হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে ৪১ জেলার ৪৩৮টি স্থানে

হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে ৪১ জেলার ৪৩৮টি স্থানে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ৫০টি জেলায় ছাত্র–জনতার ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ৪১টি জেলার ৪৩৮টি স্থানে।

গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে এই তথ্য উল্লেখ করেন। তিনি এই মামলার ৫৪তম ও সর্বশেষ সাক্ষী। গতকাল মঙ্গলবার তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা শেষ হয়, যা শুরু হয়েছিল গত রোববার।

জবানবন্দিতে তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর বলেন, আন্দোলনকারীরা ছিলেন নিরীহ এবং নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা। তৎকালীন সরকার এনটিএমসির (টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার) মতো প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে মুঠোফোনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করে হত্যা ও জখমের পাশাপাশি অন্যায়ভাবে আটক–গ্রেপ্তার করেছিল। এমনকি আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করতে ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল। আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণকারীরা ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং তৎকালীন সরকারদলীয় সশস্ত্র ক্যাডার।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তা ছিল ব্যাপক মাত্রায় এবং পদ্ধতিগতভাবে সাধারণ মানুষের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নিপীড়ন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এবং পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেননি।

শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে করা এই মামলার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

জবানবন্দিতে তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যত খুন, জখম, অপহরণ, গুম ও নির্যাতন করেছে, তার মূলে ছিল ক্ষমতায় টিকে থাকা। তৎকালীন সরকার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য বিরোধী দল, মত ও প্রতিপক্ষের ওপর হত্যা, জঙ্গি নাটক, গুম ও পাতানো নির্বাচন করেছিল। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে, ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য যত রকমের ব্যবস্থা আছে, তার সবই গ্রহণ করেছে। এর ফলে ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেছে।

গণ–অভ্যুত্থানের সময় ‘ভাইরাল’ হওয়া একটি ভিডিও প্রমাণ হিসেবে গতকাল ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়। ওই ভিডিওর বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর জবানবন্দিতে বলেন, ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার (ডিসি) ইকবাল হোসাইন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মুঠোফোনে পুলিশের গুলিতে হত্যাকাণ্ডের ভিডিও দেখাচ্ছিলেন। সেখানে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব জাহাঙ্গীর আলম এবং তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন উপস্থিত ছিলেন।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সেদিন আসাদুজ্জামান খানকে ওই ভিডিও দেখিয়ে ইকবাল বলেন, ‘গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না। এইটা হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।’

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি প্রমাণ করে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তা আসামিদের জ্ঞাতসারে হয়েছে।

জবানবন্দি দেওয়ার সময় বিবিসি ও আল–জাজিরার দুটি ভিডিও প্রতিবেদনও প্রমাণ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর। বিবিসির ভিডিও প্রতিবেদনে আশুলিয়া থানায় আন্দোলনকারীদের হত্যার পর পুলিশ ভ্যানে তুলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া, রংপুরে খুব কাছ থেকে পুলিশের করা গুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনা এবং সাভারে আসহাবুল ইয়ামিনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পুলিশের এপিসি থেকে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। এই প্রতিবেদনে প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহারের জন্য শেখ হাসিনার নির্দেশনার ভয়েস রেকর্ডও ছিল।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের রাজাকারের নাতিপুতি উল্লেখ করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি আল-জাজিরার ভিডিও প্রতিবেদনে রয়েছে। আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ, ভয়াবহ হামলা, দমন-নিপীড়ন এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি করার দৃশ্যও প্রতিবেদনে আছে। এ ছাড়া মুঠোফোনে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন, মুঠোফোনে সালমান এফ রহমানের সঙ্গে তৎকালীন আইজিপির কথোপকথন, আবু সাঈদের মৃতদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রাজিবুল ইসলামের বক্তব্য রয়েছে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে। জবানবন্দি দেওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীরকে জেরা শুরু করেন আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন।

ট্রাইব্যুনালের গতকালের কার্যক্রম শেষে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হতে হলে দুটি উপাদান থাকতে হয়। একটি হলো এটি (অপরাধ) ব্যাপক মাত্রায় হতে হয়। আরেকটি হলো পদ্ধতিগতভাবে হতে হয়। তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর জবানবন্দিতে যেসব তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করেছেন, সেখানে দেখা যায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশব্যাপী ব্যপক মাত্রায় পদ্ধতিগতভাবে অপরাধ ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। যাঁদের হত্যা করা হয়েছে, তাঁরা একই গোষ্ঠীর অর্থাৎ আন্দোলনকারী। আর যাঁরা আক্রমণ করেছেন, তাঁরাও একই গোষ্ঠীর অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং তৎকালীন সরকারদলীয় সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী।

Comments

0 total

Be the first to comment.

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে হাইকোর্টের চার বিচারপতির বিষয়ে তদন্ত চলছে Prothomalo | বাংলাদেশ

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে হাইকোর্টের চার বিচারপতির বিষয়ে তদন্ত চলছে

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারকাজ থেকে বিরত রাখা হাইকোর্ট বিভাগের ১২ বিচারপতির মধ্যে ৪ বিচারপতির বিষয়ে...

Sep 13, 2025
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর সঙ্গে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের বৈঠক Prothomalo | বাংলাদেশ

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর সঙ্গে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের বৈঠক

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin