আজ জুতোর বদলে পরে ফেলেছি দুটো কবিতাআজ গুনে গুনে খাই অমাবস্যার দাঁতের চল্লিশ কামড়,হাতে যে কাস্তে ছিল, সেটি এখন আমার গলা কাটে প্রতিদিন।যে কবিতা নিজেকে খেয়ে ফেলে, তাকেই আমি ভালোবাসিআমার গলা কেটে দিলে যদি শব্দ বের হয়—তবে আমি কবি।আর আমি একদিন ধূলিকণার মতো ক্ষমা চাইবস্বপ্ন দেখব না, স্বপ্ন আমাকে দেখবেপ্রার্থনা করব না, কেবলার দিকে চেয়ে কেবল কাঁদতে চাইববালিশে আঁকা তোমার মুখে—কারণ, এই জিহ্বা পোড়া, এই আঙুলে বারুদ,এই চোখে ছেঁড়া পোস্টারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বিস্মৃত স্বপ্নজন্মের বিলম্বে মৃত্যুর আগমনী গীতে যুগল যুগলপ্রতিটি তীর্থের পথ দুঃখের পালক রাখে গুঁজে,মায়া জলের জোনাক নীলেজীবন কোনো গন্তব্য নয়, কেবল এক চিরন্তন সন্ধ্যাআয়ুর অশ্রু শুধু, গড়িয়ে পড়ে না, টলমল করে চিরদিন।প্রত্যেক মানুষ আসলে বাস করে নিজেরই কান্নার ভেতর,প্রত্যেকে একই পাতা, এক ঝড়ে ভাসমান যুগ্ম জলচর আজমানুষ একে অপরের অভ্যন্তরে পাথরের মতো হারিয়ে যায়।
মরা মাছিটা কাচের বৈয়ামের নিচে পড়ে ছিল,তার ডানা ভাঙা, একটা হারানো গান হাওয়ার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।তবুও, আমি তাকে দেখছিলামযেন সে কার্যকর কিছু বলতে যাবে,সে বলবে, এটাই শেষ নয়আমরা সবাই একদিন মরে যাব,কিন্তু মাত্র এক দিন বেঁচে থেকেওএ পৃথিবীতে আমরা সকলে কেবলই ভ্রমণকারী।এ পৃথিবী কি ভালোবাসার জায়গা নয়প্রেম কেন নয় প্রার্থিত রাষ্ট্র!এখানে আমার চৌদিকে ঘিরে আছে কাঁটাতার, আরসেই মরা মাছির মতো আমি উড়ে উড়ে থেমে যাই, বিদ্ধ হই অবশেষে। কিন্তু যদি তোমরা কেউ আসলেই জানতে চাওএকটা মাছির শেষ মুহূর্ত কতটা বাস্তব,তার নিজের মৃত্যু তার কাছেএকটা স্বপ্নের মতো, তবে বুঝবে,আমি কেন প্রতিটি প্রলম্বিত দিবসকেমৃত্যুর দিকে পেছনে ফেলে চলতে থাকি।মাছি কোন পর্বের অন্তর্গত? উড়নক্ষম কীটের গল্প—মৃত্যু ও সময়ের দ্বৈরথেনীরবে নিশ্চিত করে নৃত্য। আমরা সবাই শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে একই কাচের বৈয়ামের নিচে পড়ে থাকবআসলে কেউ তখন আর কিছু জানবে না,কেবল একটা মরা মাছির গল্প।
আমি প্রতিদিন এক মৃত সম্রাটকে প্রণাম করি,তারপর হাঁটি পাথরের পথ দিয়ে,যেখানে ইতিহাস শুধু জুতো বদলায়, চেহারা নয়।আমি বেছে নিই না বাঁচা,আমি বেছে নিই না মরাও—আমি বেছে নিই এই দাঁড়িয়ে থাকা। রক্তের নিচে জমে থাকা নৈঃশব্দ্যের পাশেকোনো এক নীল দাঁতের ভোরেকথা হবে সম্রাট—কথা হবে, চুলে জড়িয়ে যাবে ভুল বসন্তের শিকড়কুমিরের চোখে লুকিয়ে পড়বে লবণ আকাশ,কোনো সুখী চিত্রকর বাঁশি বাজিয়ে আঁকবে কোকিলের ভেতরে মৃত্যুযেমন আগুন কথা বলে ছাইয়ের সঙ্গে।কোনো পতাকার নিচে জন্মাওনিজন্মাওনি কোনো পদকপ্রাপ্ত জেনারেলের নির্দেশে,তুমি আমাদের হিমেল রাজনীতির মধ্যেপ্রতিদিনের সম্রাট, একটা আগুনের পাতা ফেলে আসো।
মানুষের ভেতর আজ মৃত রাজ্য দাঁড়িয়ে—সিংহাসনে বসে আছে রক্তাক্ত দেবী,যার চোখে দেখতে পাই চাঁদের গর্ভপাত।পাথরের মতো ভারী যে নাম বয়ে বেড়াই—তা কি মানুষের? নাকি এক মৃত ভবিষ্যতের পুরোহিতকণ্ঠে ঢুকিয়ে দিয়েছে জিল্লতির জীবন?অদেখা আগুনের ছোবলে সময়ের শরীর থেকে চূর্ণ হয়ে পড়ে যে পঙ্ক্তিছিলাম ঘর, ছিলাম বাগান, গান—আজ শুধু স্মৃতির মোরগ ছিন্ন স্নায়ুতে ফোটা পাখিকোনো ফলের খোসা ছাড়ায় অচেনা পশুর পাখা।রাত ঘন হলে গহন থেকে ওঠে কাঁসার মতো শব্দ—কে যেন ডাকে, কে? নদীর গভীরতম স্তর থেকে,শব্দ নয়, ধ্বনি নয়—একধরনের অনন্ত তৃষ্ণা নিয়েহাতের আঙুল পাথর হয়ে যায়—তবু ছুঁতে চাইওই মেঘ, যেখান থেকে জন্মেছিল প্রথম অশ্রু।ওই বাতাসের কাঁধে ঝরে পড়া হাওয়া, প্রথম নিশ্বাস,পথ নেই, শুধু অশোক–রঙের ঝরনানীল পর্দার আড়ালে করে ঝলমল, ঝলমল।
যত দূরেই যাই, পথ আমার সঙ্গে কথা বলে,তার হাওয়া, পাথর, সঙ্গী—গন্তব্য নেই, শুধু কিছু মুহূর্তমিলিয়ে যায় ছায়ার ওজনে।পৌঁছানোর কোনো নেই তাড়া, তাইপথই হলো জীবনের ছোট্ট সব কথাপথের পুনর্লিখনে টাটকা,একই পথে বারবার হেঁটে যাওয়াকারও অভাব জেগে থাকে বাতাসেপথের কৌতূহল, পথের কল্পনা, বিশ্বাসে এখানে প্রতিটি পদক্ষেপে গল্প জন্মায়ইতিহাসে, নামহীন ভোরের কাছে নতজানুএখানে সময় থামে, হয়তো এক মুহূর্তের জন্য,আর আমি, মাটির গন্ধে ডুবে যাইকাঁপতে থাকি রোদে—ঘাসের রক্তে—ঝরা পাতার সাহসে।পেছনে কিছু নেই, কোনো দিন কেউ ফিরে না আসেপেছনে কিছু নেই, তোমার নামে জেগে থাকা ঘাসে।কেবল সম্মুখে হেঁটে গেলে আসল ভালোবাসা—পথের প্রতিটি ছোঁয়া, প্রতিটি মুহূর্ত হয় লাশযত দূর পথ যায়, তত দূর গহন তারকা নিমজ্জন।