কায়রোর ‘মিসরীয় জাদুঘর’ থেকে লাপাত্তা হয়ে গেছে ফারাওয়ের (প্রাচীন মিসরীয় সম্রাট) তিন হাজার বছরের পুরোনো একটি সোনার ব্রেসলেট। অমূল্য ব্রেসলেটটি এখন খুঁজছে মিসর কর্তৃপক্ষ।
মিসরের পর্যটন ও পুরাকীর্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ল্যাপিস লাজুলি (নীল রত্ন) দিয়ে সজ্জিত এ সোনার ব্রেসলেট সর্বশেষ ‘তাহরির স্কয়ারে’ অবস্থিত জাদুঘরটির রেস্টোরেশন ল্যাবরেটরিতে দেখা গিয়েছিল। ব্রেসলেট খোয়া যাওয়ার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পাবলিক প্রসিকিউশন অফিসে পাঠানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করা বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, চোরাচালানের চেষ্টা রোধে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্রেসলেটের ছবি দেশটির সব বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও স্থলসীমান্তে পাঠানো হয়েছে। জাদুঘরটির মহাপরিচালক স্পষ্ট করেছেন, অনলাইনে প্রচার হওয়া ব্রেসলেটের কিছু ছবি হারানো ব্রেসলেটটির নয়; বরং জাদুঘরের প্রদর্শনীকক্ষে থাকা অন্য একটি ব্রেসলেটের।
এই ব্রেসলেট ছিল মিসরের ‘থার্ড ইন্টারমিডিয়েট পিরিয়ডে’ (খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ১০৭৬ থেকে ৭২৩ সাল পর্যন্ত) শাসন করা সম্রাট অ্যামেনেমোপের। জাদুঘরের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, অ্যামেনেমোপ মিসরের ২১তম রাজবংশের স্বল্পপরিচিত, কিন্তু আকর্ষণীয় শাসক ছিলেন। পূর্ব ‘নীল ডেল্টা’র প্রাচীন তানিস শহরের রাজকীয় সমাধিক্ষেত্রের একক কক্ষের সমাধি ‘এনআরটি ফোর’–এ সমাহিত করা হয়েছিল তাঁকে।
তবে কয়েক বছর পর সম্রাটের দেহ পুনরায় ফারাও পসুসেনস প্রথমের পাশে সমাহিত করা হয়। পসুসেনস প্রথম ওই সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্রাটদের একজন ছিলেন। তাঁর সমাধি ১৯৪০ সালে পুনরায় আবিষ্কৃত হয়।
ক্রিস্টোস তসিরোগিয়ানিস কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ফরেনসিক প্রত্নতাত্ত্বিক। তিনি প্রাচীন নিদর্শন ও শিল্পকর্মের আন্তর্জাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্কবিষয়ক গবেষণার বিশেষজ্ঞ।
তসিরোগিয়ানিস বলেন, ব্রেসলেট হারানোর খবর ‘অবাক করার মতো নয়’। কেননা প্রাচীন নিদর্শনের জন্য বিশাল বাজার আছে। তিনি ব্রেসলেটটির পরিণতি নিয়ে সম্ভাব্য কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
প্রথম সম্ভাবনা হলো, ব্রেসলেটটি চুরির পর বাইরে পাচার করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে এটি শিগগিরই বা পরে কোনো এক সময় অনলাইনে, কোনো ডিলারের গ্যালারিতে বা নিলাম ঘরে দেখা দিতে পারে। তখন এটির সঙ্গে ‘নকল উৎসপত্র বা অস্পষ্ট তথ্য’ জুড়ে দেওয়া হতে পারে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, সোনা পেতে ব্রেসলেটটি গলিয়ে ফেলা হয়েছে। তসিরোগিয়ানিস বলেন, এটি সরাসরি বিক্রি করার চেয়ে কম লাভজনক হবে। কিন্তু তাতে চিহ্নিত হওয়া বা ধরা পড়ার ঝুঁকি কমবে।
অথবা কোনো ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় ব্রেসলেটটির শেষ ঠাঁই হবে। সংগ্রাহক জানবেন, এটি চুরি করা হয়েছে, কিন্তু তিনি তা হাতছাড়া করবেন না, বলেন এই প্রত্নতাত্ত্বিক।
ক্রিস্টোস তসিরোগিয়ানিস বলেন, ‘আরও একটি সম্ভাবনা হলো, এটি চুরি করা ব্যক্তি ফেরত দিতে পারেন বা জাদুঘরের আশপাশে পাওয়া যেতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘অতীতে এমন ঘটনা হয়েছে, বিশেষ করে আরব বসন্তের সময় মিসরে; যেখানে জাদুঘর থেকে নেওয়া কিছু নিদর্শন কয়েক দিনের মধ্যে বাগানে বা জাদুঘরের আশপাশে পাওয়া গিয়েছিল।’
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাদুঘরের ওই ল্যাবরেটরিতে থাকা অন্য সব নিদর্শনের তালিকা করা হবে এবং বিশেষজ্ঞ কমিটি সেগুলো পরীক্ষা করবে।
মিসরের প্রাচীন নিদর্শনের অবৈধ বাণিজ্য এক দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। গত বছর মিসরীয় কর্তৃপক্ষ দুজনকে আটক করেছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে শত শত প্রাচীন নিদর্শন চুরি করার চেষ্টা করার অভিযোগ ওঠে। বন্দরনগরী আলেকজান্দ্রিয়ার কাছে আবু কির উপসাগরের তলদেশ থেকে এ নিদর্শন সংগ্রহ করেছিলেন তাঁরা। তখন মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, এ দুজন নিদর্শনগুলো পাচারের পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেন।