আট দফা দাবি বাস্তবায়নে ১৫ দিনের সময় দিল সংগ্রাম কমিটি

আট দফা দাবি বাস্তবায়নে ১৫ দিনের সময় দিল সংগ্রাম কমিটি

যশোরের ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধ এলাকা থেকে ‘পানি সরাও, নদী বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’ দাবি সামনে রেখে গণসমাবেশ হয়েছে। রোববার বিকেলে অভয়নগর উপজেলার মশিয়াহাটী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ গণসমাবেশ হয়। ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি এ গণসমাবেশের আয়োজন করে।

গণসমাবেশ থেকে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতার সমাধানে আট দফা দাবি জানানো হয়। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এসব দাবি বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

বিকেল চারটায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে গণসমাবেশ শুরু হয়। এরপর ২০১৬ সালে ভবদহের পানি সরানোর দাবিতে আন্দোলনে পুলিশের নির্যাতনে আহত ব্যক্তিদের উত্তরীয় পরিয়ে এবং জাতীয় পতাকা হাতে দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয়।

গণসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিত বাওয়ালী। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ, যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী আবদুল হামিদ, নূরুজ্জামান সরদার, উপদেষ্টা তসলিম-উর-রহমান, সদস্যসচিব চৈতন্য কুমার পাল, সদস্য অনিল বিশ্বাস, শেখর বিশ্বাস, খুলনার রঘুনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনোজিত বাংলা, সিঙ্গিয়া বিল আন্দোলনের নেতা আবদুল মান্নান মোড়ল, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যশোরের সদস্যসচিব আবু সাঈদ, কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের নেতা আমিনুর রহমান, ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলনের নেতা জিল্লুর রহমান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যশোরের আহ্বায়ক রাশেদ খান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন তৃষা চামেলী।

বক্তারা বলেন, ৪০ বছর ধরে ভবদহ এলাকার মানুষ পানির মধ্যে বসবাস করছেন। বিলে কোনো ফসল নেই। হামলা-মামলা নিপীড়ন–নির্যাতন উপেক্ষা করে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধ মানুষ দীর্ঘ আন্দোলন–সংগ্রাম করে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জলাবদ্ধতার সমাধানে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিমধ্যে আমডাঙ্গা খাল সংস্কার, ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী খনন, ভবদহ স্লুইসগেটের ২১ ভেন্টের ১২টি গেট খুলে দেওয়া ও পর্যায়ক্রমে বিলে বিলে টাইডল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) বা জোয়ারাধার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও কিছু অসংগতি প্রকল্পসমূহের লক্ষ্য অর্জনে অন্তরায় সৃষ্টি করছে।

বক্তারা আরও বলেন, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নদী খনন করতে হবে, কোনো ঠিকাদার নিয়ে নয়। নদী খননের সঙ্গে সঙ্গে কোনো একটি বিলে টিআরএম চালু করতে হবে। তা না হলে নদী কেটে কোনো লাভ হবে না। দ্রুত সময়ে নদী ভরাট হয়ে যাবে।

গণসমাবেশ থেকে আট দফা প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ভবদহের ২১ ও ৯ ভেন্টের সব স্লুইসগেট খুলে দেওয়া এবং আমডাঙা খালের জমি অধিগ্রহণ ও গেটম্যান নিয়োগ করে গেট ওঠানামার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে ২১ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে।

প্রস্তাবগুলো হলো ১. আমডাঙা খাল সংস্কারের টেন্ডার হয়ে গেলেও জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা খাল সংস্কারের কাজকে বাধাগ্রস্ত করে রেখেছে। ফলে দ্রুত জমি অধিগ্রহণের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

২. আমডাঙা খালের স্লুইসগেটের গেটম্যান নেই। গেট ওঠানামা করানো হচ্ছে না। ফলে যে পরিমাণ পানিনিষ্কাশিত হতে পারত, তা হতে পারছে না। এ মুহূর্তে গেটম্যান নিয়োগ ও গেট ওঠা-নামানোর বন্দোবস্ত করতে হবে।

৩. ২০১২ সাল থেকে কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের চক্রান্ত ও তৎকালীন সরকারের গণবিরোধী নীতির কারণে ভবদহ স্লুইসগেটের ২১-ভেন্ট ও ৯-ভেন্ট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে রাখায় ভবদহ স্লুইসগেট থেকে বড় আউড়িয়া মোহনা পর্যন্ত ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে গিয়েছিল এবং নদী কাটার নামে লুটপাটের কারণে জলবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। বর্তমানে ২১-ভেন্টের ১২টি গেট খুলে দেওয়ায় প্রবল পানিপ্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে এবং দ্রুত পানি নেমে যাচ্ছে। এ মৌসুমে বিলের উল্লেখযোগ্য অংশে ফসল করার জন্য এখনই ২১-ভেন্ট এবং ৯-ভেন্টের সব গেট খুলে দিতে হবে। টেকা ব্রিজের সংস্কারকাজে বাইপাস সড়কে সংকীর্ণ সেতু পানিপ্রবাহে প্রবল বাধার সৃষ্টি করছে। এলজিইডি কর্তৃপক্ষকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তারা সেটি প্রশস্ত করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করছে না। অবিলম্বে এই সংকীর্ণ কাঠের সেতু অপসারণ করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

৪. এ অঞ্চলে নদী কাটার ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কাজের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী খনন ঠিকাদারদের মাধ্যমে নয়, সেনাবাহিনীর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করার উদ্যোগ নিতে হবে। নদীর সম্পদ উদ্ধার, নদীতট আইন বাস্তবায়ন, অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও খননের মাটি নদীতটের বাইরে ফেলতে হবে। সব সংস্কারকাজে স্থানীয় শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. নদী খননের পাশাপাশি যুগপৎ টিআরএম চালুর উদ্যোগ নিতে হবে, তা না হলে নদী খননের সুফল পাওয়া যাবে না। নদী আবার ভরাট হয়ে যাবে।

৬. এলাকার বিলে বিলে পর্যায়ক্রমে টিআরএম বাস্তবায়নের উদ্যোগকে দ্রুততর করতে হবে এবং তা বাস্তবায়নে যেকোনো প্রতিকূলতা নিরসনে সরকারের কঠোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

৭. মৎস্যঘের নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে, নদী-খালের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করতে হবে এবং উজানে নদী সংযোগের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

৮. ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর ভবদহ আন্দোলনের নারী-পুরুষের ওপর নওয়াপাড়ায় হামলাকারী পুলিশ কর্মকর্তা এবং জলাবদ্ধতা জিইয়ে রাখার জন্য কায়েমি স্বার্থবাদী মহল ও সংশ্লিষ্টদের বিচার করতে হবে।

Comments

0 total

Be the first to comment.

গাজীপুরে নারীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় সাংবাদিকসহ ৪ জনকে মারধর Prothomalo | জেলা

গাজীপুরে নারীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় সাংবাদিকসহ ৪ জনকে মারধর

গাজীপুরের কাশিমপুরে এক নারীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় সাভারে কর্মরত বেসরকারি ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন...

Sep 24, 2025

More from this User

View all posts by admin