হেরিনু শারদ প্রভাতে

হেরিনু শারদ প্রভাতে

শরৎকাল মানেই উজ্জ্বল নীল আকাশ, টুকরো টুকরো মেঘ, মন কেমন করা সকাল, চারপাশে শিউলি ফুলের গন্ধ। শরৎ মনে করিয়ে দেয় কাজী নজরুল ইসলামের সেই গান ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে’। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শরৎ’ কবিতার কথা মনে পড়ে যায়, ‘আজি কী মধুর মূরতি, হেরিনু শারদ প্রভাতে! হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ, ঝলিছে অমল শোভাতে।’

নীল আকাশের নিচে সাদা কাশবন প্রকৃতিকে সাজিয়ে তোলে অপরূপ সাজে। কাশফুলের এই শুভ্রতা ছুঁয়ে যায় প্রতিটি হৃদয়। শরতের মেঘমুক্ত আকাশ, শিউলি ফুলের গন্ধ প্রতিটি বাঙালিকে জানান দেন ‘মা’ আসছেন।

আশি–নব্বই সালের দুর্গাপূজা স্মৃতিতে অম্লান। আশি সালে প্রায় প্রতিটি প্রতিমা গড়া হতো মাটির। পরনে শাড়ি। পানপাতার মতো গৌরমুখ।

দু-একটি ব্যক্তিগত পূজা ছাড়া, বারোয়ারি পূজাই বেশি ছিল। তাই পূজার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল সাধারণ মানুষের। এখনকার মতো তখন জাঁকজমক কিংবা জৌলুশ কিছুটা কম থাকলেও আনন্দের কমতি ছিল না। ঘুম থেকে উঠেই শুনতে পেতাম মাইকে চণ্ডীপাঠ, ঢাকের বাজনা, বাতাসে ধূপের গন্ধ। দুর্গাপূজার আয়োজকেরা হাট থেকে বায়না করে নিয়ে আসতেন ঢাকিদের। তখন সাউন্ড সিস্টেম চল ছিল না। তখন শরতের আকাশে–বাতাসে ঢাকের আওয়াজ আর ধূপের গন্ধ ভেসে বেড়াত। আসলে যেকোনো উৎসবই বাঙালির।

এই শরৎ থেকেই শারদীয় উৎসব। যাঁকে ঘিরে এই উৎসব, তিনি শুধু পৌরাণিক দেবী গিরিরাজ হিমালয় ও মেনকার কন্যাই নন, তিনি আমাদের ঘরের মেয়ে। মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে আসবে মায়ের কাছে। তার জন্য মায়ের অধীর অপেক্ষা। তার জন্য ধরণি উৎসবের সাজে সেজেছে। দুর্গাপূজা শুধু দেবীর পূজার মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি একটি সামগ্রিক উৎসব। সামাজিক সম্প্রীতির এক সুন্দর মিশ্রণ।

আমরা প্রতিটি প্রতিমার মধ্যে ঐশ্বরিক সত্তাকে দেখতে পাই। মৃন্ময়ীর মাঝে চিন্ময়ীকে বিভিন্ন রূপে আহ্বান করে আমরা তাঁকে খুঁজে পাই। আমাদের উদ্দেশ্য হলো আরাধনা করা। প্রতিমা হলো মাধ্যম। ‘প্রতি মা’ যেখানে ‘মা’ শব্দের সঙ্গে প্রতি উপসর্গ যুক্ত করে আমরা পাই প্রতিমা। প্রতিমা শব্দের অর্থ প্রকাশিত। এই শব্দের মাধ্যমেই বোঝা যায় প্রতিটি মা–ই দেবী। মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠায় মহাশক্তির প্রতীক দেবী ‘দুর্গা’ মায়ের মতোই আবির্ভাব। যিনি নিঃশর্তভাবে ত্যাগ, ভালোবাসা, মমতা, উজাড় করে দেন।

যেকোনো পূজায় ঘট স্থাপন করতে হয়। কারণ, ঈশ্বরকে সাকার–নিরাকার দুই রূপেই পূজা করা হয়। ঘট স্থাপন ছাড়া পূজা অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হয়। দেবীপক্ষের শুক্লাষষ্ঠী বোধন দিয়েই মূলত দুর্গাপূজার সূচনা হয়ে থাকে। বোধন অর্থ জাগ্রত হওয়া। যেখানে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের প্রস্তুতি শুরু হয়। এই দিনেই মা স্বর্গ থেকে মর্ত্যে পদার্পণ করেন। সঙ্গে থাকেন গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিক।

সপ্তমীতে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হয়। দুর্গাপূজার তাৎপর্য হলো নবপত্রিকা, যা দেবীর প্রকৃতি রূপকে পূজা করার প্রতীক। নবপত্রিকার মাধ্যমে দেবী দুর্গা প্রকৃতি রূপে পূজিত হন। এটি দুর্গাপূজার অপরিহার্য অংশ। কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধান। সপ্তমীর সকালে এগুলোকে স্নান করিয়ে শাড়ি পরিয়ে গণেশের পাশে স্থাপন করা হয়। এই নবপত্রিকাগুলো নয়টি দেবীর প্রতীক হিসেবে পূজিত হয়। শস্য–শ্যামলা প্রকৃতি ও সমৃদ্ধির প্রতীক। দেবী দুর্গা প্রকৃতি রূপে বিরাজ করেন।

অষ্টমী তিথি, দুর্গাপূজার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনে দেবীর অষ্টবিধ রূপ ও অস্ত্রগুলো পূজিত হয়। পুরাণমতে, মহাষ্টমীর দিনে মা দুর্গা তাঁর ললাট থেকে দেবী চামুণ্ডা রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। দেবতাগণের আবেদনে সাড়া দিয়ে দেবী কুমারী রূপে অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে চণ্ড ও মুণ্ড নামে দুই অসুরকে নিধন করেছিলেন। চামুণ্ডা মহাময়ার এক রুদ্ররূপ। দেবীকে চামুণ্ডারূপে আরাধনা করা হয়।

১৯০১ সালের ১৮ অক্টোবর স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপূজায় অষ্টমী তিথিতে কুমারীপূজার প্রচলন করেন। দেবী দুর্গাকে নারী শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি জগন্মাতা। যিনি সৃষ্টি, পালন, ধ্বংসের মাধ্যমে পৃথিবীকে পরিচালনা করেন। নারী শক্তি, প্রকৃতি, সৃষ্টি, ধ্বংস, জ্ঞান, সমৃদ্ধি ও মুক্তির প্রতীক হিসেবে পূজিত হন।

নবমী তিথি শুরু হয় সন্ধিপূজা দিয়ে। যজ্ঞের মাধ্যমে দেবী দুর্গার কাছে আহূতি দেওয়া হয়। শাস্ত্রমতে, নবমী পূজার মাধ্যমে মানবকুলের সম্পদ লাভ হয়। নবমী পূজায় পশুবলি দেওয়া হয়। সঙ্গে আখ, চালকুমড়ো বলি দেওয়ার রীতি আছে।

নবমীর উচ্ছ্বাস–আনন্দের পরই আসে বিজয়া দশমী। প্রতিমা বির্সজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। প্রথমে ঘটের মাধ্যমে নিরাকারভাবে এবং পরে সাকার মাটির প্রতিমা বিসর্জনে মা পুনরায় প্রকৃতিতে মিশে যান। দেবীবরণ, সিঁদুরখেলা, চলে একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও মিষ্টি বিতরণ।

কবি সুনেত্রা ঘটকের ‘বিজয়া দশমী’ কবিতার বিষাদের মতো আমাদেরও মনে একই সুর বাজে।

বিজয়া দশমী, বাজে বিদায়ের বিষাণ, দেবী মা চলে যান, রেখে যান অভিমান। আশ্বিনের এই শারদ দিনে, মেঘেদের আনাগোনা, মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে হয় দেবীর প্রস্থান।

শুভশক্তির সূচনা ও অশুভশক্তির বিনাশ হোক। সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ হোক, সবার মধ্যে বজায় থাকুক অকৃত্রিম ভালোবাসা। সব অন্ধকার মুছে পূজা হয়ে উঠুক অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন।

চন্দনা সেনগুপ্তা বাচিক শিল্পী ও কবি

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin