বাতাসে বিষ, নিঃশ্বাসে আর অবহেলায় আয়ু কমছে ৬ বছর

বাতাসে বিষ, নিঃশ্বাসে আর অবহেলায় আয়ু কমছে ৬ বছর

রবিবার (১০ অক্টোবর), ঢাকা সারা বিশ্বে ১২৬টি নগরীর মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। এবারই প্রথম না, এর আগেও এত শীর্ষে আমরা পৌঁছাতে পেরেছি। তবে এই শীর্ষস্থান দখল উদযাপন করার বিষয় না— দূষণে তৃতীয় হয়েছে আমাদের শহর ঢাকা। গত একমাস ধরেই উত্তরোত্তর খারাপের দিকে যাচ্ছে ঢাকার বায়ুমান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণের কারণ জানার পরেও এর বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়াতে না পারাও এক ধরনের অপরাধ। কেননা, এই দূষণের কারণে অন্তত ৬ বছর আয়ু কমছে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের। কেবল মানুষ না, বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে প্রাণি ও উদ্ভিদ জগতও। আবার, এত ভয়াবহতার মধ্যে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর মধ্যে দায়সারা ভাব দেখছেন পরিবেশবাদীরা। যখন আমরা দূষণের শীর্ষে পৌঁছে যাচ্ছি— তখন এটা প্রতিরোধে গড়ে তোলা জাতীয় কমিটি কোনও সভা বসায়নি।

বায়ুদূষণের দেশগুলোতে শীর্ষস্থানে ঘুরে ফিরে নাম আসে— ভারত, পাকিস্তান, চীন, বাংলাদেশ, গ্রীস, তাজাকিস্তানের নাম। আবার কী কারণে এসব দেশে দূষণ বেশি, তার কারণগুলোও কাছাকাছি একই রকমের। বিশ্লেষকরা বলছেন, উৎসগুলো জানার পরেও ব্যবস্থা না নেওয়া এবং প্রকল্পকেন্দ্রিক চিন্তা আমাদের এই জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। এই কারণে প্রকল্প শেষ হলে সেই সক্রিয়তা আর থাকে না। একইভাবে এটি যেমন কেবল কোনও একটি মন্ত্রণালয়ের বিষয় না, তেমনই বাতাসের বিষয়ে আঞ্চলিক প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই।

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দূষিত নগরের বিষয়ে গবেষণায় দূষণের কারণ হিসেবে বেরিয়ে এসেছে— যানবাহনের ধোঁয়া ও রাস্তার যানজট। এছাড়া শিল্প ও উত্তপ্ত কয়লাভিত্তিক জ্বালানি, কৃষি‑খড় পোড়ানো, ইটভাটা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, ছোট কারখানা ও অপরিকল্পিত শিল্পকলার কারণে সুক্ষ্ম কণা নির্গমন বেশি  মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা। এমনকি প্রায় তালিকায় শীর্ষ পাঁচে অবস্থান নেওয়া গ্রীসেরও বায়ুমান কমার পেছনে কারণ অনেকটা একই। এথেন্সের মতো জায়গায় নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইডের স্তর অনেক জায়গায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। আবাসিক তাপায়ন ও কাঠ বা কাঠকয়লা পোড়ানো— শীতে ঘরোয়া জ্বালানির কারণে দুষণ বেশি বলে জানা গেছে।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট দুই বছর আগের একটি প্রতিবেদনে দেখিয়েছে যে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থিত— যার মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান রয়েছে, যেখানে বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ বসবাস করে। এই এলাকার বায়ুদূষণের মাত্রা মানুষের গড় আয়ুর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

এর ফলে কী হচ্ছে?

বায়ুদূষণ ও আয়ু কমে যাওয়া প্রসঙ্গে একাধিক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশর বায়ুমান বিশ্লেষণে জানা গেছে, বায়ুদূষণের কারণে এখানকার মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৫ থেকে ৭ বছর কমে আসছে। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘‘এখন স্মোক আর ফগ মিলিয়ে বাতাসে ‘স্মোগ’ তৈরি হয়েছে। এটা ধোঁয়া ও কুয়াশা এবং ধুলার সন্নিবেশ। সব মিলিয়ে এরমধ্যে মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। এতে শ্বাস কষ্টের রোগী, শিশু, বয়স্ক ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।’’

আসলে কী পরিস্থিতিতে আছি আমরা, প্রশ্নে পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের চিকিৎসক লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বায়ুদ‍ূষণে অনেকদিন যাবত নগরীগুলো এই পরিস্থিতিতেই আছে। আমাদের যত লোক হার্ট অ্যাটাকের কবলে পড়েন, তার কারণ বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসতন্ত্রীয় অসুখ— হাঁচি, কাশি, টিবি জাতীয় সংক্রামক রোগ হয়। বায়দূষণের কারণে ত্বকে অ্যালার্জি হয়। দূষিত বাতাসে এমন কিছু ধাতব পদার্থ থাকে— যার কারণে শিশু ও গর্ভের শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এমনকি বায়ুদূষণের কারণে নারী পুরুষের উর্বরতা হ্রাস পায় এবং একারণে বন্ধ্যা দম্পতি বাড়ছে। দূষিত বায়ুর কারণে হার্টের ও ব্লাড প্রেসারের ওপর প্রভাব পড়ায় মানুষ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। সংক্রামক অসুখের ক্ষেত্রে বায়ুদূষণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে গাছের সালক সংস্লেশন ক্ষমতা কমে যায়, দূষণটা জমে জমে পানিতে দ্রবিভূত হয়। ফলে জলজ-প্রাণি ও ভূমিজ-প্রাণি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ কেবল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। এর কারণে প্রাণি ও উদ্ভিদ জগতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ‘’

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের দ্রুত স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করে চীন ইতোমধ্যে লাভবান হয়েছে। স্বল্পমেয়াদের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারকে দৃঢ় হতে হবে এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করতে হবে। এখন পরিকল্পনাগুলো নিয়ে আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে হবে না। আসলেই কাজটি আপনি করতে চান, এমন মনোভাব নিয়ে সক্রিয় হতে হবে।’’

কার্যকর উদ্যোগ আছে?

অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, ‘‘ঢাকার বাতাসে দূষণের উৎস আমরা জানি— ফিটনেসবিহীন গাড়ি, ইটের ভাটা, ১২ মাস রাস্তা কাটা ও দীর্ঘদিন সে অবস্থাতেই ফেলে রাখা, বর্জ্য পোড়ানো। উৎস জানা থাকার পরেও সেটা নিয়ন্ত্রণের কোনও কার্যকর পদক্ষেপ আমরা নিচ্ছি না এবং কোনও সমন্বয়ও নেই। হাইকোর্ট মাঝে মাঝে রুলিং দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানায়। তবে আজ পর্যন্ত কোনও পদক্ষেপই নিয়মিত নয়।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমরা ফিটনেসবিহীন গাড়ির অভিযান করি ঘোষণা দিয়ে, যেন অপরাধীকে সুযোগ করে দেওয়া হয়। অথচ খুব সহজেই এগুলো বন্ধ করা যায়। আদালতের নির্দেশ আছে ২৫ বছরের পুরোনো গাড়ি রাস্তায় থাকবে না। তারপরেও কেন থাকে, কাদের আকাঙ্ক্ষায় থাকে। সরকার ব্যবসায়ীদের চাপে নতি স্বীকার করে এই ধরনের যানবাহন, শিল্প চলতে দিচ্ছে। যতদিন সেটা করবে এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না।’’

অধ্যাপক কামরুজ্জামান আরও বলেন, ‘‘আমরা কখনোই বলছি না রাতারাতি কিছু হবে। আমরা যদি নিয়মিত কাজটি করতাম, গত ২০ বছর ধরে সবার সামনে দিয়ে এই দূষণ যেভাবে বাড়ছে সেটা হতো না।’’

বায়ুমান ক্রমাগত খারাপের দিকে যাওয়া বিষয়ে সরকারি উদ্যোগগুলো বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) বেগম শাহানাজ রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। বর্তমানে বায়ু উত্তর-পশ্চিমে প্রবাহিত হচ্ছে, সেটাতো বন্ধ করা যাবে না। আমরা স্থানীয় উৎসগুলো প্রতিরোধে কাজ করছি। এর অংশ হিসেবে সাভারের ইটভাটাসহ যে দূষণের উৎস আছে, সেগুলো বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সচেতনতার অং‍শ হিসেবে গত কয়েকদিন আগে বিভিন্ন পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।’’ বাতাসের দূষণ যে পর্যায়ে গেছে, তাতে এসব উদ্যোগ পর্যাপ্ত কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘আমরা চেষ্টা করছি। এর সঙ্গে আবহাওয়া পরিবর্তনের বিষয় জড়িত। আমাদের দিক থেকে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ছিল, মোটামোটি পর্যায়ে সেটা নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। এটা এককভাবে পরিবেশ অধিদফতরের কাজ না। এর সঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয়, রোডস হাইওয়ে, সিটি করপোরেশনগুলোর কাজ আছে, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। একটা টাস্কফোর্স আছে, তারা কি বিশেষ কোনও নির্দেশনা দিতে পেরেছে কিনা, প্রশ্নে তিনি আরও বলেন, ‘‘বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে একটা জাতীয় কমিটি আছে, এবছর এখনও বসা হয়নি। খুব শিগগিরই বসবে আশা করছি।’’

Comments

0 total

Be the first to comment.

ঢাকার প্রথম সরকারি ‘গ্রিন বিল্ডিং’ হবে পরিবেশ অধিদফতরের নতুন অফিস BanglaTribune | পরিবেশ

ঢাকার প্রথম সরকারি ‘গ্রিন বিল্ডিং’ হবে পরিবেশ অধিদফতরের নতুন অফিস

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলে...

Sep 28, 2025
সচিবালয়ে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ, আগতদের দেওয়া হচ্ছে কাপড়ের ব্যাগ BanglaTribune | পরিবেশ

সচিবালয়ে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ, আগতদের দেওয়া হচ্ছে কাপড়ের ব্যাগ

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তিনটি মনিটরিং টিম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সচিবালয়ে একবার ব্যব...

Oct 07, 2025

More from this User

View all posts by admin