আর্থার শোপেনহাওয়ার ঊনবিংশ শতাব্দীর জার্মান দার্শনিক। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন ১৮৬০ সালে, ৭২ বছর বয়সে। দিনটি ছিল ২১ সেপ্টেম্বর। মৃত্যুর ১৬৫ বছর পরও এই দার্শনিককে মনে করতে হচ্ছে তাঁর একটা বড় কাজ, একটা গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের জন্য। বইটার নাম ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাজ উইল অ্যান্ড রিপ্রেজেন্টেশন’। তাঁর এ কাজ আমাদের মানবজীবনের দুঃখ, বাসনা আর বিভ্রান্তিকে এক গভীর ও সাহসী ভাষায় তুলে ধরেছিল জনতার মঞ্চে। আর এ কাজের পেছনের মানুষটা ছিলেন মহামতি গৌতম বুদ্ধ।
পশ্চিমের প্রথম সারির দার্শনিকদের ভেতর শোপেনহাওয়ারই প্রথম বুদ্ধের প্রতি আগ্রহী হয়েছিলেন। তিনি অনেকটা বৌদ্ধচিন্তার মতোই মানুষকে শেখাতে চেয়েছিলেন কষ্টের উৎস চিহ্নিত করে তা থেকে মুক্তির পথ খোঁজার কৌশল।
অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শোপেনহাওয়ারকে যেমন ‘খটমটে’ করে পড়ানো হয়, তাতে তাঁর মুক্তির পথ বরাবরই রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ তিনি এমন একজন চিন্তক, যিনি বুদ্ধের মতোই ভক্ত, শিষ্য, এমনকি আশ্রম পাওয়ারও যোগ্য ছিলেন। তাঁর দর্শন বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য বিদ্যালয়, শিল্পকর্ম কিংবা আশ্রম গড়ে ওঠাও অস্বাভাবিক হতো না। কিন্তু তেমনটা
শোপেনহাওয়ার তাঁর দর্শনের সূচনা করেছিলেন আমাদের ভেতরের এক মৌলিক শক্তিকে চিহ্নিত করে, যার নাম জার্মান ভাষায় তিনি দিয়েছিলেন ‘ডেয়ার ভিলে জুম লেবেন’, ইংরেজিতে যা দাঁড়ায় ‘দ্য উইল টু লাইফ’ হিসেবে। বাংলায় জুতসই শব্দার্থ আমি পাইনি এই নাম অনুবাদ করার ক্ষেত্রে। লেখার বাকি অংশে একে ‘ইচ্ছাশক্তি’ হিসবে উপস্থাপন করব।
যুক্তি, নীতি বা নৈতিকতা নয়, মানুষকে চালায় যে মূল শক্তি, শোপেনহাওয়ার তাকে বলেছিলেন ‘দ্য উইল টু লাইফ’।
এই ইচ্ছাশক্তি অন্ধ, বধির, কিন্তু খুব জেদি। মনের অজান্তেই এটি আমাদের টেনে নিয়ে যায় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলোর দিকে। আর সবচেয়ে প্রবলভাবে এটি আমাদের মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয় যৌনতার দিকে। কৈশোর থেকে শুরু করে সারা জীবন ধরে এই ইচ্ছাশক্তি আমাদের মনে দোলা দেয়, আমাদের বারবার প্রেমে ফেলে, কখনো কখনো অবাক করা সব আচরণ করতে বাধ্য করে, যা হয়তো খুব সচেতনভাবে আমরা করতামই না।
শোপেনহাওয়ার প্রেমকে দেখেছিলেন এক দুর্বার প্রাকৃতিক শক্তি হিসেবে। তিনি বলেছিলেন, প্রেম কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি হলো ইচ্ছাশক্তির গভীরতম প্রকল্প। প্রজননের হাতিয়ার। তাঁর মতে, আমরা প্রেমে পড়ি আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করার জন্য, যদিও আমাদের চেতনায় এ কথা সচেতনভাবে থাকে না।
শোপেনহাওয়ার লিখেছিলেন, ‘প্রেমের কোলাহল, ব্যস্ততা আর তীব্রতার কারণ হলো জীবনের সবচেয়ে বড় বিষয়—পরবর্তী প্রজন্মের জন্ম ও মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।’
তবে শোপেনহাওয়ার এটাও বলেছিলেন, প্রেমে পড়ার সময় আমাদের বুদ্ধি একপ্রকার অন্ধ হয়ে যায়। কারণ, যদি সবকিছু খোলা চোখে দেখা যেত, তবে হয়তো মানুষ আর বংশবিস্তারই করত না। আগ্রহীও হতো না।
শোপেনহাওয়ারের একটি ব্যাখ্যা ছিল খুবই অভিনব। তাঁর মতে, আমরা যাঁদের প্রেমে পড়ি, তাঁরা প্রায়ই আমাদের জীবনের সুখের জন্য উপযুক্ত নন। বরং তাঁরা জিনগতভাবে আমাদের সঙ্গে এমনভাবে মেলে, যাতে আমাদের অসম্পূর্ণতা কাটিয়ে ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ সন্তান’ জন্মাতে পারে। যেমন খাটো মানুষ লম্বা মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হন, সমাজের চোখে কিছুটা ‘মেয়েলি’ দেখতে পুরুষ সাধারণত শক্তিশালী নারীর প্রতি আকৃষ্ট হন। ফলে আমাদের অচেতন ইচ্ছাশক্তি এমন মানুষ বেছে নেয়, যাদের সঙ্গে জীবনযাপন কঠিন হলেও সন্তান জিনগতভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হবে।
এ নিয়ে শোপেনহাওয়ার বলেছিলেন, ‘প্রেম এমন মানুষকে বেছে নেয়, যাঁদের সঙ্গে যৌনতা ছাড়া অন্য সব বিষয়ে আমাদের ঘৃণা, বিরক্তি বা অবজ্ঞা জন্মাতে পারে।’
মানুষকে ঠকানোর এই প্রবল ইচ্ছাশক্তির কৌশল শোপেনহাওয়ার বিশেষভাবে টের পেয়েছিলেন যৌনতার পর যে একাকিত্ব বা শূন্যতা আসে, তাতে। তিনি বলেছিলেন, ‘সহবাসের পরপরই শয়তানের হাসি শোনা যায়।’
শোপেনহাওয়ার মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তাঁর চোখে মানবজাতি হলো অত্যন্ত করুণ প্রজাতি। পশুর মতো আমরা বেঁচে থাকতে চাই, তবে যেহেতু আমরা বেশি সচেতন, তাই আমরা তাদের চেয়ে বেশি কষ্ট পাই। বাঁচার জন্য আমরা চাকরি করি, প্রেম খুঁজি, পরিবার গড়ি, আর তারপর সারা জীবন নানা দুঃখভোগ করি। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের একমাত্র জন্মগত ভুল হলো, আমরা মনে করি জীবনের উদ্দেশ্য সুখী হওয়া। এই ভুল ধারণার জন্যই আমাদের জীবনে সর্বত্র বিরোধ আর হতাশা।’
শোপেনহাওয়ার এসব দুঃখ থেকে মুক্তির দুটি সমাধান দিয়েছিলেন।
প্রথম সমাধানের কেন্দ্র আছেন ‘সাধু–সন্ন্যাসীর’ মতো বিরল মানুষেরা। তাঁরা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতো জীবনের ইচ্ছাশক্তি দমন করতে পারে। তাঁরা কামনা-বাসনা, খ্যাতি, ভোগ থেকে সরে গিয়ে নিঃসঙ্গ, সংযমী জীবন কাটায়। কিন্তু এ পথ খুব কম মানুষই বেছে নিতে পারে।
দ্বিতীয় সমাধান অবশ্য সবার নাগালের ভেতরে। তা হলো শিল্প ও দর্শনের আশ্রয় নেওয়া। থিয়েটার, কবিতা, দর্শনের বই—এসবের মাধ্যমে আমরা সাময়িকভাবে ইচ্ছাশক্তির পাগলামি থেকে মুক্তি পেতে পারি।
শোপেনহাওয়ার বলেছিলেন, শিল্পের আসল কাজ হলো মানুষকে কষ্টের সত্য দেখানো, তবে মর্যাদা ও সহানুভূতির সঙ্গে। এ জন্যই তিনি পছন্দ করতেন গ্রিক ট্র্যাজেডি, লা রোশফুকোর নীতিবাক্য বা ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক লেখা, যেখানে মানুষের স্বার্থপরতা, ভোগ, দাম্পত্যের দুঃখ সরাসরি বলা হয়েছে।
যৌবনে শোপেনহাওয়ার খ্যাতি পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। প্রেমেও বারবার ব্যর্থ হন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর লেখা পাঠক পেতে শুরু করে। জীবনের শেষ ভাগে তিনি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বসবাস করতেন এক সাদা পুডল কুকুরের সঙ্গে। কুকুরটির নাম রেখেছিলেন ‘আতমা’, যা বৌদ্ধ দর্শনের ‘বিশ্ব-আত্মা’র প্রতীক।
১৮৬০ সালে ৭২ বছর বয়সে শোপেনহাওয়ার মারা যান। তাঁর মৃত্যুর আগে ভাস্কর এলিসাবেট নে তাঁর একটি ভাস্কর্য গড়েছিলেন। ফ্রাঙ্কফুট শহরের এক জাদুঘরে রয়েছে সেই বিখ্যাত শিল্পকর্ম।
আর্থার শোপেনহাওয়ারকে পাশ্চাত্য দর্শনে নৈরাশ্যবাদের অন্যতম প্রবর্তক হিসেবে দেখেন পশ্চিমের পণ্ডিতেরা। তবে তাঁর চিন্তার উত্তরাধিকার এর চেয়ে বেশি বিস্তৃত ও গভীর। ফ্রিডরিখ নিৎশে প্রথম জীবনে শোপেনহাওয়ারকেই গুরু মেনেছিলেন। তাঁর ‘উইল টু লাইফ’ ধারণা থেকেই নিজের ‘উইল টু পাওয়ার’ দর্শন গড়েন নিৎশে। সুরকার রিচার্ড ভাগনার তাঁর নন্দনতত্ত্বে প্রভাবিত হয়ে অপেরায় শোপেনহাওয়ারীয় ট্র্যাজেডি ফুটিয়ে তোলেন। সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানবমনের অবচেতন প্রবৃত্তি ও যৌনতার শক্তি বিশ্লেষণে শোপেনহাওয়ারকে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি হিসেবে পেয়েছিলেন।
সাহিত্যক্ষেত্রে লিও তলস্তয়, ফিওদর দস্তয়েভস্কি ও থমাস মান মানুষের দুঃখ, ভোগ ও শিল্পের মুক্তি বিষয়ে তাঁর দর্শন থেকে প্রেরণা নেন। আলব্যের কাম্যুর দর্শন এবং লুডভিগ ভিটগেনস্টাইনের নৈতিকতাবিষয়ক চিন্তাতেও শোপেনহাওয়ারীয় ছাপ স্পষ্ট। ফলে দেখা যায়, দর্শন, সাহিত্য, সংগীত, মনোবিশ্লেষণ—সব ক্ষেত্রেই শোপেনহাওয়ার এক অদৃশ্য, কিন্তু শক্তিশালী সেতু গড়ে তুলেছেন মৃত্যুর পর।
বুদ্ধের মতো শোপেনহাওয়ারও আমাদের দেখাতে চেয়েছেন, জীবন আসলে সুখের জন্য বানানোই হয়নি। জীবনে দুঃখ অনিবার্য। তবে সেই দুঃখকে শিল্প, দর্শন আর আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে মর্যাদা দেওয়া যায়। তিনি ছিলেন ইউরোপের সেই দার্শনিক, যিনি বুদ্ধের মতো জীবনের কষ্টকে স্বীকার করেছিলেন এবং মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন।
তাই আজও তাঁকে মনে রাখা দরকার, শুধু একজন একাডেমিক দার্শনিক হিসেবে নয়, বরং একজন গুরু হিসেবে। ইউরোপের বুদ্ধ গুরু আর্থার শোপেনহাওয়ার।