চায়ের দোকান থেকে নিউইয়র্ক, পুরস্কার ঘোষণার দিনেই মৃত্যু

চায়ের দোকান থেকে নিউইয়র্ক, পুরস্কার ঘোষণার দিনেই মৃত্যু

কোনো তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা তাঁর প্রথম ছবি দিয়ে ভারতীয় সিনেমার মানচিত্রে আলোড়ন তুললেন; ছবিটি পেল জাতীয় পুরস্কার। আর পুরস্কার ঘোষণার একই দিনে সেই তরুণ চিরতরে চলে গেলেন। এই অবিশ্বাস্য ঘটনাই ঘটেছিল অবতার কৃষ্ণ কৌলের জীবনে। ১৯৩৯ সালে কাশ্মীরের শ্রীনগরে জন্ম নেওয়া কৌলের শৈশবই ছিল বেদনার। বাবার হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে একদিন তিনি ঘর ছেড়ে পালালেন। রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দিন কাটত, চায়ের দোকানে কিংবা ছোট হোটেলে কাজ করতেন। অভুক্ত থেকেও বই আর শব্দের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। এই অপূর্ণ শৈশবই হয়তো পরে তাঁকে সিনেমার ভেতর মানুষ আর সমাজকে ভিন্ন চোখে দেখার শক্তি দিয়েছিল।

নিউইয়র্কে নতুন জীবনপরবর্তী সময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি পেয়ে পৌঁছে গেলেন নিউইয়র্কে। দিনের চাকরির ফাঁকে রাতগুলো কাটত সিনেমা ও সাহিত্য নিয়ে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস আর পরে ব্রিটিশ ইনফরমেশন সার্ভিসে কাজ করলেও তাঁর আসল পৃথিবী ছিল অন্যত্র। সহকর্মীরা প্রায়ই দেখতেন, হাতে উপন্যাস বা নোটবুক নিয়ে বসে আছেন কৌল। তাঁর চোখে তখন এক স্বপ্ন—চলচ্চিত্র নির্মাণ।

‘২৭ ডাউন’: এক অমর সৃষ্টি১৯৭০ সালে ভারতে ফিরে মারচেন্ট-আইভরি প্রোডাকশনের ‘বম্বে টকি’ ছবিতে কাজ করেন তিনি। এরপরেই শুরু করেন নিজের প্রকল্প ‘২৭ ডাউন’। রমেশ বকশীর উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এই ছবিতে দেখা যায় এক তরুণ রেলকর্মীর নিঃসঙ্গতা ও প্রেমের গল্প।

নায়িকা রাখি আর নবাগত এম কে রায়না চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া ও ভূবনেশ্বর মিশ্র। শিল্পনির্দেশনায় যুক্ত ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের সহযোগী বংশী চন্দ্রগুপ্ত। সাদা–কালো চিত্রভাষা আর কবিতার মতো ফ্রেম ছবিটিকে করে তুলেছিল সমান্তরাল সিনেমার এক মাইলফলক। মুক্তির পরই সমালোচকেরা ছবিটিকে ‘সময়ের আগে তৈরি এক ক্ল্যাসিক’ বলে আখ্যা দেন।

অকালমৃত্যু, অসমাপ্ত স্বপ্ন১৯৭৪ সালে ঘোষণা হলো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—হিন্দি সেরা ছবি হিসেবে নির্বাচিত হলো ‘২৭ ডাউন’। কিন্তু পরিবারের আনন্দ স্থায়ী হলো না। সেদিনই মুম্বাই থেকে এল শোকবার্তা, মৃত্যু হয়েছে কৌলের। বয়স তখন মাত্র ৩৫।

ডুবে যাওয়ার কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে শোনা যায়, কিন্তু সত্যিটা আজও স্পষ্ট নয়। পরিবার ভেঙে পড়েছিল, আর ভারতীয় সিনেমা হারিয়েছিল এক সম্ভাবনাময় নির্মাতা। তাঁর হাতে তখনো তিনটি চিত্রনাট্য প্রস্তুত ছিল। হয়তো সেগুলো হলে ভারতীয় সমান্তরাল সিনেমা অন্য রকম পথ দেখত।

সহকর্মীদের চোখে কৌলঅভিনেতা এম কে রায়না বলেন, ‘নিউইয়র্কের অভিজ্ঞতা, সাহিত্য আর সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে বানিয়েছিল অনন্য। তিনি যদি বেঁচে থাকতেন, প্রভাবশালী নির্মাতা হওয়া সময়ের ব্যাপার ছিল।’

পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপও প্রায়ই উল্লেখ করেন তাঁর নাম। কাশ্যপের মতে, ‘কৌল আমাদের সিনেমার এক ভুলে যাওয়া কিংবদন্তি।’তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin