প্রাকৃতিক দুর্যোগে বছরে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০-৬০ লাখ মানুষ

প্রাকৃতিক দুর্যোগে বছরে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০-৬০ লাখ মানুষ

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন ও ভূমিধ্বসের মাত্রা বাড়ছে। এসব দুর্যোগে প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব ঘটনায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব ফেললেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক সেবা কার্যত অনুপস্থিত। দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আছেন একজনেরও কম।

বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) রাজধানীতে এডাব (অ্যাসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট অ্যাজেন্সিজ ইন বাংলাদেশ) আয়োজিত ‘দুর্যোগ ও সংকটকালে মানসিক স্বাস্থ্য’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এডাব’র সভাপতি কাজী বেবী। আর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক ও উৎস’র নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কামাল যাত্রা।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশ একটি দুর্যোগ প্রবণ ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রায় প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন ও ভূমিধ্বসের মাত্রা বাড়ছে। এসব ঘটনার মানসিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি; বিশেষ করে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের ওপর।

উদাহরণ হিসেবে মোস্তফা কামাল যাত্রা বলেন, ২০২২ সালের সিলেটের ভয়াবহ বন্যার পর অনেক পরিবার উদ্বেগ, নিদ্রাহীনতা ও হতাশায় ভুগেছে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা আসার সময় হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানসিক অস্থিতিশীলতার শিকার হন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সমাজের সব শ্রেণির মানুষ মানসিক চাপে আক্রান্ত হয় ভয়, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, কর্মহীনতা ও শোকের কারণে। এসব প্রমাণ করে, দুর্যোগ ও সংকট শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, মানসিক স্বাস্থ্যও একটি বড় মানবিক সংকট।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক ‘জুলাই আন্দোলন’ ও এর পরবর্তী সহিংসতা, প্রাণহানি ও সামাজিক অস্থিরতা বাংলাদেশের প্রায় সব স্তরের মানুষের মনে গভীর মানসিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। তরুণ প্রজন্ম বিশেষভাবে এই পরিস্থিতিতে আঘাত, ভীতি ও হতাশার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। অনেক পরিবার তাদের সন্তান বা প্রিয়জন হারানোর শোকের মধ্যে রয়েছে, অন্যদিকে অনেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দমন, ভয় ও অনিরাপত্তা বোধে ভুগছে।

নারীরা দুর্যোগকালে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর একটি। দুর্যোগের সময় ও পরবর্তী পুনর্বাসন পর্বে তারা একাধিক ঝুঁকির মুখে পড়ে। যেমন—লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও শোষণ বৃদ্ধি পায় আশ্রয়কেন্দ্র, ত্রাণ বিতরণ এলাকা বা বাস্তুচ্যুত অবস্থায়। গর্ভবতী, স্তন্যদানকারী মা ও কিশোরীরা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা না পাওয়ায় শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। মানসিকভাবে তারা ভয়, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা, ও হতাশা অনুভব করে বলেও মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

মোস্তফা কামাল যাত্রা আরও বলেন, শিশুরা দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কারণ তাদের মানসিক সহনশক্তি ও বোধবুদ্ধি সীমিত। পরিবারের সদস্য হারানো, ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়া, স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি ঘটনায় তারা শোক, ভয়, দুঃস্বপ্ন, ঘুমের সমস্যা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো উপসর্গে ভোগে। কিশোর বয়সীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় আচরণগত পরিবর্তন, একাগ্রতার অভাব, আত্মগোপন বা কখনও আগ্রাসী আচরণ। দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা না পেলে এসব শিশু পরিণত বয়সে মানসিক অসুস্থতায় ভোগার আশঙ্কা থাকে।

উৎস’র নির্বাহী পরিচালক জানান, দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো এখনও সীমিত। প্রতি ১ লাখে মাত্র ১ জনেরও কম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক সেবা কার্যত অনুপস্থিত। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় ‘মনোসামাজিক সহায়তা’ বিষয়টি এখনও প্রান্তিক অবস্থানে। অন্যদিকে, সামাজিক কলঙ্ক, অজ্ঞতা ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের অভাব মানুষকে মানসিক সহায়তা চাইতে নিরুৎসাহিত করে।

Comments

0 total

Be the first to comment.

জাকসু নির্বাচনের ফল দ্রুত প্রকাশের দাবিতে রাজধানীতে শিবিরের বিক্ষোভ BanglaTribune | রাজধানী

জাকসু নির্বাচনের ফল দ্রুত প্রকাশের দাবিতে রাজধানীতে শিবিরের বিক্ষোভ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার (১...

Sep 13, 2025

More from this User

View all posts by admin