ইসলামি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও শরিয়াহ নীতির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ড (এসএবি) গঠনের নীতিমালা অনুমোদন করেছে। “বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ডের (এসএবি) গঠন, সদস্য নিয়োগ-অপসারণ ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কিত নীতিমালা–২০২৫” শিরোনামে প্রণীত এ নীতিমালাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৪৪৪তম সভায় অনুমোদিত হয়।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনীয়তা
বিশ্বের বহু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যেমন- মালয়েশিয়া, বাহরাইন, ওমান, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল বা বোর্ড বিদ্যমান। তেমনই বাংলাদেশেও ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল, শক্তিশালী ও সময়োপযোগী করতে একটি দক্ষ এসএবি গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ইসলামি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং শরিয়াহভিত্তিক অর্থ-শিল্প সম্পর্কিত “সন্দেহযুক্ত বিষয়’’ নিষ্পত্তি, মানদণ্ড নির্ধারণ, নতুন প্রডাক্টের শরিয়াহ যাচাই ও প্রয়োজনীয় রেজুলেশন প্রদানে এ বোর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ ২০২৫”-এর অনুচ্ছেদ ১৬ অনুযায়ী ইসলামি ব্যাংকগুলোর রেজুলেশনের বিষয়ে পরামর্শ দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিজস্ব শরিয়াহ বোর্ড গঠনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশে ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড প্রথম ইসলামি ব্যাংক হিসেবে লাইসেন্স পায়। বর্তমানে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক ছাড়াও ৩১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামি ব্যাংকিং শাখা বা উইন্ডোর মাধ্যমে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের ১১,৩৭২টি শাখার মধ্যে ১,৬৯৯টি শাখা পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের, ৪১টি ইসলামি ব্যাংকিং শাখা ও ৯০৫টি ইসলামি উইন্ডোর মাধ্যমে কার্যক্রম চলছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, কনভেনশনাল ব্যাংকের এসএলআর ১৩ শতাংশ এবং ইসলামি ব্যাংকের এসএলআর ৫.৫ শতাংশ, উভয় ক্ষেত্রেই সিআরআর ৪ শতাংশ।
কেন প্রয়োজন কেন্দ্রীয় শরিয়াহ বোর্ড
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ইসলামি ব্যাংকিং খাতে জনগণের সম্পৃক্ততা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে শরিয়াহ মানদণ্ড, অডিট, গভর্ন্যান্স, লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্টসহ নীতি নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই লক্ষ্যে ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বোর্ড (আইএফএসবি) এবং এএওআইএফআই-এর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে একটি শক্তিশালী এসএবি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সদস্য নিয়োগের যোগ্যতা ও মেয়াদ
নীতিমালা অনুযায়ী, গভর্নর দেশের স্বনামধন্য শরিয়াহ স্কলার ও ইসলামী শিক্ষাবিদদের নিয়ে সাত সদস্যের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ এসএবি গঠন করবেন। এর মধ্যে অন্তত পাঁচজন হতে হবে শরিয়াহ স্কলার।
সদস্যরা সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন এবং মেয়াদ শেষে কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পুনর্নিয়োগ হতে পারবেন। তবে কোনও সদস্য টানা ছয় বছর দায়িত্বে থাকলে দুই বছর বিরতি ছাড়া পুনর্নিয়োগের যোগ্য হবেন না।
যোগ্যতা হিসেবে দাওরায়ে হাদিস, কামিল, ইসলামি অর্থনীতি, ফিকহ, ইসলামি ব্যাংকিং বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী হতে হবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বা ফতোয়া বোর্ডে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা এবং ইসলামি ফাইন্যান্স বিষয়ে গবেষণা নিবন্ধ বা বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
বোর্ডের কাঠামো ও কার্যক্রম
এসএবি’র চেয়ারম্যানকে গভর্নর মনোনীত করবেন সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য। ইসলামি ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের পরিচালক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, তবে ভোটাধিকার থাকবে না।
বোর্ড বছরে অন্তত তিনটি সভা করবে এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানাতে পারবে। সদস্যদের অন্তত ৭৫ শতাংশ সভায় উপস্থিত থাকতে হবে, অন্যথায় পদ শূন্য বলে গণ্য হবে।
শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স প্রতিবেদন
প্রতি বছর এসএবি’র কার্যক্রম ও সুপারিশগুলোর ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ একটি বার্ষিক শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স প্রতিবেদন পরিচালনা পর্ষদের কাছে দাখিল করবে। পরবর্তীকালে প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
গোপনীয়তা রক্ষা
সব সদস্যকেই তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, নতুন এ নীতিমালা ইসলামি ব্যাংকিং খাতে বিশ্বাসযোগ্যতা ও জবাবদিহি বাড়াবে, শরিয়াহ অনুশাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়ে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।