প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার

প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার

সড়ক পরিবহনব্যবস্থায় সীমাহীন নৈরাজ্য আমাদের জাতীয় ও নাগরিক জীবনে কতটা দুঃসহ যন্ত্রণা আর ক্ষতির কারণ হচ্ছে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কতটা মাথাব্যথা আছে, সেটা সব সময়ই একটা বড় প্রশ্ন। গত শনিবার যাত্রী কল্যাণ সমিতি বিগত ১১ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির যে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, সেটা যারপরনাই উদ্বেগজনক। প্রতিদিন সড়কে মারা যাচ্ছেন ২২ জন, আহত হচ্ছেন ৩৮ জন। হতাহতের এই চিত্র নিশ্চিতভাবেই পূর্ণাঙ্গ নয়; কিন্তু এই পরিসংখ্যানই নাগরিকের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি সরকারের জন্য দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কবার্তা।

বাংলাদেশে সড়কের যে অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্য বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে, তার দায়টা পুরোপুরি রাজনৈতিক। আমরা সব সময়ই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, পরিবহনমালিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে একটা অশুভ ও শক্তিশালী নেক্সাস গড়ে উঠতে দেখি। ফলে এই খাত হয়ে ওঠে যাত্রীদের জিম্মি করে একটি গোষ্ঠীর চাঁদাবাজি ও অবৈধভাবে অর্থ আয়ের একটি জায়গা।

চূড়ান্ত মূল্য দিয়ে সড়কের অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্যের খেসারত দিতে হয় নাগরিকদের। ২০১৮ সালে দুই বাসের পাল্লাপাল্লিতে ঢাকায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে যে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেটা নজিরবিহীন। সেই আন্দোলনের ব্যাপকতা ও স্বতঃস্ফূর্ততাই প্রমাণ দেয়, নাগরিকেরা এই খাতের সংস্কারের জন্য কতটা মুখিয়ে আছেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৩ মাস পেরিয়ে গেলেও সড়ক পরিবহন খাতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার শুরু না হওয়াটা আশাভঙ্গের মতো একটা ব্যাপার।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য জানাচ্ছে, গত ১১ বছরে দেশে সড়কে ৬২ হাজার ৬১৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৮৬ হাজার ৬৯০ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৫৭ জন। শুধু ঢাকায় প্রতিদিন যানজটে নষ্ট হচ্ছে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা। বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি ৯৮ হাজার কোটি টাকা, জ্বালানি অপচয় ১১ হাজার কোটি টাকা। যানজটের কারণে সংসার ভাঙার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

দীর্ঘ যানজট নাগরিকের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট, হৃদ্‌রোগ, ক্যানসারসহ নানা রোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ ও পারিবারিক অশান্তি দেখা দিচ্ছে। উদ্বেগজনক ব্যাপার হচ্ছে, যানজটের নানা নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের মিছিল ও যানজটের অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি থেকে নাগরিকদের মুক্তি দিতে গেলে রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তিশালী অঙ্গীকার প্রয়োজন। সড়ক পরিবহনব্যবস্থায় পুরোনো যে বন্দোবস্ত চালু রয়েছে, তার অবসান প্রয়োজন। গণপরিবহনকে কেন্দ্রে রেখে একটি সুশৃঙ্খল পরিবহনব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে উন্নত গণপরিবহন অন্তর্ভুক্ত করার যে দাবি জানিয়েছেন, তার সঙ্গে আমরা সহমত পোষণ করি।

ভুল নীতি ও দুর্নীতি পরিবহন খাতকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গেছে। ফলে বিক্ষিপ্ত কোনো উদ্যোগ আদতেও কোনো ফলাফল নিয়ে আসতে পারবে না। সড়ক পরিবহনব্যবস্থাকে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সংস্কারের পথ খুঁজতে হবে। দুর্ঘটনা রোধ ও যানজট কমিয়ে আনাকেই এ খাতের মেগা প্রকল্পে পরিণত করতে হবে।

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin