প্রযুক্তি দুনিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে করছে বিশ্বের তাবৎ বড় বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান। ফলে একদিন হারিয়ে যাবে স্মার্টফোন। এর জায়গায় কী আসবে, সেটি বড় প্রশ্ন। প্রযুক্তি খাতের অভিজ্ঞরা ব্যক্তিগত কম্পিউটিংয়ে পরবর্তী বড় উদ্ভাবন কী হতে পারে, তা নিয়ে পূর্বাভাস দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর সহকারীগুলো অ্যাপলের তৈরি সিরি সফটওয়্যারের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাযুক্ত ও দক্ষ। এই এআইনির্ভর সহকারীগুলো শিগগিরই আমাদের ব্যক্তিগত কম্পিউটিং ডিভাইসগুলোর মূল অপারেটিং সিস্টেমে পরিণত হবে। এমনকি স্মার্টফোন সফটওয়্যারের গুরুত্বকেও ছাড়িয়ে যাবে।
অ্যাপ ও এদের ঝকঝকে ইন্টারফেস তেমন গুরুত্বপূর্ণ থাকবে না। কারণ, এআই সহকারীরা আমাদের হয়ে ডিভাইস ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে দেবে। যেমন বন্ধুদের সঙ্গে পরিকল্পনা করা, কেনাকাটার তালিকা তৈরি করা কিংবা মিটিংয়ে নোট নেওয়া। এতে আমাদের আর সফটওয়্যারের মেনু ঘেঁটে দেখা বা কি–বোর্ডে টাইপ করার প্রয়োজন হবে না।
কোয়ালকমের মোবাইল প্রোডাক্টস বিভাগের নির্বাহী অ্যালেক্স কাটুজিয়ান বলেন, ‘স্মার্টফোনে যেসব অপারেটিং সিস্টেম ও অ্যাপ দিয়ে আপনি কাজ করতে অভ্যস্ত, সেগুলো ধীরে ধীরে পেছনের দিকে চলে যাবে। আপনার সহকারী আসলে আপনার জন্যই কাজ শুরু করবে।’
কোয়ালকম আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসের জন্য চিপ তৈরি করেছে।কিছু প্রযুক্তি নির্বাহীর পূর্বাভাস অনুযায়ী, স্মার্টফোন হার্ডওয়্যারের জায়গা দখল না করলেও অদূর ভবিষ্যতে একটি নতুন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত কম্পিউটিং ডিভাইস তার জায়গা নিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, এআই-সক্ষম চশমা বা ব্রেসলেট আপনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি জানবে এবং আপনার সহকারী দিনভর আপনাকে সাহায্য করবে।
প্রতিটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে বড় প্রশ্ন, স্মার্টফোনের পর কী আসবে? অ্যাপল, গুগল, স্যামসাং, অ্যামাজন ও মেটার বর্তমান ও সাবেক কর্মীরা কী ভাবছেন, তা দেখে নেওয়া যেতে পারে।
স্মার্ট চশমা বা গ্লাস
মার্ক জাকারবার্গ মেটার ওয়েবসাইটে পোস্ট করা একটি চিঠিতে বলেন, ‘যেসব চশমা আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বুঝতে পারবে; যা আমরা দেখি তা দেখবে, যা শুনি তা শুনবে এবং দিনভর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে—সেগুলো আমাদের প্রধান কম্পিউটিং ডিভাইস হয়ে উঠবে।’
দশকের পর দশক ধরে প্রযুক্তিবিদেরা স্বপ্ন দেখেছেন এমন একটি কম্পিউটার চশমার, যার লেন্সে ডিজিটাল স্ক্রিন বসানো থাকবে এবং মানুষের দেখার স্থান ও ব্যক্তিদের সম্পর্কে বাস্তব সময়ের তথ্য দিতে পারবে। এআই সহকারী এই ডিভাইস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ব্যবহারকারী একজন বন্ধুর মতো কথা বলে এর থেকে সাহায্য চাইতে পারবে।
গত বছর মেটা এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। রে-ব্যান মেটা স্মার্ট চশমার জন্য একটি সফটওয়্যার আপডেট আনা হয়, যেগুলোতে ক্যামেরা, স্পিকার ও মাইক্রোফোন রয়েছে। এতে এআই সহকারী মেটা চশমায় যুক্ত হয়ে ব্যবহারকারীকে প্রশ্ন করার সুযোগ দিয়েছে।
গত বছর ওরিয়ন নামের একটি প্রোটোটাইপ প্রকাশ করেছে মেটা, যার ফ্রেমে স্ক্রিন বসানো রয়েছে। এটির মাধ্যমে ব্যবহারকারী সভায় কাউকে কথা বলার সময় ডিজিটাল নোটের মতো তথ্য একনজরে দেখতে পারবে। এ বছর গুগলও জেমিনি নামে তার এআই সহকারীর মাধ্যমে চালিত একই ধরনের চশমার প্রোটোটাইপ উন্মোচন করেছে।তবে এখনই এ ধরনের প্রযুক্তি মূলধারায় আসছে না। ক্রিয়েটিভ স্ট্র্যাটেজিজের কনজ্যুমার টেকনোলজি বিশ্লেষক ক্যারোলিনা মিলানেসি বলেন, ডিজিটাল ডিসপ্লের চশমা আরও দূর ভবিষ্যতের বিষয়।
মিলানেসি আরও বলেন, এত পাতলা ও ছোট ডিভাইসে ব্যাটারির চার্জ ধরে রাখার বিষয়টি দুশ্চিন্তার। এ ছাড়া প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সব ধরনের মুখের সঙ্গে মানিয়ে যায়, এমন চশমা নকশা করতে এবং লাভজনকভাবে বাজারজাত করতে বছরের পর বছর সময় লাগতে পারে।
অ্যাম্বিয়েন্ট কম্পিউটার
অ্যাম্বিয়েন্ট কম্পিউটার হলো এমন একটি ধারণা, যেখানে কম্পিউটিং আমাদের চারপাশে নির্বিঘ্নে একীভূত থাকবে। ব্যবহারকারী সরাসরি ডিভাইস চালানোর পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সংযুক্ত সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করবে, পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে সেবা দেবে।
আমরা স্মার্টফোনের ওপর যতটা নির্ভরশীল হয়ে উঠেছি, ততই সেগুলো বিভ্রান্তির কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, বিভিন্ন অ্যাপ থেকে ক্রমাগত নোটিফিকেশন আসতে থাকে। অ্যামাজনের ডিভাইস বিভাগের প্রধান পানোস প্যানাই পূর্বাভাস দিয়েছেন, এআই সহকারী অ্যাম্বিয়েন্ট কম্পিউটারের গুরুত্ব বৃদ্ধি করবে।
অ্যাম্বিয়েন্ট কম্পিউটার হলো এমন ডিভাইস, যার মধ্যে মাইক্রোফোনযুক্ত স্পিকার, ঘরে স্থাপন করা স্ক্রিন এবং শরীরে পরিধানযোগ্য গ্যাজেট অন্তর্ভুক্ত। অ্যামাজন এই পণ্যের ধারা এক দশকের বেশি সময় ধরে তৈরি করে আসছে। তবে স্মার্টফোন একেবারে হারিয়ে যাবে, এমন কথা বলেননি প্যানাই। তিনি বলেন, ‘স্মার্টফোন আমাদের সঙ্গে থাকবে, যেমন ল্যাপটপও স্মার্টফোন জনপ্রিয় হওয়ার পরও আমাদের জীবনের অংশ হিসেবে রয়ে গেছে।’
স্মার্টওয়াচ
স্মার্টফোন কোম্পানি নাথিংয়ের সিইও কার্ল পেই মনে করেন, ভবিষ্যতে স্মার্টওয়াচ গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হয়ে ওঠবে। এর ফিচার ব্যবহার করে ক্যামেরার সাহায্য ভিডিও কল করা যাবে। অবশ্য গত বসন্ত পর্যন্ত পেই বিশ্বাস করতেন, ভবিষ্যতের প্রধান যন্ত্র থাকবে স্মার্টফোন।
তবে এআইয়ের দ্রুত উন্নতির কারণে এই সিইওর ধারণা বদলে গেছে। তিনি এখন মনে করেন, স্মার্টফোন পকেটে থাকাকালে মানুষের পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য এআইচালিত একটি ডিভাইস থাকা প্রয়োজন। তখন থেকে নতুন রূপে আসা স্মার্টওয়াচের কথা বলেন।
কেন স্মার্টওয়াচ? অ্যাপল ওয়াচের মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া স্মার্টওয়াচ ইতিমধ্যে পরিচিত। প্রতিবছর ১০ কোটির বেশি বিক্রি হয়। তাই এআইচালিত নতুন ফিচারযুক্ত স্মার্টওয়াচ হতে পারে অপ্রতিরোধ্য, চোখে পড়বে না, কবজিতে বসানো ও সর্বদা উপস্থিত থাকবে।
এআই প্রত্যেক ব্যক্তির ঘড়িতে অপারেটিং সিস্টেমকে অনন্য করবে। ফিটনেস অনুরাগীদের জন্য এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁদের কার্যক্রম ট্র্যাক করবে। কাজের প্রতি মনোনিবেশী উদ্যোক্তাদের জন্য এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সময়সূচি ও অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করবে।
পেই বলেন, এখনকার কম্পিউটিং অনেকটা ম্যানুয়াল। উদাহরণস্বরূপ, বন্ধুর সঙ্গে কফি খাওয়ার জন্য বার্তা, ক্যালেন্ডার, রিভিউ—এই তিন অ্যাপ ব্যবহার করতে হয়। তবে ভবিষ্যতে স্মার্টওয়াচের এআই এজেন্টগুলো এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে করবে।
রেকর্ডার
ভবিষ্যতে স্মার্টফোনের স্থান করে নিতে পারে আরেকটি যন্ত্র হচ্ছে রেকর্ডার। লিমিটলেস এআইয়ের সিইও ড্যান সিরোকার এমনই এক ধারণা দিয়েছেন। এটি একটি পরিধেয় এআই স্টার্টআপ, যা ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যানসহ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার তহবিল পেয়েছে।
সিরোকার বলেন, ‘রেকর্ডার এমন একটি যন্ত্র, যা আমাদের কাজের সক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে পারে এবং আমাদের মনকে জৈবিক সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে পারে।’
মানব স্মৃতি অত্যন্ত অবিশ্বাস্য। গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের ৯০ শতাংশ স্মৃতি এক সপ্তাহের মধ্যে ভুলে যাই। (অথবা হতে পারে ৮০ শতাংশ।) মানুষ যদি নিখুঁত স্মৃতি রাখত, তখন কী হতো?
লিমিটলেস এআইয়ের মতো স্টার্টআপ—যারা একটি এআই পেন্ড্যান্ট তৈরি করেছে, যা পোশাকের সঙ্গে ক্লিপ করে রাখলে তা কথোপকথন রেকর্ড করে এবং স্বয়ংক্রিয় ট্রান্সক্রিপ্ট তৈরি করে। এ পরিধেয় রেকর্ডারগুলো এআই কোচের সঙ্গে যুক্ত হলে মানুষ আরও বেশি স্মৃতি ধরে রাখতে পারবে।
শ্রবণ ক্ষমতাধর কম্পিউটার
প্রাইভেসি উদ্বেগের কারণে সব জায়গায় বহনযোগ্য এআই ডিভাইস কম গ্রহণযোগ্য হতে পারে বলে মনে করেন অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের সাবেক কর্মী হার্ডওয়্যার প্রকৌশলী ডেভ ইভান্স। তিনি বলেন, সব সময় শ্রবণ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার অফিসে আরও মানানসই। অফিসে দ্রুত কাজ করার জন্য ভবিষ্যতে স্পিকার বা স্ক্রিনের একটি সিরিজ জায়গা করে নিতে পারে।
সফটওয়্যার প্রকৌশলী বব রিসক্যাম্পের মতে, পরিধেয় যন্ত্র নির্মাতারা একসঙ্গে সব কাজ করতে পারে, এমন এক ভবিষ্যতের দিকে কাজ করছেন। তিনি এক দশক আগে গুগল গ্লাস হেডসেট নিয়ে কাজ করার সময় এটাই ভেবেছিলেন।
রিসক্যাম্প তখন কল্পনা করেছিলেন, মানুষ প্রতিদিন সকালে কয়েকটি ফ্যাশনেবল ডিভাইস পরবে। যেমন একটি নেকলেস, স্মার্টওয়াচ ও একটি চশমা। এগুলোতে এআই একসঙ্গে কাজ করবে। তবে গুগল গ্লাসের নকশার কারণে এটি সফল হনি। তবে এখনকার পরিধেয় এআই কম্পিউটারগুলোর ক্ষেত্রে এ সমস্যা আর নেই।
নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে