চীনে বড় হচ্ছে বাংলাদেশি টেনিস কোচের বাজার

চীনে বড় হচ্ছে বাংলাদেশি টেনিস কোচের বাজার

বাংলাদেশের সুকুমার রায় ২০০৫ সালে চীনে এক অন্যরকম শ্রমবাজার খুলেছিলেন। গত ২০ বছরে এই বাজারে ভিড় করেছেন অনেক বাংলাদেশি। শুধু তাই নয়, নিজেদের শ্রম ও মেধায় তারা চীনের মাটিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন দক্ষ টেনিস কোচ হিসেবে। এখন প্রায় ৫০ জনের মতো কোচ সেখানে ভালো সম্মানী ও সম্মানের সঙ্গে কাজ করছেন। তবে সুকুমার রায়ের সঙ্গে নুরুল ইসলামের সাক্ষাৎ না হলে হয়তো চীনের এই দুয়ার-ই খুলতো না। ২০০৫ সালে নুরুল ইসলাম ছিলেন বেইজিংয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে তৎকালীন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা। চট্টগ্রাম ক্লাবে তিনি সুকুমারকে দেখেছিলেন এবং টেনিস কোচ হিসেবে তার চীনে কাজ করার আগ্রহ সম্পর্কে ধারণাও পেয়েছিলেন। একদিন সত্যি সত্যি বেইজিংয়ের পোটার্স হুইল একাডেমিতে কাজ করার প্রস্তাব পান সুকুমার। ওই একাডেমির এক কর্মকর্তার কাছে সাক্ষাৎকার দিয়ে সেই পরীক্ষা উতরে যান তিনি। এরপর টানা ২০ বছর ধরে সুকুমার রায় চীনের টেনিস উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন। তার দেখানো পথে চীনের বিভিন্ন প্রদেশে প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি টেনিস কোচ এখন কাজ করছেন।

শুরুর গল্প

বেইজিংয়ে শুরুতে সুকুমার রায়কে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। একে তো ভাষাগত সমস্যা, তারওপর নতুন জায়গা, নতুন চ্যালেঞ্জ। সব চ্যালেঞ্জ উতরে এই টেনিস কোচ সুনামের সঙ্গে নিজেকে মেলে ধরেন। এখন চীনের অনেক অঞ্চল জুড়ে বাংলাদেশি কোচদের সুনাম। তা ভাবলেই এখন সুকুমার রায়ের কাছে অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে।

বেইজিং থেকে বাংলাদেশ টেনিস দলের সাবেক খেলোয়াড় সুকুমার রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, নিজের শুরুর দিকের সংগ্রামের কথা, ‘চট্টগ্রাম ক্লাবে নুরুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো আজ চীনে এতো বছর সাফল্যের সঙ্গে কাজ করতে পারতাম না। দেশ থেকে আজ অর্ধশত কোচও আসতে পারতো না। এখানে এসে আমরা সবাই নিজেদের সেভাবে প্রস্তুত করেছি, চীনা ভাষা শিখেছি, আন্তর্জাতিক কোচিং কোর্স করেছি। মোটকথা, কোচ হিসেবে এখানে টিকে থাকার জন্য যা করতে হয়, সবই করেছি। যেন অন্য সবার সঙ্গে আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারি।’

৬০ বছর বয়সী এই বাংলাদেশি শুরুতে কোচিং করাতেন পোটার্স হুইল একাডেমিতে। সেখানে ৩০ টি টেনিস কোর্ট আছে। তাদের সঙ্গে কাজ করেন চেক প্রজাতন্ত্র ও রাশিয়ার কোচরাও। ৪৫০ জন খেলোয়াড়ের ট্রেনিং সুবিধা সম্পন্ন এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম একাডেমি বলা চলে। ৫-৮ বছর বয়সী বাচ্চাদের ট্রেনিং দিয়ে শুরু করা হয়, শেখানো হয় ২০ বছর বয়সী খেলোয়াড়দেরও। আবাসিক একাডেমিতে জিমসহ সব সুবিধা যেমন ইনডোর এবং বেশ কিছু ক্লে ও ঘাসের কোর্ট আছে। সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রযুক্তি। 

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6900f7bd18b74" ) ); ঈর্ষণীয় সম্মান ও সম্মানী

এ পর্যন্ত চারটি একাডেমিতে কাজ করেছেন সুকুমার। বর্তমানে বেইজিং রাম্বো গার্ডেন একাডেমিতে কাজ করছেন। শুরুতে মাসে ৫০০ ডলার দিয়ে বেতন শুরু হলেও এখন পাচ্ছেন ১০ হাজার ডলার! যে দেশে টেনিসের চাল-চুলো ঠিক নেই, সেখানকারই একজন কোচ বিদেশে টেনিসের বিদ্যা-বুদ্ধি বিক্রি করে এত টাকা আয় করছেন! 

জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় আখতার হোসেন আইটিএফ ও পিটিআই সার্টিফিকেটধারি কোচ। ২০০৫ সালে সুকুমার রায়ের দুই মাস পর চীনে টেনিস কোচিং করাতে যান তিনি। সেই পোটার্স হুইল একাডেমিতে তিন মাস ট্রায়ালের পর টিকেও যান। বর্তমানে চাওইয়াং ডিস্ট্রিক্ট ক্লাবে আছেন। সেখানে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আখতার বলছেন, ‘ওরা আমাদের অনেক সম্মান দেয়। কাজে স্পৃহা পাওয়া যায়। টেনিসে ভালো বিনিয়োগ তাদের। আমাদের সম্মানিও ভালো। যারা বাংলাদেশ থেকে আসছেন তারা ভালো করছেন। এখানে বাংলাদেশি কোচদের সুনাম রয়েছে। আর আমি ইউরোপীয় কোচদের সঙ্গে লড়াই করে একাডেমিতে কাজ করেছি।’

বর্তমানে চীনে কর্মরত ৫০ জনের মধ্যে বিকেএসপি থেকে বের হওয়া কোচের সংখ্যাই বেশি। নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করেই তারা চীনা টেনিসে বাংলাদেশের জন্য দরজা উন্মুক্ত রেখেছেন। প্রতিবছরই চীনের বিভিন্ন প্রদেশে দু-একজন করে বাংলাদেশি কোচরা যাচ্ছেন। শুরুতে বেতন বেশি না হলেও আস্তে আস্তে কোচিংয়ে পারফরম্যান্স দেখিয়ে অনেক টাকা আয় করেন। 

বিখ্যাত জাস্টিন হেনিন একাডেমিতে কাজ করেছেন আখতার হোসেন। সেখানে কোচ কার্লোস রদ্রিগেজের কাছে খেলা শিখতেন চীনের বিখ্যাত নারী টেনিস তারকা লি না। তখন ওই একাডেমিতে বয়স ভিত্তিক পর্যায়ে কোচের দায়িত্বে ছিলেন বাংলাদেশি আখতার হোসেন। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এশিয়াডে সোনা জয়ী চীনা টেনিস তারকা কিনওয়েন ঝেং-কে বয়স ভিত্তিক পর্যায়ে খেলা শিখিয়েছেন আখতার হোসেন। ২০১৩ সাল থেকে দুই বছর তার অধীনে থাকা কিনওয়েন ঝেং এখন ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিংয়ের চার নম্বরে।

কিনওয়েনকে কোচিং করানোর স্মৃতিচারণ করে আখতার হোসেন বলেছেন, ‘সে ছোট বেলা থেকেই দারুণ প্রতিভাবান৷ মাঠে তার প্রমাণও দিয়েছে। ১১ বছর থেকে তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম। বয়স ভিত্তিক টেনিস খেলোয়াড়দের জন্য বিখ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের অরেঞ্জ বল এডি হার্ড টুর্নামেন্টে তিনবার নিয়ে গিয়েছিলাম তাকে ৷ প্রতিবারই ভালো ফলাফল করেছে৷ তাকে কোচিং করিয়েছিলাম, এটা আমার গর্ব। বড় তারকার সঙ্গে কোচের নাম জুড়ে থাকাটাই হলো আসল সার্টিফিকেট। এটাই যে কোনও কোচের ক্যারিয়াকে এগিয়ে দেয় অনেকখানি। তখন সম্মান ও সম্মানীর কোনও ঘাটতি হয় না।’

বিকেএসপির আরেক টেনিস খেলোয়াড় শরীফুল ইসলামও চীনে গেছেন কোচিং করাতে। সাংহাইয়ের একটা একাডেমিতে কোচিং করিয়ে যাচ্ছেন, সঙ্গে আছেন তার স্ত্রী জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের সাবেক ডিফেন্ডার আঁখি খাতুন। শরীফুল বলছেন, ‘আমাদের একাডেমি থেকে ঢাকা আইটিএফ অনূর্ধ্ব-১৮ প্রতিযোগিতায় দুজন সাফল্য পেয়েছেন। প্রতিবছর কোনও না কোনও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য আসছে। আসলে আমরা বাংলাদেশিরা পরিশ্রম করে যাচ্ছি। এখানে কাজ করতে হলে আমাদের কোচিং নিয়ে সবসময় আপডেট থাকতে হয়।’

লি না-কে দিয়েই চীনের টেনিস বিপ্লব শুরু

এখন কিনওয়েন ঝেং চীনা টেনিস তো বটেই বিশ্ব টেনিসে অনেক বড় নাম। কিন্তু চীনে টেনিস বিপ্লবের শুরুটা হয়েছিল লি না-কে দিয়েই। বাংলাদেশি কোচ সুকুমার রায় তা-ই মনে করছেন, ‘লি নার সাফল্য মূলত চীনের টেনিস বদলে দেয়। ২০১১ সালে তার ফ্রেঞ্চ ওপেন জেতার পরই টেনিস বিপ্লবটা শুরু হয়। চীনে সারা দেশে টেনিসের চর্চা হয়ে থাকে। ওরা বেশ খরচও করে। একাডেমিতে এক ঘণ্টা টেনিস শিখতে লাগে বাংলাদেশি টাকায় ১০ হাজার। তাহলে বুঝে নিন কেমন আগ্রহ তাদের। টেনিসের মাধ্যমে ওদের একাডেমির সঙ্গে ইউরোপ আমেরিকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের চুক্তি রয়েছে। ভালো করতে পারলে সেখানে বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করা যায়। আন্তর্জাতিক সার্কিটের পাশাপাশি নিজ দেশে খেলে অর্থ-উপার্জন করার সুযোগ তো আছেই। বলতে পারেন পেশা হিসেবে নিয়ে সফল অনেকেই। তাই শত শত ছেলে মেয়েরা ছোটবেলা থেকে টেনিস শিখছে।’

এদেশে যেমন সিদ্দিকুর রহমানের কল্যাণে গলফে ঝোঁক বেড়েছে ঠিক তেমনি লি না-র ফ্রেঞ্চ ওপেন জয়টাই চীনা টেনিসের টার্নিং পয়েন্ট। ছেলেমেয়েরা তখন টেনিসে ঝুঁকতে শুরু করে এবং তারই সুফল হলো আজকের কিনওয়েনের মতো তারকারা। তাছাড়া সব অলিম্পিক গেমগুলোর ওপর চীন সবসময় গুরুত্ব দেয়। সুবাদে চীনা টেনিসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশি কোচরা।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6900f7bd18bad" ) ); আছে বাংলাদেশি মেয়ে কোচও

বিকেএসপির প্রথম নারী ব্যাচের শিক্ষার্থী সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন রুমাসহ এখন চারজন মেয়ে রয়েছেন টেনিস কোচিংয়ে। চীনের সাংহাইয়ে বেশ সুনামের সঙ্গেই কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা তার। এরমধ্যে সেনজেন শহরে প্রায় ৬ বছর ধরে আছেন সাফিনা শাহ লক্সমী। তার স্বামী নাইমুল ইসলাম অমিও সেখানে কোচ হয়ে কাজ করছেন।

সাফিনা বলেছেন, ‘শুরুতে একটু ভয় ছিল যে, এখানে এসে ঠিকমতো কোচিং করাতে পারবো কিনা। তবে আসার পর ধীরে ধীরে সব ভয় দূর হয়ে যায়। এখন আমাদের একাডেমিতে আমি শুধু মেয়েদের কোচিং করাই না, ছেলেদেরও দায়িত্ব পালন করে থাকি। এখানে নিয়ম কানুন মানলে আর আপনার টেনিসে মেধা থাকলে সাফল্য পেতে কষ্ট হয় না। আমার স্বামীও কোচিং করিয়ে যাচ্ছে সাফল্যের সঙ্গ।’

বাংলাদেশের টেনিস নিয়ে তাদের আক্ষেপ

চীনে টেনিসকে এগিয়ে নিতে জনা পঞ্চাশেক বাংলাদেশি কোচ নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু বাংলাদেশে সেভাবে খেলাটির কদর নেই। খেলোয়াড় কিংবা কোচরা সেভাবে আয় করতে পারেন না। আখতার হোসেন আক্ষেপ করে করেছেন, ‘চীনা খেলোয়াড়দের নিয়ে যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেতাম, সেসব দেশের পতাকা দেখতাম; তখন মনে হতো এখানে বাংলাদেশের পতাকাও থাকতে পারতো৷ দেশে আমরা এমন সুযোগ-সুবিধা পেলে নিশ্চয় বিশ্বমানের খেলোয়াড় বের করতে সহায়তা করতাম।’

সুকুমার রায়ও একই সুরে বলেছেন,‘দেশের জন্য কে না কাজ করতে চায়। চীনে সবকিছু বিশ্বমানের। আমরা যদি সেই অভিজ্ঞতা দেশে কাজাতে লাগাতে পারতাম, তাহলে ভালো হতো।’

বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ কারেন বর্তমান প্রেক্ষাপটে বলেছেন,‘আমাদের এখানে টেনিসে ক্যারিয়ার গড়া কঠিন- এটা তো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোচরা ভালো পারিশ্রমিক না পেলে কেন কাজ করবে। চীনে এতো বাংলাদেশি কোচ কাজ করছে শুনে অনেক ভালো লাগছে। ওদের অর্থনীতি এখন অনেক বড়। বিশ্বে অন্যতম সুপার পাওয়ার। আমার কাছে যারাই আসছে তাদেরকে আমি এনওসি দিয়ে দিচ্ছি। এটা তো দেশের গর্ব। এখন আমাদের এখানে বেসরকারি তিনটি একাডেমির অনুমোদন দিয়েছি। এতে করে যদি কোচদের একটু হলেও মূল্যায়ন হয়।’

এদেশে টেনিসের খুব প্রচলন নেই। ব্যয়বহুল খেলাটি তাই সমাজের একটা সৌখিন শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই এখানে খেলোয়াড় ও কোচের ক্যারিয়ার গড়া হয়ে ওঠে না। এই বাস্তবতা বুঝে ফেডারেশনও কোচদের দেশে আটকে না রেখে অনাপত্তি পত্র দিয়ে বিদেশে কাজ করার দুয়ার খুলে দিয়েছে। অন্যভাবে বললে, টেনিস কোচ রপ্তানির সুযোগ করে দিয়েছে। আর এই সুযোগে বাংলাদেশি কোচরাও নিজেদের শ্রম, মেধা ও দক্ষতা দিয়ে টেনিসের শ্রম বাজার তৈরি করেছে চীনে।

 

Comments

0 total

Be the first to comment.

সেমিফাইনালে থামলেন জারিফ BanglaTribune | টেনিস

সেমিফাইনালে থামলেন জারিফ

৩৫তম বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড টেনিস ট্যুর জুনিয়র জে-৩০ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের জারিফ আবরারের অগ্রযাত্রা...

Oct 16, 2025

More from this User

View all posts by admin