কসমেটিক সার্জারির প্রতি কেন এতটা ঝুঁকছেন আফগান নারীরা

কসমেটিক সার্জারির প্রতি কেন এতটা ঝুঁকছেন আফগান নারীরা

মখমলের সোফা, ঝাড়বাতি আর ঝাঁ–চকচকে সজ্জা—কাবুলের কসমেটিক সার্জারি ক্লিনিকগুলোতে ঢুকলে মনেই হবে না যে দেশটি তালেবান শাসনের অধীনে। বাইরে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা আর তালেবানের বিধিনিষেধ; ভেতরে বোটক্স, লিপ ফিলার আর চুল প্রতিস্থাপন করতে মানুষের ভিড়। এমন চিত্রই এখন দেখা যাচ্ছে আফগানিস্তানে।

গত কয়েক দশকের যুদ্ধ-সংঘাত শেষে আফগানিস্তানে যখন নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান আর স্বাধীনতা কঠোরভাবে সীমিত, তখন রাজধানী কাবুলে উল্টো ফুলেফেঁপে উঠছে প্রায় ২০টি কসমেটিক সার্জারি ক্লিনিক।

কসমেটিক সার্জারির জন্য বিদেশি চিকিৎসকেরা বিশেষ করে তুরস্ক থেকে কাবুলে আসেন আফগানদের প্রশিক্ষণ দিতে। আবার আফগান চিকিৎসকেরাও ইস্তাম্বুলে ইন্টার্নশিপ করেন। আর এসবের যন্ত্রপাতি আসে এশিয়া বা ইউরোপ থেকে।

এসব ক্লিনিকের অপেক্ষমাণ কক্ষে বসা গ্রাহকেরা সাধারণত বিত্তবান। তাঁদের অধিকাংশই নারী। তবে সেখানে টাকমাথার পুরুষও আছেন। এখানে আসা নারীরা ভারী মেকআপ আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বোরকা পরিহিত থাকেন।

২৫ বছর বয়সী সিলসিলা হামিদি দ্বিতীয়বার ফেসলিফট করাতে এসেছেন। অস্ত্রোপচার করানোর আগে তিনি মুখের ঝুলে পড়া ওপরের অংশ টানটান করাতে চান। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনা করা হামিদি মনে করেন, আফগান নারীরা প্রতিদিন যে মানসিক চাপের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, এই চাপই তাঁর ত্বকে বয়সের ছাপ ফেলেছে।

সিলসিলা হামিদি বলেন, ‘অন্যরা না দেখলেও আমরা তো নিজেদের দেখি। আয়নায় সুন্দর দেখলে আমাদের ভেতরে শক্তি আসে।’

ফেসলিফট হলো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মুখের এবং ঘাড়ের ঝুলে পড়া ত্বক এবং পেশি শক্ত করে বলিরেখা কমিয়ে চেহারায় তারুণ্য ফিরিয়ে আনা।

আর লিপফিলার হলো একটি কসমেটিক চিকিৎসাপদ্ধতি। ইনজেকশনের মাধ্যমে ঠোঁটের ভলিউম, আকৃতি এবং সূক্ষ্ম রেখা ঠিক করা হয়। এতে ঠোঁট আরও ভরাট ও সুন্দর দেখায়।

আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের বিধিনিষেধে নারীদের কাজ করার সুযোগ কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে। তাঁরা আর দূরে কোথাও পুরুষ অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন না, ঘরের বাইরে উচ্চস্বরে কথা বলা নিষিদ্ধ। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়, পার্ক ও জিমে যাওয়াও তাঁদের বন্ধ হয়ে গেছে।

আফগানিস্তানে নারীদের বিউটি পার্লারগুলো বন্ধ। যে সময় বিউটি পার্লারগুলোতে তালা ঝুলছে, ঠিক সেই সময় দেশটিতে কসমেটিক সার্জারি জমজমাট হয়ে উঠছে। প্রসাধনী পরিচর্যার সুযোগ না পেয়ে অনেকেই এখন ছুরি–কাঁচির শরণাপন্ন হচ্ছেন।

সিলসিলা হামিদি ২৩ বছর বয়সে মুখের নিচের অংশে অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘ওগুলো (বিউটি পার্লার) খোলা থাকলে...আমাদের ত্বক এমন হতো না। আমাদের অস্ত্রোপচারেরও দরকার পড়ত না।’

শরীরের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন ইসলামি আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ—তালেবান কর্তৃপক্ষ বারবার এ কথা বললেও কসমেটিক সার্জারির বিষয়ে বারবার জানতে চাইলেও তারা নীরব ভূমিকা পালন করছে। কসমেটিক সার্জারি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু এটাকে চিকিৎসা হিসেবে ধরা হয়, তাই এর অনুমতি আছে।

কসমেটিক সার্জারি ক্লিনিকের একজন কর্মী এএফপিকে বলেন, সরকার তাঁদের কাজে কোনো হস্তক্ষেপ করে না। তবে নীতি পুলিশের কড়া নজরদারি আছে। এটা নিশ্চিত করা হয় যে পুরুষ রোগীর জন্য পুরুষ নার্স আর নারী রোগীর জন্য নারী নার্স আছে।

কেউ কেউ অভিযোগ করেন, তালেবান সদস্যরাও এ ধরনের কসমেটিক সার্জারির সেবা নেন।

নেগিন এশিয়া ক্লিনিকে কসমেটিক সার্জারির জন্য চীনের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। এই ক্লিনিকের উপপরিচালক সাজেদ জাদরান বলেন, এখানে পুরুষদের চুল–দাড়ি না থাকা দুর্বলতা হিসেবে ধরা হয়।

দেশটিতে ইউরো এশিয়া নামের একটি ক্লিনিক তাদের দ্বিতীয় শাখা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই ক্লিনিকের সহপরিচালক বিলাল খান বলেন, তালেবান যখন থেকে পুরুষদের কমপক্ষে এক মুষ্টি লম্বা দাড়ি রাখতে বাধ্য করেছে, তখন থেকে চুল প্রতিস্থাপন ফ্যাশন হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

বিলাল খান আরও বলেন, এখানকার সব গ্রাহকই বিত্তবান নান। কেউ কেউ ‘বিয়ের আগে চুল গজানোর জন্য ঋণ পর্যন্ত নেন।

ডার্মাটোলজিস্ট আবদুল নাসিম সাদিকি বলেন, চারতলা একটি বাসাকে ক্লিনিকে রূপান্তর করে বিদেশের মতোই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। আর এতে কোনো ‘ঝুঁকি’ নেই। তাঁর ক্লিনিকে বোটক্সের খরচ ৪৩ থেকে ৮৭ ডলার এবং চুল প্রতিস্থাপনের খরচ ২৬০ থেকে ৫০৯ ডলার।

বোটক্স হলো একটি ইনজেকশন। এটি দেওয়া হলে নির্দিষ্ট স্নায়ুর কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হয়। ওই স্নায়ু মুখের যে পেশিকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেটি তখন আর সংকুচিত হতে পারে না। ফলে কুঞ্চনরেখা বা বলিরেখাও দেখা দেয় না। বোটক্স ইনজেকশন দিলে মুখের সব রেখা মুছে যায় না। সাধারণত কপাল, দুই ভ্রুর মাঝের অংশ এবং চোখের আশপাশের পেশির জন্য এই ইনজেকশন দেওয়া হয়।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দেশটির অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমায় বাস করে। এ কারণে অনেক আফগানের কাছে শুধু বোটক্স বা চুল প্রতিস্থাপনের জন্য এই অর্থ আকাশছোঁয়া। তবু এ ক্ষেত্রে নতুন নতুন গ্রাহক পেতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দারুণ ভূমিকা রাখছে। ইনস্টাগ্রামে ভরা থাকে নতুন ট্রেন্ড—ভরা ঠোঁট, মসৃণ ত্বক আর ঘন চুলের প্রতিশ্রুতি।

তবে বিদেশফেরত আফগানদের জন্য এই খরচ তুলনামূলক কম। তাঁদের অনেকের জন্য এটা একটা সুফলও। যেমন লন্ডনভিত্তিক আফগান রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শোয়াইব ইয়ারজাদা ১৪ বছর পর দেশে ফিরেই মাথার চুল প্রতিস্থাপন করেছেন।

শোয়াইব ইয়ারজাদা বলেন, যুক্তরাজ্যে একই অস্ত্রোপচারে হাজারো পাউন্ড খরচ করতে হয়। তাই তিনি ১৪ বছর পর আফগানিস্তানে ফিরে অল্প খরচে মাথার চুল প্রতিস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানকার ক্লিনিকে ঢুকলেই মনে হয়, যেন ইউরোপের কোথাও আছি।’

কসমেটিক সার্জারির জন্য নতুন গ্রাহক পেতে প্রতিটি ক্লিনিক তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়।

নেগিন এশিয়া ক্লিনিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবেই প্রতিদিন ডজন ডজন নতুন রোগী নিবন্ধিত হয়। এই ক্লিনিকের ২৯ বছর বয়সী সহপরিচালক লাকি খান রুশ বংশোদ্ভূত আফগান চিকিৎসক। তিনি বলেন, পশ্চিমা বিশ্বের মতো আফগানিস্তানও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়।

লাকি খান বলেন, ‘অনেক রোগীর আসলে কোনো সমস্যা নেই। তবু তাঁরা অস্ত্রোপচার করাতে আসেন। কারণ, তাঁরা ইনস্টাগ্রামে ট্রেন্ড দেখে এসেছেন।’

জাতিসংঘ বলছে, আফগানিস্তানে এক কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত। দেশটিতে প্রতি তিনজনে একজনের মৌলিক চিকিৎসার কোনো সুযোগ নেই।

সার্জন লাকি খান বলছিলেন, আফগানিস্তানে অনেকের খাবারের টাকার অভাবে সত্ত্বেও রূপচর্চায় বিনিয়োগ করছেন।

Comments

0 total

Be the first to comment.

নেপালে সুশীলা সরকারপ্রধান হওয়ার দিনই জানানো হলো জাতীয় নির্বাচন কবে Prothomalo | এশিয়া

নেপালে সুশীলা সরকারপ্রধান হওয়ার দিনই জানানো হলো জাতীয় নির্বাচন কবে

চরম রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশ...

Sep 13, 2025

More from this User

View all posts by admin