বসন্ত এখনো আসেনি।
মানুষের ইতিহাস তার সংগ্রামেরই ইতিহাস। শোষিত-বঞ্চিত মানুষ যুগে যুগে, দেশে দেশে বিদ্রোহ করেছে। নিপীড়নের বিরুদ্ধে জমাট বেঁধেছে গণজোয়ার। তারই ধারাবাহিকতায়, ২০১০-এ যে ‘আরব বসন্ত’-র সূচনা, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তা সে দেশগুলোর মানুষের জীবনে এতটুকুও বসন্ত বাতাসের ছোঁয়া দিতে পারেনি। তারা আবারও বঞ্চিত, প্রতারিত হয়েছে সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতালোভী শাসক আর ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের কাছে। সাধারণ মানুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত বসন্তের দেখা আজও পায়নি।
আরবি ভাষাভাষী ২০টি দেশের একগুচ্ছ গল্প নিয়ে রানা আশরাফের অনুবাদে ‘আরব বসন্তের সুবাস’ বইটিতে সারাজীবন ধরে বঞ্চিত, প্রতারিত সেই সাধারণ মানুষের প্রতিদিনকার জীবনযাপন, সংগ্রাম আর তাদের সুখ-দুঃখের খতিয়ান আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
নিজের পকেটের শেষ পয়সা দিয়ে বাচ্চা একটি মেয়ের মুখে হাসি ফোটায় যে লোকটি কিংবা মৃত বাবা যে তরুণের স্বপ্নে এসে হাতে এক গোছা ফুল তুলে দিয়ে বলে, “ফুলগুলো যেন শুকিয়ে না যায়…” এই চরিত্রগুলোর মাঝে কেন যেন নিজেকেই খুঁজে পাই।
একজন ষাটোর্ধ্ব নারী, যে তার একাদশ বিবাহের আসরে বসেছে দীর্ঘ জীবনের একাকিত্ব থেকে বাঁচার আশায়, একটু ভালো থাকার আশায়, আর অন্যদিকে সাজানো-গোছানো জীবনের এক বিবাহিত তরুণী প্রশ্ন করে, “দেহবৃত্তি কি হারাম?” প্রশ্নের উত্তরে যখন আরেক নারী বলে, “বিয়ে করলে নয়” তখন পাঠকের মনে ঝড় ওঠে। বিবাহ, পরিবার আর তাতে নারীর অবস্থান নিয়ে পাঠক মনে নতুন করে ভাবনার উদয় হয়, অনেক অনেক প্রশ্নের জন্ম হয়।
দেখি, দশ বছর ধরে পাপের বোঝা বয়ে বেড়ানো অর্ধ-উন্মাদ এক মানুষকে, যে কালো বেড়াল দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে যায়, আবার নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে গলায় আঙুল দিয়ে বমি করা বালকটাকে দেখি পূর্বপুরুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে।
এরিখ মারিয়া রেমার্ক তার ‘অল কোয়ায়েট অন দা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ উপন্যাসে বলেছিলেন, “যুদ্ধের প্রথম বোমাটা পড়ে ঠিক হৃদয়ের মাঝখানে।”
তাই তো দেখি, বোমার আঘাতে ধুলোয় মিশে যাওয়া বাড়ির সামনে বুক চাপড়ে কাঁদে মা, স্তব্ধ হয়ে যুবতী শোনে তার প্রেমিকের মৃত্যুর খবর, আর গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন ১২ বছরের বোনের মৃতদেহ জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদে যুবক। তখন পাঠকের গলার ভেতরে বেদনা একটা দলা পাকিয়ে আসে, চোখের কোলে বয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা পানি।
যেই তেল আর তেলের টাকায় ঘোরে উন্নয়নের চাকা, যেই তেলের টাকায় এত বিলাস-বৈভব, সেই তেলের খনি থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত বাতাসের প্রভাবে কাশতে কাশতে ঘুম ভেঙে যায় ছোট্ট বোনটার।
এ গল্পগুলো শুধু আরবি ভাষাভাষী মানুষের নয়, এ গল্পগুলো আমাদের সবার, প্রতিটা দেশের, প্রতিটা জনপদের মানুষের। মানুষের হাসি, আনন্দ, বেদনা, কাম, ক্রোধ… তথা মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ, ভাঙা স্বপ্ন, টিকে থাকার লড়াই এবং নতুন পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষাকে অনুবাদক এমনভাবে বাংলায় উপস্থাপন করেছেন, যাতে ভিনদেশি গল্পের সৌরভও বজায় থাকে, আবার পাঠকের কাছেও সহজবোধ্য এবং হৃদয়গ্রাহী হয়।
পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হবে, এসব গল্প শুধু দূর দেশের নয়, বরং আমাদের সময় ও সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। পাঠক অনুভব করবেন, এই বেদনা বা স্বপ্ন কেবল আরব ভূখণ্ডের নয়, আমাদেরও।
চরিত্রগুলোকে দূরের মানুষ মনে হয় না। তারা যেন প্রতিদিন দেখা আমার আশপাশের মানুষ। মনে হয় তারা আমারই ভাই, বন্ধু, স্বজন।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw690a405075bf2" ) ); তবে আমি অকপটে স্বীকার করব, কোনো কোনো গল্প পড়তে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছি। গল্পের অন্তর্গত ভাব বা বক্তব্য বুঝতে বেগ পেতে হয়েছে। ভাষান্তর কালে হারিয়ে ফেলা অনুভূতিগুলোকে অনুভব করতে ব্যর্থ হয়েছি কিংবা সেটা পাঠক হিসেবে আমার দুর্বলতাও হতে পারে।
আরেকটি বিষয়, প্রতিটা গল্পের প্রথম প্রকাশের সময় উল্লেখ থাকলে, সেই দেশের সেই সময়ের মানুষের জীবন, তাদের সংগ্রাম, তাদের মনস্তত্ত্ব পাঠকের বুঝতে আরেকটু সুবিধা হতো বলে আমি মনে করি।
পড়তে পড়তে বইটি একসময় শেষ হয়, কিন্তু ভাবনার রেশ থেকে যায়। মনের কোনো এক গহিন কোণে সুরসম্রাজ্ঞী ফাইরোজ গাইতে থাকেন, “আমি জানতে চাই তোমার কাছে, আমার ভালোবাসা; আমাদের ঠিকানা কোথায়? আমরা যাচ্ছি, আমরা যাচ্ছি আর এভাবে বছরটা আমাদের ছুড়ে দিচ্ছে পরিবর্তনের সুঘ্রাণ।”
সবশেষে বলব, আমি বিশ্বাস করি, একদিন বসন্ত আসবে! কোকিল ডেকে উঠবে। গাছে গাছে নতুন পাতায় জীবনের উৎসব শুরু হবে!
মানুষ, হ্যাঁ, মানুষ নিজেই নিয়ে আসবে তার বসন্ত! কারণ, তুরস্কের কবি নাজিম হিকমত বলেছেন…
‘বাতাস আসে বাতাস যায়।চেরির একই ডাল একই ঝড়ে দুবার দোলে না।গাছে গাছে পাখির কাকলি পাখাগুলো উড়তে চায়জানালা বন্ধ; টান মেরে খুলতে হবে’
কারণ, কবি বলেছেন…
‘যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দরতা আজও আমরা দেখিনিসব থেকে সুন্দর শিশু আজও বেড়ে ওঠেনিআমাদের সব থেকে সুন্দর দিনগুলোআজও আমরা পাইনিমধুরতম যে কথা আমি তোমাকে বলতে চাইসে কথা আজও আমি বলিনি।’
মধুরতম সে কথাটি প্রিয় মানুষটিকে বলার জন্যই বসন্ত আসবে! আমরা বসন্তের প্রতীক্ষায় আছি!
আরব বসন্তের সুবাস।। রানা আশরাফ।। প্রকাশনা সংস্থা: মেরুন ফিঞ্চ।। প্রকাশক: মোমেনা জাহান সুলতানা।। প্রচ্ছদ: সজীব ওয়ার্সী।। মূল্য: ৬৫০ টাকা।