প্রশ্ন
আমার বয়স ৩৭। আমি যার সঙ্গে সংসার করি তিনি ৪৫। আমরা দুজনেই কর্মজীবী। আমাদের সন্তান নেই। আমাদের মা বাবা নেই। আমাদের বিয়ের বয়স ৬। এই ছয় বছর আমাদের ভালো কেটেছে। ইদানীং লক্ষ্য করছি, কিছুতেই আমরা আগ্রহ পাই না। ছুটিতে ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করে না, বাসায় অতিথি এলে ভালো লাগে না। আমরা পরস্পরকে যথেষ্ট সময় দিই। আমরা দুজনে কথা বলে দেখেছি। অন্য কোনও সম্পর্কে আমরা জড়াইনি। এই যে ভালো না লাগা সেটা আমাদের খুব বিষণ্ণ পরিবেশে ফেলেছে। আমাদের কী করা উচিত।
উত্তর
খুঁজে দেখুন কেন এমন হতে পারে।
কর্মজীবনের ক্লান্তি
আপনারা দুজনেই কর্মজীবী। দীর্ঘদিনের কাজের চাপ, মানসিক ধকল এবং প্রতিদিনের দৌড়ঝাঁপ মানুষের মনের সতেজতা কেড়ে নেয়। এর ফলে কোনও কিছুতেই আগ্রহ না পাওয়া বা শক্তি না থাকার অনুভূতি তৈরি হতে পারে, যাকে ‘বার্নআউট’ বলা হয়।
একঘেয়েমি জীবন
বিয়ের ছয় বছর পর দৈনন্দিন জীবন একটা নির্দিষ্ট রুটিনে বাঁধা পড়ে যায়। ঘুম থেকে ওঠা, অফিস করা, বাড়ি ফিরে আসা, খাওয়া এবং ঘুমিয়ে পড়া– এই চক্রে নতুনত্ব বা উত্তেজনা কমে আসে। ছুটির দিনগুলোও একই রকম কাটতে থাকলে এমনটা হওয়া স্বাভাবিক।
যৌথ লক্ষ্যের অভাব
বিয়ের প্রথম দিকে একসাথে ঘর গোছানো, ক্যারিয়ারে থিতু হওয়া ইত্যাদি অনেক লক্ষ্য থাকে। সেগুলো পূরণ হয়ে যাওয়ার পর যদি নতুন কোনও যৌথ লক্ষ্য তৈরি না হয়, তবে সম্পর্কে এক ধরনের স্থবিরতা আসতে পারে।
এখন কী করতে পারেন
আপনারা যেহেতু নিজেদের মধ্যে কথা বলেছেন এবং অন্য কোনও সম্পর্কে জড়াননি, তাই আপনাদের সম্পর্কের ভিত্তি এখনও মজবুত আছে। শুধু কিছু নতুনত্বের মাধ্যমে এই বিষণ্ণ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
রুটিন ভাঙুন, ছোট ছোট পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করুন। বড় কোনও ভ্রমণের জন্য অপেক্ষা না করে খুব ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়ে শুরু করুন। সপ্তাহে অন্তত একটি সন্ধ্যা শুধু দুজনের জন্য রাখুন। সেদিন বাইরে খেতে যান, কোনও মঞ্চনাটক বা সিনেমা দেখুন অথবা নিছকই রাস্তায় হাঁটুন। অপ্রত্যাশিত কিছু করুন। অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ করে সঙ্গীর জন্য তার পছন্দের ফুল বা খাবার নিয়ে আসুন। চাইলে একসাথে রান্না করতে পারেন। এমন কিছু করুন যা আপনারা আগে কখনও করেননি। কিংবা সকালে একসাথে হাঁটতে গেলেন, গল্প করলেন। শারীরিক কসরত মনকে সতেজ করে।
এখন মনকে অন্যকাজে লাগালে মানসিক প্রশান্তি আসতে পারে। সেক্ষেত্রে বাড়ির বারান্দায় বা ছাদে ছোট করে বাগান শুরু করতে পারেন। প্রত্যেকে নিজেদের বন্ধুদের সাথে মাসে অন্তত একবার আলাদাভাবে সময় কাটান। নিজের কোনও পুরনো শখ (যেমন: বই পড়া, ছবি আঁকা, লেখালেখি) আবার শুরু করুন। যখন একজন ব্যক্তি নিজে ভালো থাকে, তখন তার ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কেও পড়ে।
সর্বোপরি ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করুন। এর পাশাপাশি বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন (এটি অত্যন্ত জরুরি)। যেহেতু আপনারা উল্লেখ করেছেন যে পরিস্থিতিটি আপনাদের ‘খুব বিষণ্ণ পরিবেশে’ ফেলেছে, তাই পেশাদার সাহায্য নেওয়াটা লজ্জার বা ভয়ের কিছু নয়, বরং এটি একটি বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ। সেক্ষেত্রে, দম্পতি কাউন্সেলিং এর মধ্য দিয়ে গেলে থেরাপিস্ট বা কাউন্সেলর আপনাদেরকে এমন কিছু পথ দেখাতে পারেন যা আপনারা নিজেরা হয়তো ভাবতে পারছেন না। তিনি আপনাদের দুজনের মধ্যে যোগাযোগ আরও কার্যকর করতে এবং এই ভালো না লাগার পেছনের গভীর কারণ খুঁজে বের করতে সাহায্য করবেন।
প্রশ্ন
আমি বিভাগীয় শহর থেকে এসে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। আমার বাবার দোকান আছে। আয়-রোজগার খারাপ না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে আমি বন্ধুদের পিছে অনেক খরচ করেছি। এর জন্য কখনও কখনও আমাকে বাবার ওপর চাপ দিয়ে মাসে দুইবার টাকা নিতে হয়েছে। গত দুইবছরে আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছি, আমি কাজটা ঠিক করিনি। এখন যখন আমি টাকা খরচ কমিয়ে দিচ্ছি তখন আমাকে বন্ধুরা নানাভাবে হয়রানি করে, তারা কথা শোনায়। নতুন করে অন্যদের বন্ধুত্ব লাভের চেষ্টা করে দেখেছি লাভ হয় না। সবাই যার যার সার্কেল নিয়ে ব্যস্ত। একা হয়ে যাওয়ার পর আমার মনে হলো- আমি কি ভুল করলাম?
উত্তর
আপনি ভুল করেননি।
আপনি গত দুই বছরে যে বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন, তা হলো আত্ম-উপলব্ধি এবং আপনার বাবার পরিশ্রমের প্রতি সম্মান। বন্ধুদের খুশি করার জন্য বাবার ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা যে অন্যায়, এটা বুঝতে পারাটা আপনার পরিণত মানসিকতার লক্ষণ। এই বোধ সবার মধ্যে আসে না। মনে রাখবেন, বন্ধুত্ব টাকার ওপর নির্ভর করে না। যে বন্ধুরা আপনার খরচের ওপর ভিত্তি করে আপনার সাথে মিশতো, তারা আসলে আপনার বন্ধু ছিল না; তারা ছিল আপনার টাকার বন্ধু বা সুবিধাবাদী। যখনই টাকার জোগান কমে গেছে, তাদের আসল রূপ প্রকাশ পেয়েছে। এই ধরনের ‘বন্ধু’ থাকা না থাকার চেয়ে অনেক ভালো।
ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নিন
আপনি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই একটি বড় শিক্ষা পেয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা আপনাকে ভবিষ্যতে মানুষ চিনতে এবং সত্যিকারের সম্পর্ক গড়তে সাহায্য করবে। অনেকেই এই শিক্ষাটা অনেক দেরিতে, অনেক বড় আঘাত পেয়ে শেখে। এখন আপনার কষ্ট হওয়ার কারণ হলো, আপনি হঠাৎ একা হয়ে গেছেন। এতদিন যাদের আপনি ‘বন্ধু’ ভাবতেন, তাদের নেতিবাচক আচরণ আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে এবং আপনার সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কিছু বিষয় চেষ্টা করে দেখতে পারেন-
পুরনো ‘বন্ধুদের’ সাথে বোঝাপড়া
যারা আপনাকে কথা শোনাচ্ছে বা হয়রানি করছে, তাদের পুরোপুরি উপেক্ষা করুন। তাদের কথায় প্রতিক্রিয়া দেখালে তারা আরও বেশি সুযোগ পাবে। মনে রাখবেন, তাদের কথার কোনও মূল্য আপনার কাছে নেই। যদি কেউ সরাসরি কিছু বলে, শান্তভাবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থান বুঝিয়ে দিন। বলতে পারেন, ‘আমার এখন আগের মতো খরচ করার সামর্থ্য বা ইচ্ছা নেই।’ কোনও কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
নতুন সম্পর্ক গড়তে কী করবেন
আপনি লিখেছেন, নতুন বন্ধু তৈরির চেষ্টা করে লাভ হয়নি। হয়তো আপনার চেষ্টার পদ্ধতিতে একটু পরিবর্তন আনতে হবে। আপনার ডিপার্টমেন্টের বা ক্লাসের এমন কারও সাথে মেশার চেষ্টা করুন যিনি পড়াশোনায় মনোযোগী। একসাথে নোট শেয়ার করা, কোনও অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে আলোচনা করা বা লাইব্রেরিতে একসাথে পড়ার মাধ্যমেও সুন্দর বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই শুধু ক্লাস নয়। বিভিন্ন ক্লাব (যেমন: ডিবেটিং ক্লাব, ফটোগ্রাফি ক্লাব, সায়েন্স ক্লাব), সাংস্কৃতিক সংগঠন বা খেলাধুলার সাথে যুক্ত হন। যখন আপনি নিজের পছন্দের কোনও কাজে যুক্ত হবেন, তখন সমমনা মানুষের সাথে আপনার পরিচয় হবে। এই ধরনের বন্ধুত্ব অনেক বেশি টেকসই হয়।
নিজেকে সময় দিন এবং আত্মবিশ্বাসী হোন
এই সময়টাকে পড়াশোনায় আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার কাজে লাগান। আপনার ভালো ফলাফল আপনাকে আত্মবিশ্বাস দেবে। কোনও নতুন ভাষা শেখা, কোনও সফটওয়্যার শেখা বা লেখালেখির মতো কোনও দক্ষতায় নিজেকে আরও ভালো করে তুলুন। যখন আপনি নিজে থেকে স্বাবলম্বী এবং আত্মবিশ্বাসী হবেন, তখন আপনার অন্যের ওপর নির্ভরতা কমবে। লাইব্রেরিতে একা বই পড়া, হলে বা মেসে নিজের মতো করে সময় কাটানো, একা কোথাও ঘুরে আসা—এই বিষয়গুলোকে উপভোগ করতে শিখুন। একা থাকা মানেই নিঃসঙ্গতা নয়।