প্রাচ্যধারায় সত্য–সুন্দর ও আধ্যাত্মিকতার রূপ

প্রাচ্যধারায় সত্য–সুন্দর ও আধ্যাত্মিকতার রূপ

দার্শনিক প্লেটোর ধারণা ছিল যে শিল্প, সাহিত্য রচনার মূল হচ্ছে দিব্যভাবনা, সুতরাং দৈব ভাবনার উদ্রেক শিল্পরসকে জারিত করে। দৈব ভাবনা দ্বারাই সৃষ্টির মৌলিক জ্ঞান চিন্তাচর্চার বিকাশকে আলোকিত পথে উত্তীর্ণ করে। উচ্চ-কবিকল্পনা, বস্তুগত চেতনা ও সৌন্দর্যের ভাবগত উপলব্ধিই সৃষ্টির প্রেরণাকে প্রকাশের আওতায় নিয়ে আসে এবং বয়ান তৈরি করে।

আবার অ্যারিস্টটলের বয়ান অনুযায়ী শিল্পী প্রকৃতির সত্যকে আবিষ্কার করে। ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির ধারাবিবরণী, দৈবভাব ও প্রকৃতিগত সত্যের প্রাচ্যধারা নির্মাণে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘গুরু-শিষ্য, শিষ্য-গুরু’ শিরোনামের চিত্র প্রদর্শনী।

প্রদর্শনীটির একটি বিষয় চমকপ্রদ; এখানে একজন শিক্ষকের অনুসারী তিনজন শিক্ষার্থী তাদের প্রাচ্যরীতি এবং দর্শনকলা চর্চার সময় একে অপরের গুরু এবং শিষ্যরূপে কাজ করেছেন। প্রাচ্যরীতিকে বাংলাদেশে গবেষণালব্ধ করে তোলার প্রচেষ্টার ফলাফল হচ্ছে এই চিত্র প্রদর্শনী।

এই প্রদর্শনীতে গুরু–শিষ্যের চিন্তাচর্চার প্রধান ও একমাত্র কারণ হচ্ছে প্রাচ্যরীতিতে চিত্র রচনার ঐতিহ্যিক ভাবধারা নির্ণয় করা। এই পরম্পরাগত চর্চায় এক প্রাণ থেকে অন্য প্রাণে সৌন্দর্যসুধা সঞ্চারিত করবার প্রয়াস রয়েছে।

প্রাচ্য চিত্রকলা অনুষদ অনুশীলন সংঘে শিল্পী জাহাঙ্গীর আলম, শিল্পী প্রগতি চাকমা, শিল্পী অমিত নন্দী এবং তাদের পুরোধা শিল্পী মলয় বালা ঐতিহাসিক ও সৃষ্টি পরম্পরার চিত্রচর্চাকে একসঙ্গে বিকশিত করেছেন।

শিল্পী জাহাঙ্গীর আলম অন্তর্মুখী সৃষ্টি চর্চাকে প্রাচ্যধারার ওয়াশ এবং রেখাপ্রবাহ দ্বারা একধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্ঞানচর্চার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি মানুষ এবং প্রকৃতির ভাববাদী সংযোগ স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ভাবনার চিন্তাচর্চাকে অনেকটাই অগ্রসর করেছেন বলে মনে হয়।

শিল্পী বর্ষার সুর, বৃষ্টি-পরাগ, সুরেলা ছন্দ চিত্রকর্মগুলোতে বাংলার প্রকৃতিগত সুন্দর সম্পর্কিত ভাবনাকে নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন।

বিশ্বরূপকে অন্তর্মুখী ভাবনা দ্বারা প্রকাশ করার চেষ্টাও এখানে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে, যার ফলে শরীরী জীবন অশরীরী প্রাণে রূপান্তরিত হয়েছে।

শিল্পী প্রগতি চাকমা তাঁর চিত্রচর্চায় ঐতিহ্যগত জীবনকে তুলে ধরেছেন। তাঁর ‘ম্রো উৎসব-১’ ও ‘ম্রো উৎসব-২’ চিত্রকর্ম দুটি আদিবাসী সংস্কৃতির জীবনঘনিষ্ঠ সৌন্দর্যকে প্রকাশ করেছে। শিল্পী ‘অভয়মিত্র ঘাটের বিসর্জন’ ও ‘পুরান ঢাকার বিসর্জন’ চিত্রকর্ম দুটিতে ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধনকে যোগসূত্রে গেঁথেছেন। তিনি সুরের ঐকতানকে সংস্কৃতির প্রাণবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন।

এই প্রদর্শনীতে বাংলার শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতির এক বন্ধনের সেতু নির্মাণের প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। ধর্ম ও প্রকৃতিগত প্রাণের মুক্তি, অধ্যাত্ম ভাবনা ও বাস্তব জীবনের ঐক্য, সাহিত্যের সৃষ্টি ও ভাষা, সুন্দরের প্রাণ ও মানবিক জীবনের গান—এ সবকিছুর দর্শন ও চর্চা প্রদর্শনীটিতে রয়েছে। সৃষ্টিচিন্তার ক্ষেত্রে আদর্শিক চিত্রচর্চার একটা ব্যাপার থাকে, যার মধ্য দিয়ে জ্ঞান সূত্র নির্মিত হয় এবং এই সৃষ্টিজ্ঞান বা পদ্ধতি পরম্পরার মধ্য দিয়ে বিস্তৃত ভাবনার খোরাক তৈরি করে। এই কাজটিই গুরু–শিষ্য পরম্পরায় প্রাচ্য চিত্রকলা অনুশীলন সংঘ করে যাচ্ছে।

বাস্তবের প্রকৃত ভাব ও আবেগকে অবয়বের কাঠামোতে আবদ্ধ করতে পারলে প্রতিকৃতি চিত্রও শিল্পরসে জারিত হয় এবং চরিত্রের ধারণার সঙ্গে চিত্তশুদ্ধির আনন্দকে জাগিয়ে তোলে। চরিত্রের অভিব্যক্তি ও অভিপ্রায়গুলো যদি চাহনির আওতায় রূপবদ্ধ হয়, তবে প্রতিকৃতিতে সৃষ্টির আনন্দ ও শক্তি দুই-ই জেগে ওঠে। অবয়ব নির্মাণের সফলতাই হচ্ছে চিত্রতলে ব্যক্তিকে নয় ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলা এবং ব্যক্তির গুণকে ধারণ করা।

শিল্পী মলয় বালা সার্থক করে তুলতে পেরেছেন তাঁর প্রতিকৃতিনির্ভর চিত্রভাবনাকে। তিনি শিল্পী সুলতান এবং সফিউদ্দিন আহমেদের প্রতিকৃতি রূপের মধ্যে চিন্তা রূপের ভাবকে সম্পর্কিত করেছেন এবং সৃষ্ট ভাবনার এক দারুণ প্রতিরূপকে ক্ষেত্রজুড়ে যেন আলাপ করেছেন। তিনি ধারাবাহিক চিত্রচর্চায় ‘শকুন্তলা’, ‘গোধূলির গ্রাম’ এঁকেছেন আবার সুফিবাদী হয়ে নির্মাণ করেছেন ‘পবিত্র সৌন্দর্য-১’; নারীর চিন্তার স্বরূপ ভাবনায় এঁকেছেন ‘আত্মদর্শন’ শিরোনামের চিত্রকর্ম।

বিষয়ভিত্তিক চিত্রপটের মধ্যে ক্ষেত্রজুড়ে আলাপ বা বয়ানের নেপথ্যের বয়ান তৈরির যে সিনথেটিক প্রচেষ্টা, তা আসলে বিষয়কে সমৃদ্ধ করে। শিল্পী মলয় বালা প্রাচ্য চিত্রপটের বয়ান নির্মাণে অনেক বেশি প্রমাণসাপেক্ষ উদ্যোগ গ্রহণ করে কাজ করেছেন এবং ঋদ্ধ হয়েছেন।

শিল্পী অমিত নন্দী তাঁর চিত্রকর্মগুলোতে প্রেম ও ত্যাগের রূপ নির্ণয় করার চেষ্টা করেছেন, যেখানে আধ্যাত্মিক চেতনার সঙ্গে জীবনের এক প্রকৃতিগত কাঠামোকে অনন্তের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছেন। জীবনকে প্রেম সত্যের আরাধনার উপযুক্ত হিসেবে প্রকাশ করেছেন।

‘প্রার্থনার অভিব্যক্তি’ চিত্রকর্মটি মুগ্ধ হওয়ার মতো। জীব প্রাণের এক অনন্ত আত্মাকে অথবা ঈশ্বরকে পাবার যে আকাঙ্ক্ষার রূপ, সেই রূপের আবেদনময় স্থিতিকে তিনি নির্মাণ করেছেন। পরম সত্যকে লালন করে এই ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুর উপযোগিতা ম্লান করে দিয়ে মুক্তির সাধনায় ব্রতী পালনের দৃশ্য এঁকেছেন।

এখানে জীব প্রাণ প্রার্থনা করছে, প্রকৃতির বৈভব পেরিয়ে স্বর্গীয় আলোকময় ভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সবুজাভ জীবনকে ছাপিয়ে পরম ব্রহ্মের জন্য অপেক্ষা করছে। চিত্রকর্মটিতে প্রার্থনার স্বরূপ নির্ণয় করা হয়েছে। শুধু মানুষ নয়, প্রত্যেক জীব আত্মাই যে প্রার্থনায় শামিল হন এবং মুক্তির চিন্তায় অনন্ত প্রকৃতির সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক তৈরিতে নিজেদের প্রার্থনায় রাখেন, সেই বার্তাটিই শিল্পী দিয়েছেন।

এখানে জীবাত্মা মুক্তির যে সাধনায় মগ্ন হয় এবং পরম আত্মার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার যে ভাবনা রাখে, সেসবের এক প্রকৃতিময় অনুভূতির দৃশ্যায়ন করেছেন শিল্পী। ঈশ্বর প্রাপ্তির প্রাণান্ত অনুভূতি এখানে প্রত্যক্ষ করা যায়। এ জন্যই হয়তো শিল্পী ‘অন্তর্যাত্রা’, ‘ধ্যান’, ‘আদর’ ও ‘মানবতার দূত’ শিরোনামের চিত্রগুলো এঁকেছেন।

শিল্পী জীবাত্মার আরাধনাকে স্বর্গীয় চিত্রক্ষেত্র অনুযায়ী এঁকেছেন, যেখানে প্রাণীগুলো প্রকৃতিময় উপলব্ধির দ্যুতি ছড়িয়ে দিচ্ছে; এবং প্রার্থনায় মগ্ন হোক পৃথিবীর জীবকুল—এই প্রত্যাশাও হয়তো করছেন। শিল্পী এক প্রাণ থেকে ত্রিপ্রাণের সুরকে প্রকৃতিলব্ধ করে তৈরি করেছেন ‘আবহমান সংগীতের স্বরূপ’ চিত্রকর্মটি।

প্রাচ্যধারার চিত্রশাস্ত্র নির্মাণের স্বভাবসিদ্ধ কর্মযজ্ঞকে আদর্শিক চিত্রধারায় উত্তীর্ণ করার এই প্রয়াস সার্থক হয়েছে, যেখানে অনুভূতির ওপর ভর করে শিল্পীরা আত্মচৈতন্যের পথে অগ্রসর হয়েছেন।

Comments

0 total

Be the first to comment.

অম্লমধুর শিশির Prothomalo | শিল্পকলা

অম্লমধুর শিশির

আকাশ আর পাতাল বোঝানোর জন্য কোনো সীমানা নেই। নিরালম্ব, বায়ুভূত শূন্যে সচল এই সব ইমেজ যেন কোনো জাদুকর...

Oct 03, 2025

More from this User

View all posts by admin