গত ৯ ও ১০ নভেম্বর সিটি ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত “Cultures: Advanced Discourses in Translation Culture and Comparative Literature” সম্মেলনে অনুবাদ অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য দেন অনুবাদতত্ত্ব ও তুলনামূলক সাহিত্যের বিশিষ্ট পণ্ডিত সুসান ব্যাসনেট। শ্রুতিলেখন ও অনুবাদ করেছেন অমি আক্তার।বক্তব্যের শুরুতে তিনি ভারতীয় চিন্তক সিন্দো এর তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রশংসা করে বলেন, সিন্দো কল্পনা করেছিলেন, যদি ইউরোপ কোনো পরাশক্তির দ্বারা উপনিবেশিত হতো, তাহলে সেই উপনিবেশবাদী সংস্কৃতি হয়ত ইউরোপীয় ক্লাসিক সাহিত্যকেও বর্বর ও অমার্জিত বলে প্রত্যাখ্যান করত—যেমন হোমারের ইলিয়াড হতো একধরনের প্রাথমিক ও অশ্লীল মহাকাব্য, দান্তের কাজকে বলা হতো ধর্মীয় কুসংস্কারের ভয়াবহ প্রতিফলন, আর শেকসপিয়ারকে দেখা হতো এক মদ্যপ ও ক্ষ্যাপাটে নাট্যকার হিসেবে। এখানকার বক্তব্যটি ব্যঙ্গাত্মক হলেও, তা একটি গভীর সত্যকে সামনে আনে—আমরা প্রত্যেকে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সমাজের কাঠামো দ্বারা নির্মিত। সে কাঠামোই আমাদের বিচার-বুদ্ধি ও মূল্যবোধে প্রভাব ফেলে ।
তুলনামূলক সাহিত্য বর্তমানে নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পেয়েছে, যার পেছনে অনুবাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুবাদ ছাড়া এক সাহিত্যের সঙ্গে অন্য সাহিত্যের সংযোগ সম্ভব নয়। এ বিষয়ে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ‘ডেথ অব ডিসিপ্লিন’ বইটি তুলনামূলক সাহিত্যে নতুন পথের দিশা দিয়েছে।
তবে এই শাস্ত্রের অতীত এতটা সহজ ছিল না। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত রেনে ওয়েলেক ‘দ্য ক্রাইসিস অব কম্পারেটিভ লিটারেচার’ প্রবন্ধে তুলনামূলক সাহিত্যের ইউরোকেন্দ্রিকতা ও অন্যান্য ভাষা-সাহিত্যের প্রতি অবহেলার সমালোচনা করেছিলেন। একই সুর শোনা যায় রেনে এটেবলের ‘কম্পারিজন ইজ নট রিজন’ (১৯৬৭) প্রবন্ধেও। তবে ২০১৭ সালে, আমেরিকান তুলনামূলক সাহিত্য সমিতির ‘দ্য স্টেট অব দ্য ডিসিপ্লিন’ রিপোর্টে দেখা যায়, ২১ শতকে এই শাস্ত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে—বিশেষ করে উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তা ও বিশ্বসাহিত্যে আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে। আর এসব পরিবর্তনের পেছনে প্রধান চালিকা শক্তি ‘অনুবাদ’।
ট্রান্সলেশন স্টাডিজ তুলনামূলকভাবে একটি নতুন ক্ষেত্র, যার গোড়াপত্তন ১৯৭০-এর দশকে, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের কিছু আন্তর্জাতিক পণ্ডিতের হাত ধরে—যার একজন আমি নিজেও। তারা শুধু অনুবাদের তাত্ত্বিক আলোচনা করেননি, নিজেরাও অনুবাদ করেছেন।
আমার মতে, অনুবাদ কেবল ভাষান্তর বোঝায় না, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংস্কৃতি, ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রশ্ন। ভাষার মধ্যেও রয়েছে শ্রেণিবিন্যাস। আমরা আজ ইংরেজিকে একটি ক্ষমতাশালী ভাষা হিসেবে দেখি, কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব এসেছে সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ধারায়। ট্রান্সলেশন স্টাডিজ মূলত অনুবাদের কোথায়, কীভাবে এবং কোন প্রেক্ষাপটে ঘটে—তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই চর্চাকে মর্যাদাপূর্ণ করে তুলে।
আমরা প্রায়ই অন্য ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদকে গর্বের বিষয় হিসেবে দেখি। কিন্তু যখন ইংরেজি থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ হয়, তখন অনেক সময় তাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না—এই দুইয়ের মধ্যেই একধরনের বৈষম্য বিরাজ করে।
আধুনিক অনুবাদতত্ত্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক ও দক্ষ অনুবাদক হলেন মাইকেল ক্রোনিন, ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত তার বইয়ে বলেন—যদি ইউরোপের রাজনৈতিক সম্পর্ক শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসমতা বহন করে থাকে, তাহলে ভাষাগুলোও সেখানে ক্ষমতাধর বা শিকার—উভয় ভূমিকাতেই কাজ করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু ভাষার মধ্যে সম্পর্ক কখনই নিরপেক্ষ নয়; এটি গভীরভাবে ক্ষমতা ও পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত। ট্রান্সলেশন স্টাডিজ আমাদের এই বাস্তবতা বুঝতে শেখায়।
বর্তমানে আমরা ভাষাগত অসমতা নয়, বরং অনুবাদের পেছনে যে আদর্শিক কাঠামো রয়েছে তা বিশ্লেষণ করি। কিন্তু এটাও মনে রাখা জরুরি, অনুবাদক কোনো যন্ত্র নয়—তারও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, মতামত এবং সংস্কৃতি থাকে। প্রতিটি অনুবাদই এক ধরনের ব্যাখ্যা—যা তৈরি হয় অনুবাদক ও পাঠকের নিজস্ব সমাজ ও চিন্তার প্রেক্ষাপটে।
জেমস হোমস অনুবাদকে ‘বিকৃত রূপ’ বলেছিলেন। অনেকেই মনে করেন ভাষার মধ্যে সঠিক সমতুল্য পাওয়া যায়, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। একক পাঠ্য যদি একাধিক অনুবাদকের হাতে দেওয়া হয়, তবে প্রত্যেকেই একে কিছুটা ভিন্নভাবে অনুবাদ করবেন। কারণ ভাষা কেবল শব্দের নয়, বরং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।
অনুবাদের এই জটিলতা অনেকেই বুঝেন না। কিছু মানুষ যারা একাধিক ভাষা জানেন, তারাও অনুবাদের বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত এবং অনুবাদের মান নির্ধারণেও একধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে। এজন্য অনেকেই বলেন, অনুবাদে মূল পাঠ্য হুবহু পুনরুৎপাদন করা উচিত—এতে ব্যর্থ হলে তা হবে 'বিশ্বাসঘাতকতা'। কিন্তু বাস্তবতা হলো—নিখুঁত পুনরুৎপাদন একটি মিথ। এটি শুধু অনুবাদকদ্বারা নয়, বরং সময়, নান্দনিকতা ও আদর্শিক পরিবর্তনের দ্বারাও প্রভাবিত হয়। একারণেই আমরা দেখি, একই পাঠ্য সময়ের সাথে বারবার অনূদিত হয়। কারণ সময় পাল্টায়, পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়, আর সেইসঙ্গে প্রয়োজন হয় নতুন ব্যাখ্যার।
ড. জনসনের একটি দৃষ্টান্ত এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য—তিনি বলেছিলেন, পোপের অনুবাদে হোমার ছিল চমৎকার। কিন্তু মাত্র ৫০ বছর পর, এই মতকে বাতিল করা হয়। কারণ পোপের অনুবাদ ছিল বীরত্বপূর্ণ বিশেষ ছন্দে লেখা, যা পরে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ, অনুবাদ কখনো চূড়ান্ত নয়—এটি পরিবর্তনশীল, সময়নির্ভর।
অনুবাদ অধ্যয়ন আমাদের এ কথাও শেখায় যে, অনুবাদকই একমাত্র এজেন্ট নন। একজন অনুবাদকের বাইরেও থাকে প্রকাশক, অর্থায়নকারী, সম্পাদক, এমনকি বিজ্ঞাপনদাতাও। অতীতকালে সেন্সর বা পৃষ্ঠপোষকরাও অনুবাদের গ্রহণযোগ্যতা ঠিক করতেন। উদাহরণস্বরূপ—এমিল জোলা’র উপন্যাসগুলো যখন অনুবাদ করা হয়, তখন অনেক অংশ বাদ দেওয়া হয়েছিল যাতে সেগুলো ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। ফলে স্পষ্ট হয়, অনুবাদ শুধু ভাষান্তরের প্রক্রিয়া নয়—এটি একটি সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক গঠনকাজ, যা সময় ও সমাজের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলে।
তিনি বলেন, আমার প্রাক্তন এক পিএইচডি ছাত্র, ক্রিস্টোকোর রানডেল, বর্তমানে নিজেই একজন অধ্যাপক এবং অনুবাদের ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ। তার গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু সেন্সরশিপ, বিশেষ করে ডাবিং ও সাবটাইটেলিং-এর মধ্যকার মতাদর্শিক পার্থক্য। এটি এক অনালোচিত ক্ষেত্র, যার প্রতি মনোযোগ অতীতেও ছিল না, এখনো সীমিত। আমি তাকে বলেছিলাম, যেখানে ডাবিং শিল্প বিকশিত হয়েছিল, সেখানেই এ বিষয়ে গবেষণা হওয়া জরুরি—যেমনঃ নাৎসি জার্মানি, কিংবা ফ্রাঙ্কোর স্পেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে—কেন এই শাসনব্যবস্থায় ডাবিং বিকশিত হয়েছিল? কারণ একেবারে সরল: যখন কোনো ভাষায় ডাব করা হয়, তখন দর্শকের জন্য মূল উৎস-পাঠ্য সম্পর্কে অবগত হওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে ক্ষমতাসীন শাসকেরা বার্তাকে ইচ্ছামাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। পক্ষান্তরে, সাবটাইটেলে মূল শব্দ রয়ে যায়, আর যারা ভাষাটি বুঝে, তারা মূলের সঙ্গে তুলনাও করতে পারে। অতএব, ডাবিং ও সাবটাইটেলিং-এর মধ্যেও রয়েছে আদর্শগত বিভাজন—একটি নিয়ন্ত্রণের, অন্যটি স্বচ্ছতার প্রতীক।
অনুবাদে পাঠকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বিশ্বাস। কারণ, যারা ভাষাটি জানে না, তাদের কাছে অনুবাদকই লেখকের প্রতিনিধি। ইতিহাসে বহু অনুবাদক এই বিশ্বাসের বিনিময়ে জীবন দিয়েছেন—ইয়ান হুস, উইলিয়াম টিন্ডেল, কিংবা আধুনিক কালে সালমান রুশদির জাপানি অনুবাদক। এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়—অনুবাদ কখনোই নিরপেক্ষ বা নিস্পৃহ কাজ নয়।
আজও লোকজন প্রশ্ন করে—“আমি কীভাবে জানব যে অনূদিত বইয়ের লেখক সত্যিই এমন কিছু বলতে চেয়েছিলেন?” আমার এক প্রতিবেশী এমন প্রশ্ন করেছিলেন ওলগা তোকারচুক-এর বই পড়ে। আমি বলেছিলাম, "আপনাকে বিশ্বাস করতেই হবে।" সত্যিই, অধিকাংশ নোবেল বিজয়ী লেখকের কীর্তি বিশ্বের কাছে পৌঁছেছে অনুবাদের মাধ্যমেই। কিন্তু আসলে আমরা অনেক সময় মূল গ্রন্থ পড়ি না, বরং একটি ব্যাখ্যা, একটি সংস্করণ পড়ি।
১৯৭০–৮০-এর দশকে অনুবাদ অধ্যয়ন বিকশিত হয় অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন নারীবাদ, কালচারাল স্টাডিজ কিংবা পোস্ট-কলোনিয়াল চিন্তার সমান্তরালে। নারীবাদী স্লোগান "হিস্টোরিতে গুম হয়ে যাওয়া" এই অধ্যয়নেও প্রযোজ্য, কারণ বহু অনুবাদকের নামই আমরা জানি না। মাইকেল ক্রোনিনের ‘ট্রান্সলেটিং আয়ারল্যান্ড’ এবং লরেন্স ভেনুতির ‘দ্যা ট্রান্সলেটর ইনভিজিবিলিটি’ অনুবাদকের দৃশ্যমানতা ও স্বীকৃতির অভাব তুলে ধরেছে। ভেনুতি বলেন, অনুবাদকের অবদান প্রচুর, কিন্তু স্বীকৃতি প্রায় শূন্য।
এই কারণে অনুবাদের ইতিহাস গবেষণার যোগ্য ক্ষেত্র। এটা জাতীয় সাহিত্য ইতিহাসকেও নতুন আলোয় দেখায়। উদাহরণস্বরূপ, ইংরেজি সাহিত্য কখনোই স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না—রেনেসাঁ থেকে শুরু করে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এটি ব্যাপকভাবে অনুবাদনির্ভর। শুধু বাইরের সাহিত্য ইংরেজিতে অনূদিত হয়নি—অসংখ্য ইংরেজি সাহিত্যও বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আজও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান থ্রিলার লেখক জো নেসবো-এর বই ৬০ মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। অনুবাদ চলে উচ্চ সাহিত্য থেকে শুরু করে জনপ্রিয় পাঠকের দরজায়—সবখানেই।
১৯৯০-এর দশকে "অনুবাদের দৃশ্যমানতা" বিষয়ক আলোচনা নতুন মোড় নেয়। উমবের্তো ইকো, ক্রোনিন-এর মতো পণ্ডিতরা এই আলোচনা এগিয়ে নিয়েছেন। ইকো-ট্রান্সলেশন বইয়ে ক্রোনিন বলেন, ডিজিটাল যুগ তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে বটে, তবে ভাষাগত ব্যবধান থাকলে সেই তথ্য তাৎপর্যহীন হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, বহুভাষিক বিশ্বে অনুবাদ অপরিহার্য, বিশেষত জরুরি সহায়তা ও মানবিকতায়। তার মতে, ২০১০ সালের হাইতির ভয়াবহ ভূমিকম্পে উদ্ধার কার্যক্রম ভাষাগত অভাবের কারণে ব্যাহত হয়। এই বাস্তবতা বোঝায়—অনুবাদ কেবল সাহিত্যিক নয়, জীবন-মরণ প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।পরিশেষে, ১৯৭০-এর দিকে যেভাবে অনুবাদ অধ্যয়ন আত্মপ্রকাশ করেছিল, তা ছিল এক ধরনের প্রতিবাদ—প্রচলিত ভাষাবিদ্যা ও সাহিত্য তত্ত্বের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে। তাদের দাবি ছিল—অনুবাদের জন্য আলাদা জায়গা, এবং অনুবাদকদের জন্য ন্যায্য স্বীকৃতি ও পারিশ্রমিক। কেননা, ন্যায্য পারিশ্রমিক ছাড়া অনুবাদের মানও হুমকির মুখে পড়ে।
অনুবাদ যে শুধু ভাষান্তর নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক কাজ, সে বিষয়ে আজ ব্যাপকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটি জাতির পরিচয় ও সংস্কৃতি গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। তাই অনুবাদকে সাহিত্য ইতিহাসে এবং সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বিকাশে আরও বেশি স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। আমরা ইউরোপকেন্দ্রিক ধারণার বাইরে গিয়ে বিশ্বসাহিত্যের বহুমাত্রিক রূপগুলোকে মূল্যায়ন করতে চেয়েছি, কারণ লরেন্স ভেনুতি যেমন বলেছেন, ইউরো-আমেরিকান মূলধারার কাঠামো অনেক সময় বাইরের সাহিত্যের আসল বৈশিষ্ট্য ও কণ্ঠস্বর মুছে দেয়। এই ভাবনাটি অনেক আফ্রিকান পণ্ডিত, বিশেষ করে নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাসে এই ইউরোকেন্দ্রিকতা ভাঙার প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অনুবাদ অধ্যয়ন সত্যিকারের প্রসার লাভ করতে শুরু করে ১৯৯০-এর দশকে। আমি নিজেই এর প্রাথমিক সময়কার একজন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী। ১৯৮০ সালে আমার লেখা ‘ট্রান্সলেশন স্টাডিজ’ নামের একটি ছোট বই প্রকাশিত হয়েছিল। বইটির লক্ষ্য ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতি অধ্যয়নে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা। শুরুতে খুব বেশি বিক্রি হয়নি। তবে ১৯৯১ সালে পুনর্মুদ্রিত হওয়ার পর থেকে এর চাহিদা বেড়েই চলেছে। এখন পঞ্চম সংস্করণের পথে। আমার কাছে ব্যাপারটি বেশ আশ্চর্যজনক মনে হয়, যে বইটি এক সময় তেমন পরিচিত ছিল না, এখন বিশ্বব্যাপী আলোচিত। এতে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে অনুবাদ নিয়ে ভাবনার গুরুত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কতটা বেড়েছে।
গত তিন দশকে অনুবাদ নিয়ে প্রকাশনা, গবেষণা, সম্মেলন ও নানা আয়োজন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু শিক্ষাবিদদের চেষ্টার ফলে নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির বড় বড় পরিবর্তনও এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। ইতিহাসে আমরা দেখি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তাধারাতেও বড় রকমের পরিবর্তন আসে। যেমনঃ রোমান সাম্রাজ্য পতনের পর ইউরোপে স্থানীয় ভাষাগুলো গুরুত্ব পায়, রেনেসাঁর সময় অনুবাদের মাধ্যমে প্রাচীন জ্ঞান নতুন আলোয় আসে, রিফর্মেশন আন্দোলন অনুবাদকে ঘিরেই গড়ে ওঠে এবং ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে। আবার মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারে তথ্যের প্রসার ঘটায় এবং উনিশ শতকের বিপ্লবগুলো মানুষ ও ঈশ্বর, মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেয়। এমনকি রোমান্টিসিজমও ছিল শিল্প ও সংস্কৃতিতে বিপ্লবী চিন্তার একটি রূপ।
আধুনিক যুগেও অনুবাদকে ঘিরে সচেতনতা বেড়েছে, বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে বড় বড় পরিবর্তন ঘটেছিল—যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান, চীনের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক স্থাপন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে ইন্টারনেট ও বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্তার। এই পরিবর্তনগুলোর কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভ্রমণ করতে শুরু করে। উন্নত যোগাযোগ ও স্বল্প মূল্যে যাতায়াত ব্যবস্থার পাশাপাশি পাসপোর্ট পাওয়ার সুবিধা মানুষকে দেশ-বিদেশে যেতে অনুপ্রাণিত করে। সেই সঙ্গে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক নিপীড়ন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক মানুষ তাদের নিজ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। এই সব পরিবর্তনের ফলে মানুষের চিন্তা, জীবনধারা ও সংস্কৃতির মধ্যে ব্যাপক লেনদেন ঘটে এবং অনুবাদের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে যায়।
এই বাস্তবতায় ১৯৯০-এর দশকে অনুবাদ নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা ত্বরান্বিত হয়। আমি ও আন্দ্রে লেফেভার তখন ‘ট্রান্সলেশন, হিস্টোরি এবং কালচার’ নামে একটি বই প্রকাশ করি। এই বইয়ে আমরা বলতে চেয়েছি, অনুবাদ কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়—তা এক ধরনের “পুনর্লিখন”। প্রতিটি অনুবাদ একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি থেকে আসে এবং অন্য পটভূমিতে স্থানান্তরিত হয়। তাই অনুবাদ মানে কেবল একজন দ্বিভাষিক ব্যক্তির অভিধান ঘেঁটে কিছু অনুবাদ করা নয়; এর মধ্যে জড়িয়ে থাকে সময়, ক্ষমতা, আদর্শ, ভাষা এবং সমাজ। অভিধানের সীমাবদ্ধতা আমাদের দেখায়, একটি অনুবাদ আসলে কতটা জটিল এবং বহুস্তরীয় হতে পারে।
ভাষাগত সমতা নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন আমি প্রায়ই আমার শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করি—তারা কি দ্বিভাষিক অভিধান ব্যবহার করে উপকৃত হয়? কিন্তু বেশিরভাগ সময় তারা এতে হতাশা প্রকাশ করে। কারণ একেকটি শব্দ বা বাক্যাংশের জন্য অভিধানে একাধিক সমতুল্য দেওয়া হয়, আর তাদের ভেতর থেকে উপযুক্তটি বেছে নেওয়া সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে। এর ভালো উদাহরণ হলো পর্যটনশিল্পে ব্যবহৃত অনুবাদ—যেমন হোটেল বা রেস্তোরাঁর মেনুতে আমরা যে অনুবাদ দেখি, সেগুলো অনেক সময় এতটাই অদ্ভুত লাগে যে বোঝা যায়, নির্ভুল অনুবাদ আসলে সম্ভব হয়নি। কারণ ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের প্রধান ভিত্তি। ভাষা এবং সংস্কৃতি এতটাই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত যে, কোনো একটি ভাষায় প্রকাশিত অনুভূতি বা ধারণা সহজে অন্য ভাষায় অনুবাদযোগ্য হয় না। আমি যখন আমার শৈশবের স্মৃতিতে ফিরে তাকাই, তখন দেখি কীভাবে ভাষা শুধু কোনো কিছুকে প্রকাশের উপায় নয়—বরং সেটি সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিরও প্রতিফলন। আমাদের দেখার ও অনুভব করার পদ্ধতি গড়ে ওঠে ভাষার মাধ্যমেই। কিন্তু সংস্কৃতিভেদে ভিন্ন ভাষাগুলোর সীমাবদ্ধতা আমাদের ভাব প্রকাশ ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে প্রভাব ফেলে।
এ বিষয়ে আমি আমার ছাত্রদের একবার বলেছিলাম—ইংরেজি শব্দ 'Homesickness' কে ইতালীয় ভাষায় 'Nostalgia' দিয়ে অনুবাদ করা হয় বটে, কিন্তু দুটি শব্দ সম্পূর্ণ সমার্থক নয়। 'Nostalgia' শব্দটি ইংরেজি ভাষাতেও এসেছে, তবে এটি 'Homesickness' ও 'Longing'—এই দুটি অনুভূতির মাঝামাঝি কিছু। আবার, এটি পর্তুগিজ শব্দ 'Saudade'-এর সঙ্গেও পুরোপুরি মেলে না। 'Saudade' এমন একটি অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ যা অনুবাদ করা অত্যন্ত কঠিন—এটি নিছক হতাশা নয়, বরং এক ধরনের হৃদয়ের শূন্যতা, অস্পষ্ট ব্যাকুলতা। একইভাবে 'Angst'—জার্মান ভাষার একটি শব্দ—দুঃখ, উদ্বেগ ও অস্থিরতার একটি দার্শনিক অবস্থা প্রকাশ করে, যারও কোনো সরল অনুবাদ নেই। এই ধরনের অনুবাদ-অযোগ্য অনুভব নিয়ে আমি চাইলে আরও উদাহরণ দিতে পারি। মিলান কুন্দেরা এই ধরনের শব্দ ও মানসিক অবস্থাগুলোর গুরুত্ব নিয়ে খুব স্পষ্টভাবে কথা বলেছেন এবং দেখিয়েছেন—এই অভিজ্ঞতাগুলোকে কখনোই সরলভাবে অন্য ভাষায় অনুবাদ করা যায় না।চলবে