কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচে—এই আপ্তবাক্যকে বাস্তব করে তুলেছেন দিনাজপুরের সুন্দরবন গ্রামের আমিনুল ইসলাম। ৪৯ বছর বয়সী এই মানুষ ২৬ বছর ধরে সেখানকার কৃষক ও খামারিদের কাছে যেন এক আস্থা ও ভরসার প্রতীক। লাউগাছের হলুদ পাতা, শিমগাছের কুঁচকে যাওয়া ডগা কিংবা পচনের শিকার মাছ—এমন সব সমস্যায় আমিনুল ইসলামের ‘সমন্বিত কৃষি ক্লিনিক’ হয়ে উঠেছে এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।
একসময় রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের দোকানে কাজ করা আমিনুল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কর্মপদ্ধতিতে এনেছেন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এখন তিনি জোর দিচ্ছেন জৈব কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ওপর। নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া মানুষটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অর্ধশতাধিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যা তাঁর হাতে–কলমে অভিজ্ঞতাকে আরও পোক্ত করেছে। ১৯৯৯ সালে প্রশিক্ষণের পর পশুচিকিৎসা দিয়ে শুরু হলেও ২০১৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সমন্বিত কৃষি ক্লিনিক’। এই ক্লিনিকে দেড় সহস্রাধিক কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদবিষয়ক বই-ম্যাগাজিন, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, যেমন মাইক্রোস্কোপ, বীজ শোধনযন্ত্র, মাটি-পানি পরীক্ষার সরঞ্জাম এবং চিকিৎসা সরঞ্জামে ঠাসা একটি কক্ষ রয়েছে। এই বিপুল প্রস্তুতিই বলে দেয়, কৃষি ও কৃষকের সেবার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার কতটা গভীর।
আমিনুল ইসলামের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তাঁর জৈব সার ও বালাইনাশক উৎপাদন। তিনি নিজেই প্রস্তুত তা করছেন। এসব সার ও বালাইনাশক একদিকে যেমন মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করছে, অন্যদিকে কৃষকদের রাসায়নিকের ভয়ংকর প্রভাব থেকে রক্ষা করছে। নিজের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি তিনি স্থানীয় কৃষকদের কাছে এগুলো বিক্রি করছেন, যা থেকে প্রতি মাসে তাঁর ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হচ্ছে। তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক কৃষক এখন নিজেরাই জৈব সার উৎপাদনে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রশিক্ষণ ও সনদ লাভ করে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন আমিনুল। পরবর্তী সময়ে নিরলস পরিশ্রম ও জৈব কৃষি নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ তাঁকে এনে দিয়েছে ‘দক্ষ কৃষি ডাক্তার’-এর স্বীকৃতি। তিনি কৃষকদের বোঝান যে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে ভবিষ্যতে মানুষ ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাই নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই।
আমিনুল ইসলাম প্রমাণ করেছেন, শুধু উচ্চশিক্ষা নয়, সঠিক প্রশিক্ষণ, গভীর আগ্রহ ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একজন মানুষ গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। তাঁর ক্লিনিক ও উদ্যোগ আজ শুধু তাঁর গ্রাম নয়, পার্শ্ববর্তী এলাকার কৃষকদের জন্যও এক মডেল। আমিনুল ইসলামের মতো উদ্যোক্তারাই আমাদের কৃষি খাতকে নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। আমিনুলকে আমাদের অভিবাদন।