আমাদের সমাজে বন্ধ দরজার আড়ালে মেয়েদের সম্পর্কে বলে থাকা কথাবার্তার মধ্যে অনেক ভুল ধারণা টিকে আছে। এর মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো, মেয়েদের প্রাক-মাসিক এবং মাসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলো ব্যক্তিগত ও লজ্জার বিষয় এবং সম্পূর্ণভাবে মেয়েলি ব্যাপার। সেখানে পুরুষের আলোচনা করা বা জড়িত হওয়া উচিত নয়। এটি একটি অযৌক্তিক চিন্তা। সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত এই ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর ধারণার কারণে অগণিত নারীর মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ এটি এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; যা নিয়ে সমাজের প্রত্যেক স্তর থেকেই আলোচনা হওয়া উচিত।
মেয়েদের গোপন সংগ্রাম: এই নীরবতার ফল কী?
শারীরবৃত্তীয় অনেক প্রক্রিয়ার মতো মাসিকও মেয়েদের একটি স্বাভাবিক দৈহিক প্রক্রিয়া। অথচ একে অপবিত্র, গোপন এবং শুধু মেয়েদের জানার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই অনেক মানসিক চাপ আর বিভ্রান্তি দেখা দেয়। বয়ঃসন্ধিকালে দেহে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটা ঘটনা ঘটে। অথচ এটা নিয়ে কথা বলতে না পারা, অথবা মাসিকের জন্য যা ব্যবহার করা হচ্ছে তা আদৌও নিরাপদ কিনা সেটা নিয়ে অজ্ঞাত থাকা আমাদের দেশের অধিকাংশ মেয়ের জন্য বাস্তবতা। এ বিষয়ে পুরুষরা যখন নীরব ভূমিকা পালন করে তখন সবার চোখে মাসিকের আলোচনা হয়ে ওঠে কেবল অন্দরমহলের বিষয়। মেয়েদের প্রাক-মাসিক এবং মাসিককালীন স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলোর সামাজিকভাবে গোপনীয়তার প্রবণতা নিয়ে করা একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য মেয়েরা একটি আত্মসমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করে; যা সেলফ অবজেক্টিফিকেশন নামে পরিচিত। এর মানে হলো, মেয়েরা সমাজের পুরুষের মধ্যে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে মিল রেখে আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং এর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68ec7a6dd6614" ) );
মেয়েদের প্রাক-মাসিক এবং মাসিককালীন স্বাস্থ্যের সমস্যাকে লজ্জাজনক মনে করার প্রভাব ব্যক্তিগতভাবেও তাদের প্রভাবিত করে। প্রাক-মাসিক, মাসিককালীন স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং মানসিক সুস্থতার মধ্যে এক অদৃশ্য অথচ গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। তবে প্রায়ই বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়। এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় সব জায়গায় প্রাক-মাসিক এবং মাসিককালীন যে অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা দেখা যায়, বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে, তা বয়ঃসন্ধিকালে থাকা অনেক মেয়ের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসম্পর্কিত সমস্যার কারণ। পাশাপাশি এটি অপব্যাখ্যার কুপ্রভাব বাড়িয়ে দেয়। এমনকি গ্রামাঞ্চলে দেখা যায়, অনেক মেয়ে এ কারণে বছরে ৪০ দিন পর্যন্ত স্কুল বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
মেয়েদের প্রাক-মাসিকের লক্ষণগুলি নিয়ে প্রায়ই অনেকে ভুল বুঝে বা অবজ্ঞা করে থাকে নিছক মেয়েলি আবেগ হিসেবে। এমন ভুল ধারণার কারণে পুরুষদের মধ্যে নারীদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। অথচ এগুলো শুধু তথাকথিত মেয়েলি সমস্যা নয়, বরং এর সমাধান না করতে পারা আমাদের সমাজেরই ব্যর্থতা। যেখানে নারীরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে তাদের সমস্যা উপেক্ষা করা মানেই একটি জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া। তাই একটি জাতির উন্নতির জন্য, সমগ্র সমাজকে অবশ্যই সুস্থ ও সক্ষম থাকতে হবে এবং এটি বাস্তবায়নে নারী-পুরুষের পারস্পারিক সহায়তার বিকল্প নেই।
মিথ দূর করার ক্ষেত্রে পুরুষের অপরিহার্য ভূমিকা
মাসিক সম্পর্কিত উপেক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে নীরবতা ভাঙার পাশাপাশি এটিকে কেবল মেয়েলি সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে প্রয়োজন সমাজের সব স্তরের পুরুষের কাছ থেকে সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ। একটি পরিবারের পুরুষদের অবশ্যই পরিবারের নারীদের কাছে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে একজন আস্থাভাজন ব্যক্তির মতো নির্ভরশীল মানুষ হতে হবে। বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের সঙ্গে পিরিয়ড সম্বন্ধে খোলাখুলিভাবে কথা বলতে পারেন; যাতে তারা প্রাক-মাসিক ও মাসিককালীন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়ে প্রস্তুত ও অবগত থাকে। ভাইয়েরা পরিবারের মেয়েদের নিয়ে উত্যক্ত বা লজ্জাকর পরিস্থিতি না তৈরি করে তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ গড়তে পারেন। স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের মানসিকভাবে সাহায্য করতে পারেন, স্ত্রীদের সঙ্গে প্রাক-মাসিক ও মাসিককালীন স্বাস্থ্য সম্বন্ধে স্বাভাবিকভাবে আলোচনা করতে পারেন। তাদের বোঝাপড়া এবং সহমর্মিতা মেয়েদের মধ্যে এ সম্পর্কিত লজ্জা ও গোপনীয়তার বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68ec7a6dd6648" ) );
শিক্ষক ও সামাজিক নেতৃত্ব হিসেবে
শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের নেতারা সমাজের মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সুধারণা তৈরিতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন। তারা প্রাক-মাসিক ও মাসিককালীন সম্পর্কিত সামাজিক ট্যাবুগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমে সচেতনতার প্রসার এবং তাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে লিঙ্গ-সংবেদনশীল পদ্ধতির মাধ্যমে এ বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন।
সহযোগী এবং রোল মডেল হিসেবে
সমাজের প্রত্যেক পুরুষ প্রাক-মাসিক ও মাসিককালীন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত আলোচনার সময় আগ্রহী মনোভাব প্রকাশ, যথাযথ সহানুভূতি দেখানো এবং এ সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণা নির্মূলে সক্রিয় ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সমাজে বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে পারেন। প্রাক-মাসিক ও মাসিককালীন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলোর প্রতি সম্মানপূর্ণ এবং সচেতন মনোভাবগুলি আশেপাশের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সবার জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করতে পারেন।
মাসিককালীন এবং প্রজনন স্বাস্থ্য একটি জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত ইস্যু। এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উপলব্ধি, সহানুভূতি এবং কাজ করা। প্রাক-মাসিক ও মাসিককালীন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে জানা নারীর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠার জন্য স্বাভাবিক ও অপরিহার্য দিক। এটি নিয়ে অনেক দিন ধরে ঘিরে থাকা ট্যাবু এবং ভুল তথ্য থেকে মুক্ত হওয়ার সময় এখনই। সমাজের প্রচলিত মিথ ভেঙে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের পুরুষরা নারীদের পাশে থেকে একটি স্বাস্থ্যকর, ন্যায়সঙ্গত এবং সমতাপূর্ণ সমাজ গঠনে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করতে পারেন।
ইউথ পলিসি ফোরাম ও ‘অধিকার এখানে, এখনই’ প্রকল্পের যৌথ প্রয়াসের মিথবাস্টার সিরিজের এটি তৃতীয় পর্ব। এই প্রকল্প নিয়ে আরও জানতে ভিজিট করুন-https://ypfbd.org/ypfrhrn/