ফিলিস্তিনি কবি রেফাত আলারির কবিতা

ফিলিস্তিনি কবি রেফাত আলারির কবিতা

আমি হই তুমি।এক, দুই—পদক্ষেপ গুনি। আয়নায় তাকাও, দেখো ভয়, ভয়!তোমার এম-ষোলোর আঘাতেব্যথা লাগে—দেখো সারা মুখে হলুদ ছাপ, গুলির দাগের মতো ছড়িয়েযেমন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েমৌমাছির কামড় শরীরময়।তখন হৃদয়ের যন্ত্রণা গড়িয়ে পড়েচোখ বেয়ে,নাসারন্ধ্র দিয়ে, কানে কানে—প্লাবিত করে চারপাশ। যেমন করেছিলআমাদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গেসত্তর বছর আগে।আমি কেবলই তুমি,আমি তোমার অতীত, তাই তাড়া করিতোমার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ।আমি লড়ি, যেমন লড়েছিলে তুমিআমি প্রতিরোধ করি, যেমন করেছিলে তুমি।একমুহূর্তের জন্য ভেবেছিলাম, তোমার দৃঢ়তাকে নেব আদর্শ করে—যদি না তোমার হাতে থাকা বন্দুকের নল, থাকত আমার রক্তাক্ত চোখে।এক, দুই—পদক্ষেপ গুনি। ঠিক সেই একই বন্দুকঠিক সেই একই গুলিযাতে মরেছিল আমাদের মা-বাবা,আজ তা চলছে আমার বুকে—বন্ধু, কে ওই গুলিকর?চিহ্নিত করো ওই গুলি,চিহ্নিত করো ওই বন্দুক, শুঁকলেই বুঝবে—এতে আমার রক্তএতে পিতার রক্ত, এতে মায়ের রক্ত—ওই বন্দুক, ওই গুলিই জানেকোন অতীত, কোন বর্তমান, কোন ভবিষ্যৎ, অতিকায় নেতিয়ে পড়েছেযুদ্ধবিমানের গানে।আমরা যমজ—অস্ত্র ও যুদ্ধ যেমনএই জীবনরেখায়ভাত ও বন্দুকের সুর তেমন। এই যন্ত্রণা,কোন খুনির মুখভঙ্গিতে আঁকবে?ওরা সব একই—শুধু পার্থক্য এই যেআমরা শিকারওরা সবাই শিকারি।আমি বলছি—আমিই তুমি,কিন্তু আমি এখন আমি একা নইযেমন তুমি এখন তুমি একা নও।আমি ওদের ঘৃণা করি না,আমি চাই—আর কোনো ফুলআর কোনো পাতাআর কোনো গাছনা মরে ওদের হাতেই বেড়ে উঠুক।ওরা যেন থামেথামাও, বন্ধু।আর রক্তপাতআর যুদ্ধবিমানের গানযেন না বাজে—ওদের গুলির তেজস্ক্রিয়ায়পুড়ছে দেখোআমার বুক—অথচ আমরা জলপাই ফুল।ওরা কি থামবেএকমুহূর্তের জন্যথামবে কি? থামাও বন্ধু, থামাও, থামাও!যে দৃশ্য দেখিবধিরের মতো—হৃদয়কে চুপ রেখে,চোখ খোলা তবু অন্ধের মতোআর মনের আয়না চুরমার করে।এক, দুইপদক্ষেপ গুনিআমিই তুমি—আমি তোমার অতীত। আমাকে হত্যা করলেতুমি নিজেকেই হত্যা করো।

যদি আমাকে মরতেই হয়,তবে তোমাকে বাঁচতে হবে—আমার গল্প আর চিত্রগুলো বিক্রি করেএকটুকরো কাপড় কিনেআর কিছু সাদা সুতা কিনে,একটা ঘুড়ি বানাবে।যে ঘুড়ির লম্বা লেজসাদা আকাশে নাচবে,গাজার আকাশে—শিশু একদিকে তাকিয়ে থাকবেতার চোখ দেখলে বুঝবে যেন ও স্বর্গের দিকে তাকিয়ে—ওর চোখে আশার আলো,যেন তার বাবার অপেক্ষায়—যে পিতা আগুনে পুড়েচলে গেছে দূরে, বহু জলপাইগাছ মারিয়ে।যে ঘুড়িটি বানাবেযখন ওড়াবে আকাশে,তখন ওই শিশুটি ভাববে একমুহূর্তের জন্য—ভাববে, হয়তো এসেছে দেবদূত,ভালোবাসা বুকে নিয়ে ঘুরছে দিগন্তে।যদি আমাকে মরতেই হয়,তবে এ মৃত্যু যেন আশার আলো হয়ে ফোটে,এ মৃত্যু যেন হয়ে ওঠে—একটি গল্প, একটি কবিতা।

আরও একটি দিন গাজায়আরও একটি দিন ফিলিস্তিনেআরও একটি দিন কারাগারেআমরা এভাবে বেঁচে থাকিইসরায়েলের রাইফেলের গানে।আমরা যে রাইফেলকেআমাদের পরিবারের চেয়ে বেশি দেখি, আর আইডিএফের মীমাংসায়আমরা মাথা নুইয়ে দিই প্রতিনিয়ত তাদেরই বাহুতে।যখন ঘুমিয়ে থাকি—অম্লবৃষ্টির মতোআমাদের জীবন ঝরে পড়ে, যেন বা আমরা একটি পাতা—বৃদ্ধরা যখন ইবাদত করেআমরা উচ্চস্বরে যখন বলি ‘আমিন’তখনো আমাদের নিশ্বাসের কাছেইসরায়েলের জান কবজ পাখিযারা কেবলই নিয়েছে হয়তো প্রাণ—আর উড়ছেআমাদের স্বপ্ন, আমাদের প্রার্থনা রোধ করতে। তবু আমাদের ঈশ্বরের দিকেই যাওয়াআমরা স্বপ্ন দেখি, আমরা প্রার্থনা করি, জীবনকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরিপ্রতিবার যখন—কোনো প্রিয়জন মরে যায়অথবা ইসরায়েল দেয় মৃত্যুদণ্ড—আমরা বাঁচি।আমরা বাঁচি।আমরা সত্যিই বাঁচি।

ড. রেফাত আলারি একজন ফিলিস্তিনি কবি ও অনুবাদক। এ ছাড়া তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং অধিকৃত গাজা উপত্যকার মানবাধিকারকর্মী। ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। ওই হামলায় তাঁর ভাই, বোন এবং তাঁদের শিশুসন্তানেরাও প্রাণ হারায়।

মৃত্যুর মাত্র পাঁচ সপ্তাহ আগে ‘যদি আমাকে মরতেই হয়’ শিরোনামের একটি কবিতা নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেছিলেন রেফাত। নিজের সম্ভাব্য মৃত্যুর কথাই যেন ভবিষ্যদ্বাণীর ভঙ্গিতে তুলে ধরেছিলেন কবিতায়।

● অনুবাদ: জুবায়ের দুখু

Comments

0 total

Be the first to comment.

ট্রেন Prothomalo | অনুবাদ

ট্রেন

ট্রেনটি কেবল যাত্রী আর মালপত্রে ঠাসা ছিল না, ভরা ছিল উত্তেজনায়, আবেগে। এটি একটি পুরোনো ট্রেন, সেই স...

Sep 28, 2025

More from this User

View all posts by admin