মার্কিন হামলার আশঙ্কায় গেরিলা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভেনেজুয়েলা

মার্কিন হামলার আশঙ্কায় গেরিলা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভেনেজুয়েলা

মার্কিন হামলার আশঙ্কায় গেরিলা ধাঁচের প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ভেনেজুয়েলা। দেশটি পুরোনো রুশ তৈরি অস্ত্র মোতায়েন করছে এবং সম্ভাব্য বিমান বা স্থল আক্রমণের ক্ষেত্রে ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির’ পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে।  নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।

এই পরিকল্পনা ভেনেজুয়েলার জনবল ও সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতির এক নীরব স্বীকারোক্তি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদকবাহী জাহাজে একাধিক হামলার পর এবার স্থল অভিযানই পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে। যদিও পরবর্তীতে তিনি ভেনেজুয়েলায় হামলার সম্ভাবনা অস্বীকার করেন।

২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প সরকার তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়। তিনি বলেছেন, এ ধরনের প্রয়াস রুখে দিতে ভেনেজুয়েলার জনগণ ও সেনাবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।

রয়টার্সকে ছয়টি সূত্র জানিয়েছে, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের অভাবে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক দুর্বল। সরকার সরবরাহে ঘাটতি থাকায় অনেক ইউনিট কমান্ডারকে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদকদের সঙ্গে আলোচনা করে সেনাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।

মাদুরো সরকার দুটি কৌশল নিয়েছে। এর একটি হলো প্রকাশ্যে আলোচিত গেরিলা প্রতিরোধ, অন্যটি ‘অরাজকতা সৃষ্টি’। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত তথ্যে গেরিলা প্রতিরোধকে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ২৮০টির বেশি স্থানে ছোট ছোট সেনা ইউনিট ধ্বংসাত্মক হামলা ও নাশকতার মতো কার্যক্রম চালাবে।

দ্বিতীয় কৌশল ‘অরাজকতা সৃষ্টি’ করতে গোয়েন্দা সংস্থা ও ক্ষমতাসীন দলের অস্ত্রধারী সমর্থকদের ব্যবহার করে রাজধানী কারাকাসসহ শহরগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে দেশকে অশাসনযোগ্য করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই দুই কৌশল একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

তবে এসব প্রতিরোধ কৌশলের সাফল্যের সম্ভাবনা খুবই কম বলে সূত্রগুলো স্বীকার করেছে। সরকারের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি বলেন, একটি প্রচলিত যুদ্ধে আমরা দুই ঘণ্টাও টিকব না। আরেকজন বলেন, আমরা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হতে প্রস্তুত নই।

ভেনেজুয়েলার সরকারি যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে মন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছিলেন, তারা (যুক্তরাষ্ট্র) ভাবে, এক দফা বোমা মেরেই সব শেষ করবে। কিন্তু এই দেশ এত সহজ নয়। মাদুরোও নিয়মিত সেনাদের প্রশংসা করে তাদের ‘স্বাধীনতার নায়ক সিমন বলিভারের উত্তরসূরি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

মাদুরো তার পূর্বসূরি হুগো চ্যাভেজের নীতি অনুসরণ করে সেনা কর্মকর্তাদের সরকারি পদে নিয়োগ দিয়ে আনুগত্য নিশ্চিত করেছেন। সামরিক নেতৃত্ব ২০২৪ সালের নির্বাচনে তার বিজয়কে সমর্থন জানিয়েছে, যদিও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে বিরোধী প্রার্থীই বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।

সূত্র জানায়, সামরিক বাহিনীর নিম্নপদস্থ সদস্যরা মাসে মাত্র ১০০ ডলার সমমূল্যের বেতন পান, যা মৌলিক খাদ্যের মাসিক খরচের এক-পঞ্চমাংশ। ফলে হামলার ঘটনায় অনেকের পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত কয়েক বছরে তাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল বিক্ষোভকারীদের দমন করা।

মাদুরোর দাবি, আট মিলিয়ন বেসামরিক নাগরিক মিলিশিয়া প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং অনেকে দেশ রক্ষায় জীবন দিতে প্রস্তুত। তবে প্রতিরক্ষা সূত্র বলছে, বাস্তবে মাত্র ৫ থেকে ৭ হাজার মিলিশিয়া, গোয়েন্দা ও দলীয় সশস্ত্র কর্মী এতে অংশ নিতে পারে। সরকারের হাতে থাকা সেনা ও ন্যাশনাল গার্ড সদস্যের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার।

ভেনেজুয়েলার অস্ত্রভাণ্ডার প্রধানত পুরোনো রুশ অস্ত্রের গড়ে ওঠা। ২০০০-এর দশকে রাশিয়া থেকে কেনা ২০টি সুখোই যুদ্ধবিমান যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমানের তুলনায় ‘কিছুই নয়’ বলে এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন। ট্যাংক, হেলিকপ্টার ও মিসাইল ব্যবস্থা সবই সেকেলে।

রাশিয়া গত সপ্তাহে জানিয়েছে, তারা কারাকাসের অনুরোধে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। মাদুরো ইতোমধ্যে সুখোই জেট মেরামত, রাডার উন্নয়ন ও নতুন মিসাইল সরবরাহের অনুরোধ করেছেন। দেশটির ৫ হাজার ইগলা ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যে মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

মাদুরো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ইগলা-এস ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তি সবাই জানে। আমাদের দেশে এর সংখ্যা ৫ হাজারের কম নয়। তিনি জানান, ক্ষেপণাস্ত্র ও অপারেটরদের শেষ পাহাড়, শেষ গ্রাম, শেষ শহর পর্যন্ত মোতায়েন করা হয়েছে।

২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রণীত একাধিক সামরিক নথিতে দেখা গেছে, ‘সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ।

ভেনেজুয়েলার সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছে ওয়াশিংটন, মানবাধিকার সংগঠন ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি সরকার। তবে কারাকাস এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা কলম্বিয়ার পাচারকারীদের বিরুদ্ধে লড়ছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আন্দ্রেই সারবিন পন্ট মনে করেন, মাদুরোর এসব প্রদর্শন আসল সামরিক শক্তি নয়, বরং বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে প্রতিরোধ দেখানোর চেষ্টা। তার মতে, “সরকার আসলে বার্তা দিতে চায়, যে কোনও হামলার পর এই অস্ত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী, গেরিলা বা সাবেক সেনাদের হাতে চলে যেতে পারে, যা দেশটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin