‘পশুর ডাক্তার’ বলে ডাকা কমছে, তবে...

‘পশুর ডাক্তার’ বলে ডাকা কমছে, তবে...

‘পশুর ডাক্তার’ থেকে এখন অনেকে ‘ভেট’ বলে ডাকেন। মা–বাবারা ভেটদের কাছে সন্তান বিয়ে দিতে আপত্তি করছেন না। আগে গোয়ালঘরে চিকিৎসার কাজ করে হাত ধোয়ার সাবান পর্যন্ত পাওয়া যেত না। আর এখন চিকিৎসাসেবা শেষ করার পর ড্রয়িংরুমে আপ্যায়নও পাওয়া যায়।

কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) চিকিৎসক গোপাল চন্দ্র বিশ্বাস। বাংলাদেশে প্রাণী চিকিৎসকদের অবস্থা ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে বলে জানালেন তিনি। তবে পেশাগত বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রাণী চিকিৎসকেরা মোটাদাগে কয়েকটি চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন। এগুলো হলো চাকরির সীমিত পরিসর। জনবলের তীব্র সংকট। দক্ষ জনবলের স্বল্পতা। প্রাণীভেদে বা সমস্যাভেদে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি। এই চিকিৎসাসেবাকে এখনো জরুরি পরিষেবার আওতায় না আনা। পেশায় ঝুঁকি ভাতা না থাকা।

বর্তমানে দেশের সরকারি-বেসরকারি ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভেটেরিনারি মেডিসিনে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ আছে।

বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলের তথ্য বলছে, ১৫ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছেন।

২০১৯ সালের বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিল আইনে বলা আছে, নিবন্ধন ও সনদ ছাড়া কেউ ভেটেরিনারি চিকিৎসক বা ভেটেরিনারি প্র্যাকটিশনার বলে পরিচয় দিতে পারবেন না।

১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা ১০ হাজার ২৯৩ জন।

ভেটেরিনারি গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) বিশেষায়িত ক্যাডার (পশুসম্পদ) রয়েছে।

বিসিএস ছাড়ও বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে ভেটেরিনারি গ্র্যাজুয়েটরা প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে—প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, বন অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা।

ভেটেরিনারি কাউন্সিল আইনে ভেটেরিনারি ক্লিনিক, সেবাকেন্দ্র, খাদ্য ও ওষুধসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, জবাইখানা, প্রজননসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, প্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্র বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার বিষয়টিকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে। এতে বেসরকারি পর্যায়ে চাকরির বাজার সৃষ্টি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক চিকিৎসক সফিউল আহাদ সরকার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে চাকরির বাজার সেভাবে বাড়েনি। তা ছাড়া প্রাণী চিকিৎসকদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের সুযোগও কম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্স–রেসহ এমন বিষয়গুলোতে প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করতে পারে। এতে প্রাণীচিকিৎসকদের দক্ষতা বাড়বে।

রোগনির্ণয়, চিকিৎসা, রোগের প্রাদুর্ভাব রোধ, অস্ত্রোপচার, রোগতত্ত্ব গবেষণা, নতুন জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়নসহ প্রাণীর উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রাণী চিকিৎসকদের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

প্রাণী থেকে মানুষের দেহে সংক্রমিত বিভিন্ন রোগ (জুনোটিক) প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রণেও প্রাণী চিকিৎসকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তা ছাড়া মানুষের প্রাণিজ প্রোটিন ও আমিষের চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও তাঁদের অবদান আছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষ এবং ৫০ শতাংশ পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল। এই অর্থবছরে ১০ দশমিক ৫১ কোটি হাঁস-মুরগি, ১ দশমিক ২৮ কোটি গবাদিপশু ও ৭১ হাজার ৪৪৯টি পোষাপ্রাণীর চিকিৎসা দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। এতে প্রাণিসম্পদ সুরক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন বেড়েছে।

প্রতিবছর এপ্রিল মাসের শেষ শনিবার ‘বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস’ পালিত হয়। দিবসটির পালানোর মূল উদ্দেশ্য ভেটেরিনারি পেশার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। পাশাপাশি প্রাণী চিকিৎসকদের অবদানকে সম্মান জানানো।

কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতালে চিকিৎসকসহ জনবলের স্বল্পতা থাকার কথা জানালেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক চিকিৎসক মো. আবদুল আজিজ আল মামুন। তিনি বলেন, তাঁর হাসপাতালে জনবলের স্বল্পতা আছে। ক্যাডারভুক্ত চারটি সার্জনের পদ এক বছরের বেশি সময় ধরে ফাঁকা। নন-ক্যাডারের দুটি পদও ফাঁকা। পুরোদমে সেবা দেওয়ার জন্য জনবল বাড়ানো জরুরি।

দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রাণী বা প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গভেদে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে না বলে জানালেন প্রাণী চিকিৎসকেরা। কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতালের অতিরিক্ত ভেটেরিনারি কর্মকর্তা চিকিৎসক নাজমুল হুদা। তিনি আগে ১১ বছর জাতীয় চিড়িয়াখানায় বাঘ, হাতিসহ বিভিন্ন প্রাণীর চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। কাজ করতে করতে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছেন। তাই কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতালে ঘোড়া, কচ্ছপ, হরিণ বা অন্য পশুকে চিকিৎসার জন্য আনা হলে শুধু তাঁরই ডাক পড়ে বলে জানান তিনি।

বিশেষায়িত ডিগ্রি দিতে বাংলাদেশ কলেজ অব ভেটেরিনারি সার্জনস যাত্রা শুরু করেছিল ২০১৯ সালে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এখন বন্ধ আছে।

বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলের তথ্য বলছে, ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পুরুষ প্রাণী চিকিৎসকদের বিপরীতে নারী ছিলেন ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) গোপাল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের সময়ে আমরা ৬০ শিক্ষার্থী ছিলাম। এর মধ্যে মেয়ে ছিল মাত্র তিনজন। এখন নারী প্রাণী চিকিৎসকদের হার প্রায় ৩০ শতাংশ।’

সমাজে নারী প্রাণী চিকিৎসকদের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতালের ভেটেরিনারি সার্জন মো. আসাদুজ্জামান বলেন, তিনি তাঁর সহপাঠী শরীফা খাতুনকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেছেন। শরীফা বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠানের ল্যাবে কাজ করছেন।

বেসরকারি সংগঠন পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের (প ফাউন্ডেশন) রাজধানীর মিরপুরের প লাইফ কেয়ার ক্লিনিকে পেট অ্যানিমেল প্র্যাকটিশনার হিসেবে আছেন সারাবান তহুরা। তিনি দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেন।

সারাবান তহুরা বলেন, মানুষের চিকিৎসক হওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করেছিলেন। তবে সুযোগ পাননি। তখন প্রাণীচিকিৎসা নিয়ে পড়তে চাইলে তাঁর বাবা উৎসাহ দেন।

দেশে নারী প্রাণীচিকিৎসকের সংখ্যা বাড়লেও সমাজে দৃষ্টিভঙ্গিগত কিছু সমস্যা আছে বলে উল্লেখ করেন সারাবান তহুরা। তিনি বলেন, ‘অনেকে প্রথমেই বলেন, ওহ আচ্ছা, গরু-ছাগল নিয়ে কাজ করেন। পরামর্শ-টরামর্শ দেন। আমরা প্রাণীর ক্যানসারসহ অন্যান্য চিকিৎসাও যে করতে পারি, তা বিশ্বাস করতে যেন বেশ কষ্ট হয় মানুষের। পড়াশোনা করার সময়ও শুনতে হয়েছে, তুমি মেয়েমানুষ, গরু-ছাগল সামলাতে পারবে?’

একই ক্লিনিকে ভেটেরিনারি সার্জন হিসেবে কাজ করছেন আরিফা আক্তার। তিনি চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্জারিতে এমএস করেছেন। এ পেশায় আসার জন্য পারিবারিক সমর্থন পেয়েছেন বলে জানালেন। তবে তিনি বলেন, সব হাসপাতাল বা ক্লিনিকে না হলেও সামগ্রিকভাবে এ পেশায় এখনো পরিশ্রমের তুলনায় বেতন কম।

প্রাণীর চিকিৎসায় চ্যালেঞ্জ বেশি থাকে বলে জানালেন চিকিৎসকেরা। কারণ, চিকিৎসার সময় প্রাণীর আক্রমণের শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তা ছাড়া প্রাণী থেকে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিও আছে।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে আহত হাতিকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে গত গত ১৫ আগস্ট বন বিভাগের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি অফিসার হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকারনাইন ও গাজীপুর সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন মো. মোস্তাফিজুর রহমান আহত হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য পরে এই দুই প্রাণী চিকিৎসককে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হয়।

হাতেম সাজ্জাত প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর ১০টি হাতির চিকিৎসা করলেও এমন কিছু হয়নি। এবার ঘটল। তবে যেকোনো মুহূর্তে অঘটন ঘটতে পারে। এ ধরনের প্রাণীর চিকিৎসায় প্রটোকল মানতে হয়। যথাযথ প্রশিক্ষণ থাকতে হয়; আর ঝুঁকি ভাতা থাকাটা জরুরি।

বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) গোপাল চন্দ্র বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, প্রাণী চিকিৎসকদের কাজের ক্ষেত্রে দিন-রাত কিংবা ছুটির দিন বলে কিছু নেই। প্রসব করানোর জন্য রাতেও চিকিৎসকদের ছুটে যেতে হতে পারে। চিকিৎসকদের কাজ করতে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এই পেশাকে জরুরি পরিষেবার আওতায় রাখা হয়নি। উপযুক্ত স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আর ঝুঁকি ভাতা পাওয়া তো অনেক দূরের বিষয়। এগুলো বিবেচনা করা উচিত।

Comments

0 total

Be the first to comment.

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে হাইকোর্টের চার বিচারপতির বিষয়ে তদন্ত চলছে Prothomalo | বাংলাদেশ

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে হাইকোর্টের চার বিচারপতির বিষয়ে তদন্ত চলছে

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারকাজ থেকে বিরত রাখা হাইকোর্ট বিভাগের ১২ বিচারপতির মধ্যে ৪ বিচারপতির বিষয়ে...

Sep 13, 2025
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর সঙ্গে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের বৈঠক Prothomalo | বাংলাদেশ

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর সঙ্গে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের বৈঠক

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin