কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি এখন অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—এই প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ওপেনএআই, চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, সম্প্রতি জানিয়েছে তাদের ৮০০ মিলিয়ন ব্যবহারকারীর মধ্যে প্রায় ১.২ মিলিয়ন মানুষ এমনভাবে চ্যাটবটের সঙ্গে ‘আবেগনির্ভর’ কথোপকথনে যুক্ত হন, যা তাদের একাকিত্ব বাড়াতে পারে এবং বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেয়।
ওপেনএআই দাবি করছে, তাদের নতুন সংস্করণ ব্যবহারকারীদের বাস্তব জগতে সম্পর্ক ও সংযোগের গুরুত্ব বোঝাতে নকশা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—চ্যাটজিপিটি এখনো প্রায় সব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত থাকে, যা অনেককে এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল করে তুলছে।
কিছু পরিবারের অভিযোগ, অতিরিক্ত চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের কারণে মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা আত্মহননের ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে ব্যবহারকারীদের সচেতন ও সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করা জরুরি।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা জয় বিদ্যার্থী বলেন, ‘প্রযুক্তির সঙ্গে যেমন নিরাপদ সম্পর্ক রাখা সম্ভব, তেমনি চ্যাটবটের সঙ্গেও তা সম্ভব। তবে এর প্রকৃতি বুঝে ব্যবহার করাই মূল চাবিকাঠি।’
চ্যাটজিপিটির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়াতে পাঁচটি কার্যকর কৌশল—
১️. এআই চ্যাটবট প্রযুক্তি সম্পর্কে সত্যিকার ধারণা রাখুন
চ্যাটজিপিটি যতই মানবসদৃশ মনে হোক না কেন, এটি কোনো সংবেদনশীল সত্তা নয়। এটি কেবল একটি ‘পূর্বাভাস ইঞ্জিন’, যা পরবর্তী শব্দ কী হবে তা অনুমান করে বাক্য তৈরি করে। ফলে এটি ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিকর উত্তরও দিতে পারে।
এই সীমাবদ্ধতাগুলো বুঝে ব্যবহার করলে মানুষ চ্যাটবটকে ‘বন্ধু’ বা ‘সহচর’ হিসেবে না দেখে, কেবল একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে—এবং অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে।
২️. চিন্তাভাবনা নয়, কাজ আউটসোর্স করুন
এআই বিশেষজ্ঞ সল রাশিদি বলেন, ‘আমি চ্যাটবটকে আমার হয়ে চিন্তা করতে দিই না, শুধু আমার সময় বাঁচাতে কাজে লাগাই।’তিনি রান্নার পরিকল্পনা, পার্টির আয়োজন বা অফিসের ভিডিও স্ক্রিপ্ট তৈরিতে চ্যাটবট ব্যবহার করেন, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত ও ধারণা সবসময় নিজেই নেন।
এই অভ্যাস মানুষকে সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাশক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
৩️. আগে নিজে ভাবুন, তারপর চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করুন
এমআইটি গবেষক ড. রেনে রিচার্ডসন গোসলাইন বলেন, ‘নিজে না ভেবে সরাসরি চ্যাটবটের পরামর্শ নেওয়া মস্তিষ্কের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি দুর্বল করে।’
তিনি পরামর্শ দেন—কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজস্ব মতামত তৈরি করুন, তারপর চ্যাটবটের পরামর্শ নিন। এতে চিন্তার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকে।
৪️. প্রশংসা নয়, প্রতিবন্ধকতা খুঁজুন
গোসলাইন বলেন, চ্যাটবট সবসময় ইতিবাচক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় প্রতিক্রিয়া দেয়, যা বাস্তব জীবনের সম্পর্কের মতো ‘চ্যালেঞ্জ’ বা ফ্রিকশন দেয় না।কিন্তু মানুষের সঙ্গে মেলামেশার মধ্যে থাকা মতবিরোধ ও বিতর্কই মানসিক বিকাশে সহায়তা করে। তাই কেবল চ্যাটবটের প্রশংসায় ভেসে না গিয়ে, বাস্তব জীবনের সম্পর্কের মধ্যে থাকুন।
৫️. এআইয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় বর্তমান মুহূর্তে থাকুন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি মনে হয় আপনি চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথা বলতে বলতে ‘অটোপাইলটে’ চলে গেছেন, সেটিই নির্ভরতার সংকেত।
জয় বিদ্যার্থী পরামর্শ হলো, চ্যাটবটকে ‘বুদ্ধিমান ডায়েরি’ হিসেবে ব্যবহার করুন। এটি আপনাকে চিন্তা করতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত সবসময় আপনারই হওয়া উচিত।
সল রাশিদি বলেন, ‘আমি বারবার দেখেছি, যখন কেউ এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে, তখন সে নিজে চিন্তা করা বন্ধ করে দেয়।’
প্রযুক্তিকে ব্যবহার করুন সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে, বিকল্প মানুষ হিসেবে নয়—তাহলেই থাকবে ভারসাম্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা।
সূত্র: ম্যাশেবল