শিল্প মানে শুধু ক্যানভাসে রঙের খেলা নয়—এখানে মিশে থাকে শিল্পীর ভাবনা, সমাজের গল্প, মানুষের প্রেম–ভালোবাসা আর জীবনের বেদনা। সেই আবেগ ও রঙের সমন্বয়েই ধানমন্ডির সফিউদ্দিন শিল্পালয়ে হয়ে গেল নর্থ ক্যানভাস বাংলাদেশের আয়োজনে চার দিনব্যাপী দলীয় চিত্র প্রদর্শনী ‘হৃদয়ের রঙে স্বপ্ন সাজে’।
শিল্পের উৎসবমুখর আবহপ্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার, প্রাচ্যকলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশেষ অতিথি ছিলেন অধ্যাপক ড. আজহারুল ইসলাম চঞ্চল, ডিন, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বেগম কামরুন নাহার, ভারপ্রাপ্ত পরিচালক, প্রশিক্ষণ বিভাগ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি; প্রফেসর আলাউদ্দিন আহমেদ, চেয়ারম্যান, চারুকলা বিভাগ, ইউডা এবং শিল্পী তরুণ ঘোষ, লোকশিল্প–গবেষক ও চলচ্চিত্র শিল্প নির্দেশক। সভাপতিত্ব করেন নর্থ ক্যানভাস বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক শিল্পী আহসান আহমেদ।
গ্যালারিজুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। উদ্বোধনের পর শিল্পী, শিল্পপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে দেখেছেন প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলো।
বৈচিত্র্যে ভরপুর প্রদর্শনীএবারের প্রদর্শনীতে ৩৯ জন শিল্পীর কাজ স্থান পেয়েছে। রয়েছে জলরঙে বাংলার নিসর্গ, অ্যাক্রিলিকে সমকালীন ও নিরীক্ষাধর্মী কাজ, বাস্তবধর্মী ও কনসেপচুয়াল চিত্র, ক্যালিগ্রাফি, তিনটি ভাস্কর্য এবং দুটি টেরাকোটা শিল্পকর্ম। প্রতিটি কাজের মধ্যেই ফুটে উঠেছে শিল্পীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আর সৃজনশীলতা।
জেলা থেকে রাজধানী—মেলবন্ধনপ্রদর্শনীতে ঢাকার শিল্পীদের পাশাপাশি অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন জেলা থেকে আগত শিল্পীরাও। ঝিনাইদহ, নড়াইল, ফেনী, চাঁদপুর, বরিশাল, বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী, ঠাকুরগাঁও, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, হবিগঞ্জসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিল্পীরা একত্র হয়েছেন। ফলে প্রদর্শনীটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য শিল্পমেলা।
একজন অংশগ্রহণকারী শিল্পীর ভাষায়— ‘আমাদের জেলার শিল্পীরা অনেক সময় রাজধানীতে কাজ প্রদর্শনের সুযোগ পান না। নর্থ ক্যানভাসের এই আয়োজন আমাদের কাজকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সেতুবন্ধ তৈরি করেছে।’
উদ্দেশ্য ও স্বপ্ননর্থ ক্যানভাস বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নবীন ও প্রবীণ শিল্পীদের জন্য প্রদর্শনী ও কর্মশালার আয়োজন করছে। আয়োজকদের মতে, এ ধরনের প্রদর্শনী কেবল শিল্পীদের কাজ প্রদর্শনের ক্ষেত্র তৈরি করে না, বরং তাঁদের চিন্তাভাবনা ও নান্দনিকতা বিনিময়ের সুযোগও করে দেয়।
শিল্পী আহসান আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক শিল্পী নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা চাই তাঁদের কাজ রাজধানীর দর্শকের সামনে তুলে ধরতে। এই প্রদর্শনী তাঁদের স্বপ্নপূরণের একটি পদক্ষেপ।’
দর্শকের প্রতিক্রিয়াপ্রদর্শনী দেখতে আসা এক দর্শক জানালেন, ‘এখানে এসে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের শিল্পচর্চা কতটা বৈচিত্র্যময়। জলরঙ থেকে ভাস্কর্য—সবকিছুই আমাদের ভেতরে নতুন চিন্তার জন্ম দেয়।’
শেষ কথা‘হৃদয়ের রঙে স্বপ্ন সাজে’ প্রদর্শনীটি কেবল শিল্প প্রদর্শনের নয়, বরং শিল্পীদের স্বপ্নকে রঙে রাঙানোরও এক মহামিলন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিল্পীদের একত্র করে এই প্রদর্শনী যেন হয়ে উঠেছে এক সৃজনশীলতার উৎসব, যা আগামী দিনেও শিল্পচর্চার পরিধিকে আরও প্রসারিত করবে।