বাংলাদেশ থেকে যেভাবে অর্থপাচার হচ্ছে বিদেশে

বাংলাদেশ থেকে যেভাবে অর্থপাচার হচ্ছে বিদেশে

বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের ঘটনা বহুদিন ধরেই বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারস ও অফশোর লিকসসহ আন্তর্জাতিকভাবে ফাঁস হওয়া বিভিন্ন নথিতে বহু বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিদেশে অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের তথ্য উঠে এসেছে। এসব নথিতে অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সরকারি কর্মকর্তার নাম প্রকাশিত হয়েছে।

নথিগুলোতে দেখা গেছে, অনেকেই ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, দুবাইসহ বিভিন্ন অফশোর জুরিসডিকশনে বিলাসবহুল সম্পদ ও কোম্পানি গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে প্যারাডাইস পেপারস ২০২০–এ ফারিদা ওয়াই, শহীদ উল্লাহ, চৌধুরী ফয়সাল, আহমাদ সামির, মুসা বিন শমশের, ফজলে এলাহী ও কে এইচ আসাদুল ইসলামের নাম উঠে আসে। তাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং আয়ারল্যান্ডেও সম্পদের মালিক বলে এসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও কানাডায় অর্থপাচারের অভিযোগ সামনে এসেছে। এক্ষেত্রে যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন— সাবেক যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট; যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া; ঢাকা উত্তর সিটির সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম; নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার।

অর্থপাচারের এসব ঘটনাকে বিশ্লেষকরা ক্রমবর্ধমান জাতীয় সংকট হিসেবে দেখছেন।

সব পেশার মানুষেরাই জড়িত অর্থপাচারে

বাংলাদেশে অর্থপাচার কেবল ব্যবসায়ী বা রাজনীতিবিদ নয়—প্রায় সব পেশার মানুষ এতে জড়িত থাকছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিকভাবে ফাঁস হওয়া তথ্য ছাড়াও দেশীয় বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে এমন একাধিক উদাহরণ উঠে এসেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এবি ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা অফশোর ব্যাংকিংয়ের আড়ালে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ২৩৬.০৮ কোটি টাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং সিঙ্গাপুরে পাচার করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেখিয়ে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুমোদনে সম্পন্ন হয়েছিল এবং পরিকল্পনাটি মূলত অর্থ আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছিল।

২০২২ সালে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারস–এ অর্থপাচারের সঙ্গে যুক্ত ৬৯ জনকে চিহ্নিত করে, যাদের মধ্যে ১০ জনের নাম হাইকোর্টে দাখিল করা প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়।

অর্থপাচারের আরেকটি উদাহরণ হলো রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খান। যিনি স্বর্ণ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। ২০১৮ সালে ঢাকায় স্পেশাল ব্রাঞ্চের পরিদর্শক মামুন ইমরান খান হত্যা মামলার আসামি এই আরাভ খান। হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দায়েরের পর তিনি নকল নাম ও কথিত ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে প্রথমে ভারত এবং পরে দুবাই পালিয়ে যান বলে জানা গেছে। ২০২৩ সালে তিনি দুবাইয়ে “আরাভ জুয়েলার্স” নামে একটি স্বর্ণের দোকান খোলেন। দোকান উদ্বোধনে বিশাল আয়োজন করা হয়। বিশাল স্বর্ণের “শিকারি পাখি”র প্রতীকের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি বেশ কয়েকজন সেলিব্রিটি উপস্থিত ছিলেন।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত আরাভ খান ও তার স্ত্রীসহ আটজনকে পরিদর্শক মামুন হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

অর্থপাচারের অভিযোগ শুধু ব্যাংক বা ব্যবসা খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন পেশার অনেকেই বিদেশে অর্থপাচার করেছেন। যদিও সাধারণত রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীই বেশি আলোচনায় আসেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুদক সতর্ক করে জানায় যে, সরকারি কর্মচারীরা গোপনে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও বিদেশি পাসপোর্ট গ্রহণ করছেন, যাতে দুর্নীতি তদন্ত ও আইনি দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়া যায়। দুদক জানায়, কিছু কর্মকর্তা সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮–এর ৪০ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে বিদেশি পাসপোর্ট নিয়েছেন। এ ধরনের আচরণ বিদেশে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ গোপন করা এবং জবাবদিহিতা এড়ানোর সুযোগ দেয়।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কিছু কর্মকর্তা দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ ব্যবহার করে শুধু অর্থপাচারই করছেন না, বরং দেশের অর্থনীতি ও সরকারি সেবার সততা ক্ষতিগ্রস্ত করছেন।

অর্থপাচার যেন সামাজিক ব্যাধি

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে অর্থপাচার শুধুমাত্র ক্ষমতাশালীদের দ্বারা পরিচালিত হয়—এটি একটি ভুল ধারণা। বাস্তবে, দুর্নীতি এখন “সবার জন্য প্রযোজ্য” হয়ে উঠেছে এবং সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে গেছে।

সরকারের অর্থপাচার প্রতিরোধী কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত এক অর্থনীতিবিদ বলেন,“অর্থপাচারের নেটওয়ার্ক এখন সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রবেশ করেছে। ডাক্তাররা আয় কম দেখায়, আইনজীবীরা সন্দেহজনক সম্পত্তি লেনদেনে যুক্ত থাকে, ঠিকাদাররা প্রকল্পে অতিরিক্ত বিল তৈরি করে, আর মধ্যপদস্থ কর্মকর্তারা শিক্ষাজনিত বা বিনিয়োগের আড়ালে টাকা বিদেশে পাঠায়। এটি আর শুধু অভিজাতদের অপরাধ নয়—এটি একটি সামাজিক ঘটনার রূপ নিয়েছে।”

বাংলাদেশে ব্যবসা-ভিত্তিক অর্থপাচারের বৃদ্ধি—যেমন ভুয়া আমদানি-রপ্তানি ইনভয়েস বা প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো—অনেক পেশাজীবী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর করতে সহায়ক হয়েছে, যা সন্দেহ জাগায় না। এছাড়া, হুন্ডি অপারেটরদের মাধ্যমে ধনাঢ্য পরিবারগুলোর জন্য বিদেশে সম্পত্তি ক্রয়ের পদ্ধতি সহজ হয়েছে, যা সরকারি ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার না করেই সম্ভব হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের খোঁজে বাংলাদেশ

গত এক দশকে বাংলাদেশ বহু কমিটি গঠন করেছে, বিদেশি সরকারের কাছে অনুসন্ধান পাঠিয়েছে এবং চুরি হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও ফিরিয়ে আনার জন্য চুক্তি করেছে। তবু ফলাফল এখনও হতাশাজনক।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) সহ বিভিন্ন সংস্থা বিদেশে হাজার হাজার সন্দেহভাজন অ্যাকাউন্ট ও সম্পত্তি সনাক্ত করেছে—যার মোট মূল্য হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে এর মধ্যে কোনও অর্থপূর্ণ পুনরুদ্ধার এখনও সম্ভব হয়নি।

কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা কঠিন, যদি প্রমাণ বা দণ্ডবিধি সম্পূর্ণ না থাকে। অনেক ক্ষেত্রে, দেশীয় সংস্থাগুলোর বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা পরিবারের নামে থাকা সম্পদ অনুসন্ধানের জন্য আইনি সুযোগও সীমিত।

লন্ডার্ড অ্যাসেটস রিকভারি কমিটি দেশের বাইরে লন্ডার করা অর্থে রূপান্তরিত সম্পদ পুনরুদ্ধারের কাজ করছে। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থার যৌথ অভিযানে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।

এছাড়া, বিদেশে লন্ডার করা অর্থ ও বিনিয়োগ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের জন্য ২০টি দেশে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে।

জানা গেছে, দুদক অবৈধ সম্পদ ও অর্থপাচারের তদন্তের অংশ হিসেবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সম্পদের খোঁজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, হংকং এবং সাইপ্রাসে এমএলএআর পাঠিয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠানো এমএলএআরের মাধ্যমে ওই দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থের উৎস, লেনদেনের ধরন এবং সম্পদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হয়েছে।

বিদেশে মিলেছে ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য সামনে এনেছে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিদেশে অন্তত ৪০,০০০ কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

এখন পর্যন্ত এই সম্পদ গড়ে তোলার সঙ্গে জড়িত ৫২ জন বাংলাদেশিকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে।

এ বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত, সিআইসির একটি বিশেষ দল সাইট ভিজিট ও তদন্ত পরিচালনা করে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই, লন্ডন, নিউইয়র্ক, ভার্জিনিয়া, ফ্লোরিডা এবং কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশিদের সম্পদ শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই এবং লন্ডনে সবচেয়ে বেশি সম্পদ রয়েছে।

তদন্তে মোট ৩৪৬টি সম্পত্তি ব্যক্তির নাম ও কোম্পানির নাম উঠে এসেছে। সিআইসি’র মহাপরিচালক আহসান হাবিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “৫২ জন প্রভাবশালী বাংলাদেশি দেশের বাইরে প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তাদের পাসপোর্ট ইতোমধ্যেই জব্দ করা হয়েছে।”

নীরবতার রাজনীতি

বাংলাদেশে বড় বড় অর্থপাচারের কেলেঙ্কারি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠলেও মূল কাঠামোগত কারণগুলো নিয়ে তেমন কেউ কথা বলে না। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি আক্রমণমূলক মনোভাব অর্থপাচারের ভয়াবহ চিত্রকে ঢেকে রাখছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “যখন বিষয়টিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়, তখন প্রশাসন ও পেশাজীবী শ্রেণি নজরের বাইরে চলে যায়। এ কারণেই, অপরাধী কে তা জানা সত্ত্বেও আমরা কোনও শাস্তি, কোনও সংস্কার, বা কোনও পুনঃফিরতি দেখতে পাইনি।”

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরী সতর্ক করে বলেন, “বিলম্ব শুধু অবৈধ সম্পদের আইনি সুরক্ষা আরও দৃঢ় করে। সময় যত এগোচ্ছে, পাচারকারীদের অবৈধ সম্পদ ততই নিরাপদ হয়ে যাচ্ছে। পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ‘নীরবতার রাজনীতি’ অর্থপাচার বন্ধ করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রয়োজন জালের পরিধি আরও বিস্তৃত করা

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশকে এখন জরুরি ভিত্তিতে অর্থপাচার রোধে তার কৌশল পুনর্গঠন করতে হবে—এবং অবৈধ সম্পদকে দলীয় বিবেচনার বাইরে এনে একটি জাতীয় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।

প্রতিবেশী দেশ ভারত ২০১৮ সাল থেকে কড়াকড়িভাবে প্রিভেনশন অব  মানিলন্ডারিং অ্যাক্ট (পিএমএলএ) বাস্তবায়ন করে আসছে। শুধু ২০২৫ অর্থবছরেই দেশটি ২৩,০০০ কোটি রুপি পুনরুদ্ধার করেছে। আদালত-অনুমোদিত সমঝোতার মাধ্যমে আরও ১৫,০০০ কোটি রুপি ভুক্তভোগীদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে।

শ্রীলঙ্কা ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রোসেস অব ক্রাইম অ্যাক্ট পাস করেছে, যা আদালতের আদেশ ছাড়াই সম্পদ জব্দের ক্ষমতা প্রদান করে। পাকিস্তানও ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্য থেকে ১৯০ মিলিয়ন পাউন্ড উদ্ধার করেছিল।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান অর্থপাচারবিরোধী ব্যবস্থার রাজনৈতিক ব্যবহারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “আইন বাছাই করে প্রয়োগ করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলো রাজনৈতিক দল দ্বারা প্রভাবিত। সংস্কার ছাড়া কার্যকর ফলাফল অর্জন সম্ভব নয়।”

সমষ্টিগত ব্যর্থতা

বাংলাদেশে অর্থপাচার এখন আর কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তির গল্প নয়; এটি আদালত থেকে ক্লিনিক, নির্মাণ সাইট থেকে দফতর—সব প্রতিষ্ঠানে নৈতিকতার অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মানসুর বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তারা সরাসরি ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করছেন।

তিনি বলেন, “তবে আমলা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও অন্যান্য পেশাজীবীদের মাধ্যমে যে টাকা বিদেশে গেছে, সে বিষয়টি দুদক ও সিআইডি দেখতে পারে। সেটা আমাদের কাজ না।”

গভর্নর আরও জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যান্য খাতের অর্থপাচার তদন্তে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দেশে অর্থপাচার থেমে নেই; সুযোগ পেলেই মানুষ এখনো টাকা পাচার করছে।”

তিনি বলেন, “অর্থপাচার আগে হতো, এখনও হচ্ছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর দেশে অর্থপাচার বন্ধ হয়ে গেছে—এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই।”

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি আরও বলেন, “পাচার হওয়া টাকা দেশে ফেরানো একটি জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। তাই শুধু টাকা ফেরানোর দিকে না তাকিয়ে, অর্থপাচার প্রতিরোধের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।”

“এখনও আমরা সেই কার্যকর উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি না,” মন্তব্য করেন তিনি।

ইফতেখারুজ্জামান জানান, খুব অল্প পরিমাণ পাচার হওয়া টাকা দেশে ফেরত আসে। তাই যে পথ ও পদ্ধতিতে টাকা পাচার হয়, তার ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

তিনি বলেন, “এনবিআর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে অর্থপাচার অনেকটাই রোধ করা সম্ভব।”

তিনি আরও বলেন, “কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শুধু ব্যবস্থা নিলেই হবে না। অর্থপাচারে জড়িত যারা—বিরোক্র্যাট, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা—যেই হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। তা না হলে কিছু মানুষ চাপের মুখে পড়বে, আর বড় দুর্বৃত্তরা পার পেয়ে যাবে।”

অর্থপাচার ফেরত আনতে এনবিআর, বিএফআইইউ, দুদক, সিআইডিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আরও দক্ষ ও সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রয়োজনে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষিত জনবল এনে এই কাজে নিয়োগ দেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, “অর্থপাচার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, কারণ প্রতিরোধই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।”

সব অর্থপাচার এক রকম নয়

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও আর্থিক অপরাধ বিশ্লেষক ড. ওমর ফারুক বলেন, পাচার হওয়া অর্থ এক ধরনের নয়। এর এক বড় অংশ আসে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে। আবার আরেক অংশ বৈধ আয়ের হলেও নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিদেশে চলে যায়।

তিনি বলেন, অপরাধমূলক অর্থ সাধারণত ব্যাংক জালিয়াতি, কমিশন বাণিজ্য বা ঘুষ থেকে আসে—যা “অপরাধের আয়” হিসেবে বিবেচিত।

অন্যদিকে, কর পরিশোধ করা বৈধ আয়ও যখন নীতিগত অনিশ্চয়তা বা বিনিয়োগ ঝুঁকির কারণে বিদেশে পাঠানো হয়, তখন তা ভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে।

ড. ওমর ফারুক বলেন, “অপরাধমূলক আয়ের ক্ষেত্রে দুই ধাপে বিচার প্রয়োজন—প্রথমে অপরাধের দায় নির্ধারণ, পরে অর্থপাচারের বিচারে যাওয়া। দুটোই দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া, কারণ দেশ-বিদেশে তথ্য সংগ্রহ ও আইনি সহযোগিতা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ।”

বৈধ আয় ফেরানোর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, “সরকার যদি শুধু শাস্তিমূলক বা অর্থপাচারবিরোধী ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে, তবে তা কার্যকর হবে না। কারণ এসব প্রক্রিয়ায় মানুষের আস্থা নেই, নীতিতে অনিশ্চয়তা আছে, বিনিয়োগের নিরাপত্তাও নেই।”

তিনি বৈধ আয় ফেরাতে কর রেয়াত, নিরাপদ বিনিয়োগ চ্যানেল এবং আর্থিক গোপনীয়তা নিশ্চিত করার মতো প্রণোদনা নীতির পরামর্শ দেন।

তার মতে, এসব প্রণোদনা না থাকলে বৈধ আয় ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরবে না।

তার মতে, নীতিনির্ধারকদের উচিত পাচার হওয়া অর্থের ধরন অনুযায়ী পৃথক নীতি গ্রহণ করা—সঅপরাধমূলক আয়ের ক্ষেত্রে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও সম্পদ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা। বৈধ আয়ের ক্ষেত্রে আস্থা বাড়ানো, প্রণোদনা দেওয়া এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “বিভিন্ন সময়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া তাৎক্ষণিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে করদাতাদের নিরুৎসাহিত করবে। এটি দ্রুত বন্ধ করা উচিত; না হলে মানুষের কর না দেওয়ার প্রবণতা বাড়বে।”

পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা যেমন জরুরি, তেমনি কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

Comments

0 total

Be the first to comment.

এনবিআরের ৫৫৫ কর্মকর্তাকে বদলি BanglaTribune | অর্থ-বাণিজ্য

এনবিআরের ৫৫৫ কর্মকর্তাকে বদলি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একযোগে ৫৫৫ সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়ন করেছে।মঙ্গলবার (১৬ সেপ...

Sep 16, 2025
শিগগিরই ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট সিস্টেম চালু করবে বাংলাদেশ ব্যাংক BanglaTribune | অর্থ-বাণিজ্য

শিগগিরই ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট সিস্টেম চালু করবে বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক শিগগিরই একটি ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা...

Sep 15, 2025

More from this User

View all posts by admin