকে বলাই হয় ভাটির পুরুষ বলে। সুনামগঞ্জে যে অঞ্চলে তাঁর বাড়ি, প্রতিবার বন্যায় ভেসে যায়। অঞ্চলের সুর আছে বটেই, কিন্তু তাঁর নিজের কম্পোজিশন আছে গানগুলোতে। এটা কিন্তু সচরাচর বাউল পদকর্তারা করেন না। নিজে যে সুরটাকে বাঁধছেন, প্রতিটি গানে আলাদা করেন তিনি।হাসন রাজার গানের একটা ধরন। হাসন রাজার গান ওই সুরেই হয়। লালনের গানের একটা ধরন। তারপর যখন শিল্পীরা আসেন এই গানগুলো গাইতে, ধরুন লালনের গানে ফরিদা পারভীন আসছেন বা এ রকম বড় বড় শিল্পী। তাঁরা এটাকে একটু এদিক-ওদিক করেন। মানে সুর পাল্টান আমি বলছি না বা হাসন রাজার গানে যেমন বিদিতলাল দাস করেছেন। ওই ধরনটাকে তিনি আরও পরিমার্জন–পরিবর্ধন যা-ই বলুন, সেটা করেন। কিন্তু শাহ আবদুল করিম নিজের সুরেরও স্রষ্টা। সুরের স্রষ্টা এ রকম। তাঁর বোধটা এমন জায়গায়। যেমন একটা বিখ্যাত গান। আমরা এটা শুনি এভাবে, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম আমরা, আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম...।’ এই গানটা কিন্তু শাহ আবদুল করিমের সুর নয়, লেখা তাঁর। এই সুরটা দিয়েছেন আরেকজন বিখ্যাত শিল্পী বিদিতলাল দাস। যাঁকে পটলদা বলে সবাই ডাকত।

একবার সিলেটে হয়েছে কি, আমরা গিয়েছি। শাহ আবদুল করিম নিজে গাইতে বসেছেন। তিনি কিন্তু পটলদার সুরে গানটা গাওয়া শুরু করেছেন। তাঁকে বললাম, ওস্তাদজি, আপনি এটা কী করছেন? আপনার নিজের সুর ভুলে আপনি গাইছেন। বললেন, না, ওই সুরটা এত চলে, আমার মাথায় এসে গেছে।তাঁকে বললাম, আচ্ছা, আপনার কষ্ট হয় না? আপনার সুরটা জনপ্রিয় না হয়ে পটলদার সুরটা জনপ্রিয় হয়ে গেল। তিনি একটা দারুণ কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘দেখো, আমরা যে বাউল বা ফকির যাদের বলি, আমরা যে গান লিখি, আমরা প্রচার করার জন্য গান লিখি। আমাদের কাছে কথাগুলো খুব জরুরি।’ মোদ্দাকথা যেটা বলতে চেয়েছিলেন, একটা মতাদর্শ আছে আমাদের বাউলের। আমরা আসলে ওটাকে প্রচার করি। পটলবাবু যে সুরটা দিয়েছেন। তিনিও ভাটি অঞ্চলের লোক। বড় শিল্পী। তিনি যে সুরটা দিয়েছেন, তিনি ভালো একটা শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। যে তিনি কিন্তু কোনো ‘পরদেশি’ সুর দেননি। আমার দেশের সুরই দিয়েছেন। তাতে গানটা আমার ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আমার যদিও শাহ আবদুল করিমের সুরটা ভালো লাগে। ওটার মধ্যে একটা প্যাথোজ আছে। ‘গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু মোসলমান...’, এটা হলো শাহ আবদুল করিমের সুর।

এ রকম অনেক কথা হয়েছে টুকরো টুকরো। পটলদার কথাই বললাম রাতের বেলা। আমি বললাম, আচ্ছা, এই যে আপনিও লোকসংগীত গান, পটলবাবুও লোকসংগীত গান, তফাত কী? আমাকে বললেন, তুমিও তো লোকসংগীত গাও, তফাত কী? মজার লোক। আমি বললাম, না, আপনাদের সঙ্গে আর আমার নাম উচ্চারণ হয় নাকি। বললেন, তফাত আছে।আমি কেন তোমার কথা বললাম, ধরো একটা জায়গায় গাইতে গেছ। গিয়ে দেখলে এক হাজার লোক সেখানে ধরে। তুমি দেখলে তিনজন লোক তোমার গান শুনতে এসেছে। গাইতে পারবে? আমি বললাম, না, খুব কষ্ট হবে। গাইতেই পারব না। আমি বলব, না, গাইব না। তিনি বললেন, আমি হলে গাইতাম। আমি হলে গাইব। কারণ, ওই যে বললাম আমি বাউলের কথা প্রচার করি এবং এটা আমাকে গাইতে হবে। ওই তিনটা লোককে যদি আমি বোঝাতে পারি আমার কথা।আমি বললাম, বাউলের কথা প্রচার করে কী হবে? বিশ্বাস করুন, আমি এক বর্ণ বাড়িয়ে বলছি না। তিনি যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবীটা একদিন বাউলের পৃথিবী হয়ে যাবে।’ এ কথাটা বলেছিলেন শাহ আবদুল করিম এবং তাঁর চোখে যে বিশ্বাস, মানে যুগ যুগ ধরে আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, আমাদের দেশের কোনো রাষ্ট্রপতি, কোনো প্রধানমন্ত্রীর চোখে এই বিশ্বাস নেই। কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন। আমরা অনেক কথা অনেক নেতার মুখে শুনি, নেতা কথাটা এ কারণে বললাম, তাঁরা তো একটা দেশ চালনা করেন কিন্তু তাঁরা বিশ্বাস করে বলেন না কথাগুলো। তাঁরা বলতে হয় বলে বলেন। নয় নিজের স্বার্থে বলেন। নয় লোককে ভুল বোঝানোর জন্য বলেন। আর এই যে মানুষটা, যাঁর প্রায় চালচুলো নেই। শাহ আবদুল করিম, এত তাঁর সম্মান! জীবনে মাত্র একুশে পদকটা নিয়েছিলেন। এটাও অনেক কষ্টে তাঁকে নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। বাংলাদেশের শিল্পীদের সর্বোচ্চ যে সম্মান দেয়, একুশে পদক। এ ছাড়া কোনো দিন কোনো দানদক্ষিণা, খয়রাতি জীবনে কোনো দিন নেননি শাহ আবদুল করিম। কারোর কাছ থেকে না। কারণ, তিনি এটাকে অন্যায় মনে করতেন।

তাঁকে নিয়ে আমি কেন বলছি এত কথা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শাহ আবদুল করিমকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তার মানে একজন বাউল আন্দোলন করতে গিয়েছিল। তার মানে রবীন্দ্রনাথের আরেকটা ধনঞ্জয় বৈরাগী। যেটা আমরা বাউলদের মধ্যে আজকে খুঁজে পাই না। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তাঁর একটা বাউল তৈরি করেছিলেন। এই বাউল যে আধ্যাত্মর কথাও বলে, দেহতত্ত্বের কথাও বলে, আবার অন্যায় হলে তার প্রতিবাদেও দাঁড়ায়। লালনের কথা যেমন আমরা জানতাম যে ঠাকুরবাড়ির লেঠেলরা আক্রমণ করেছিল, লালন লাঠি হাতে কাঙাল হরিনাথের পক্ষে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। শোনা কথা। এর কোনো প্রামাণ্য নথি নেই। কিন্তু শাহ আবদুল করিম কিন্তু এটাই। নইলে এটা তো বাউলের ব্যাপার নয়। নইলে শাহ আবদুল করিম এটা লিখতে পারেন, ‘জীবন আমার ধন্য যে হায়/ জন্মে বাংলা মায়ের কোলে।/ বাংলা মায়ের ছেলে।/ আমি বাংলা মায়ের ছেলে...।’বাউলের তো সেটার কোনো দরকার নেই। বাংলা হোন, আসাম হোন। তাঁর তো তত্ত্ব অন্য জায়গায়। ওই তত্ত্বের জায়গা থেকে শাহ আবদুল করিম একটা অন্য জায়গায় গিয়েছিলেন। যেখানে দেখুন তিনি বিশ্বাস করছেন, একটা গান আছে তাঁর, ‘আরে মন মজালে ওরে বাউলা গান। যা দিয়েছ তুমি আমায়, কী দিব তার প্রতিদান।’ তারপরে তো চলছে গানটা এশেক দিল দরিয়ার পানে অমুক তমুক তত্ত্বকথা। শেষে গিয়ে বলছেন, ‘তত্ত্বগান গেয়ে গেলেন যাঁরা মরমি কবি, আমি তুলে ধরি দেশের দুঃখ-দুর্দশার ছবি। বিপন্ন মানুষের দাবি, করিম চায় শান্তি বিধান। মন মজালে ওরে বাউলা গান।’ এটা হচ্ছে শাহ আবদুল করিম। যার জন্য তিনি লিখতে পারেন, ‘এই দেশেতে স্বার্থপরদের চলেছে রঙ্গের খেলা, কোনো কাজে গেলেই বলে খোশদালা, কী জ্বালা।’

এই যে জগৎটাকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে দেখা এবং গুহাবাসী হয়ে নয়। ভাবতে পারেন, শাহ আবদুল করিম একটি সংস্থা বানিয়ে ফেলেছিলেন। সুনামগঞ্জের তাঁর গ্রামে। যার নাম ছিল ‘বাঁচতে চাই’। এবং মাঠে মাঠে, ঘাটে ঘাটে মালজোড়া গান করতেন। আমরা এটাকে যেখানে কবিগান বলি, তাঁর অঞ্চলে সেটাকে বলে মালজোড়া গান। দুজনের লড়াই হয়, তর্ক হয়।রশিদ উদ্দিন, দুর্বিন শাহ—এঁদের সঙ্গে তত্ত্বগানের আসরে পাল্লা দিতেন এবং অসামান্য একজন কী বলব, যদি কম্পোজার বলেন কম্পোজার, যদি দার্শনিক বলেন দার্শনিক। ছোট্ট একটা সুর দেখবেন। ছোট্ট একটু জায়গার মধ্যে কী কাজ, ‘আরে কেমনে ভুলিব আমি/ বাঁচি না তারে ছাড়া/ আমি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা/ সখী গো।’ ছোট ছোট সুর। বড় অর্থে বললে এগুলো ভাটিয়ালি এলাকার সুরই। কিন্তু এই যে প্রত্যেকটা গানে তিনি আলাদা করে সুর দিচ্ছেন। কোনোটাতে সুরের বড় বিস্তৃতি। কোনোটাতে ছোট্ট অল্প একটু জায়গায় গানটাকে বাঁধার চেষ্টা করছেন এবং সেই সঙ্গে তাঁর দর্শনের জায়গা।এই যে জায়গাগুলোকে বলা। আমি সত্যি বলছি, শাহ আবদুল করিমকে দেখা জীবনের একটা ঘটনা। দুবার আমি দেখেছি, তাঁর কাছ থেকে ফিরে আসার পর, আমার শুধু এটাই মনে হতো, আমার যত প্রিয় মানুষ আছে পৃথিবীতে, তাদের যদি একবার শাহ আবদুল করিমকে দেখাতে পারতাম। আরেকটা দৃষ্টি চোখের। বিশ্বাস করুন। এ রকম দৃষ্টি আমি তো প্রায় দেখিইনি। মানে বেশি সময় তাকানো যেত না। কারণ, একটা নির্লিপ্ততা আছে। পুরো দৃষ্টিটাই নির্লিপ্ত। আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবেন, আপনি ভাববেন তিনি আসলে কার দিকে তাকিয়ে আছেন।

অদ্ভুত একটা দৃষ্টি এবং নিজের সাধনা নিয়ে, তত্ত্বজ্ঞান নিয়ে বড়াই অমুক-তমুক কিছু নেই। আপনি যে প্রশ্ন করুন, উত্তরও দেবেন খুব সাধারণভাবে, সাধারণ করে। যেভাবে বুঝিয়ে দেওয়া যায়, সেভাবেই বুঝিয়ে দেবেন। তাঁকে বলেছিলাম, আপনি তো দোতারা বাজিয়ে গান, আপনার শিষ্য রুহি ঠাকুর ভায়োলিন বাজিয়ে গায়। ওটা তো একটা বিদেশি যন্ত্র। তাঁর প্রচুর গান বাংলাদেশের ব্যান্ডগুলো জনপ্রিয় করেছে। ব্যান্ডের গান হিসেবে হয়ে গেছে। ব্যান্ডে গাইলে আপত্তি করেন কেন? বলেন, ‘ব্যান্ডে তো আমার কথাই বোঝা যায় না। আমার তো গানটা এখানেই হারিয়ে যায়। আমি তো গান হারাতে চাই না।’ আর বলেছিলেন অসাধারণ একটা কথা। বলেছিলেন, ‘রুহি যে ভায়োলিন বাজায়, এটা তো ভায়োলিন নয়। ওটা আমাদের দেশে বেলা বলে। ও ভায়োলিনটাকে বেলা বানিয়ে ফেলেছে। যেদিন এসব গিটার-টিটারকে বাউলরা তাদের মতো করে বানিয়ে নেবে, গাইবে। আমার কোনো আপত্তি নেই।’ এই যে দৃষ্টিট। সত্যি রুহিদা যখন ভায়োলিন বাজাত, মনে হচ্ছে সারিন্দা বাজাচ্ছে। কেউ তো গিটার এ রকম বাজাতেই পারে। যে বাজানোতে বাউলগান নষ্ট করবে না। তাঁর মূল জায়গা ছিল, ‘বাবা, আমার গানটাকে নষ্ট করবে না। গানটা আমার। গানটা আমি কষ্ট করে লিখেছি।’তো শাহ আবদুল করিম সম্পর্কে কথা বললে দুটো মুশকিল । প্রথমত, আমি ইমোশনাল হয়ে যাই। দ্বিতীয়ত, তাঁর কথা আসলে বলে শেষ করার নয়। গানেই তাঁকে আরেকবার ডাকি, ‘কাছে নেও না দেখা দেও না/ আর কত থাকি দূরে/ কেমনে চিনিব তোমারে/ মুর্শিদ ধন হে।’তাঁকে চেনা ফুরোবে না। ফুরোক, সেটা আমরা চাই না। আমি চাই আমৃত্যু তাঁকে যেন চেনার জন্য ছুটতে থাকি।(প্রথম আলোতে প্রকাশিত লেখা থেকে সংকলিত। মূল সূত্র: দ্য মিউজিয়ানা কালেক্টিভ ইউটিউব চ্যানেল)

বাউলসাধক শাহ আবদুল করিমের চলে যাওয়ার দিন আজ। অন্যদিকে গতকাল ছিল ভারতের দোহার ব্যান্ডের ভোকাল, লোকগবেষক কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের জন্মদিন। দীক্ষা না নিয়েও নিজেকে শাহ আবদুল করিমের শিষ্য মনে করতেন কালিকা। কয়েক বছর আগে মিউজিয়ানার একটি অনুষ্ঠানে গুরুকে স্মৃতিচারণা করেছিলেন কালিকাপ্রসাদ। মূল্যবান সেই স্মৃতিচারণা নিয়ে লেখাটি শাহ আবদুল করিমকে স্মরণ করে আবার প্রকাশ করা হলো।

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin