আপেল বিয়ে করেনি। তার বয়স প্রায় চল্লিশ, সে এখনো বিয়ে করেনি। বিয়ে না হওয়ার কারণ তার চামড়ার কালো রং নয় (তার রঙের অনেক মেয়ের বিয়ে হয়েছে) অথবা তার নামটিও নয়। বিয়ের ক্ষেত্রে নাম বিষয়টি সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। যাহোক, মরূদ্যানে মাঝেমধ্যে ফলের নামেও মেয়েদের নাম রাখা হয়। আপেলের বান্ধবী কলা গত বছর বিয়ে করেছে।
ভাগ্য? দুর্ঘটনা? নাকি সেটা আপেলের একগুঁয়েমি ছিল, যার জন্য সে ছাদে বিয়ের পতাকা ওড়াতে দিতে রাজি হচ্ছিল না আর এই অনিচ্ছাকে ক্রমাগত ধরে রেখেছিল? যদিও মেয়েদের প্রথম ঋতু শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির ছাদে বিয়ের পতাকা ওড়ানো মরূদ্যানের রীতি, কিন্তু আপেল সেটি করতে দিতে রাজি হয়নি। সে মিনতি করেছে, কেঁদেছে, মুখ লুকিয়ে তার বাবাকে বলেছে, ‘বাবা, দয়া করে এটা করবেন না। আমি চাই না।’ তার মা ভেবেছিল আপেল হয়তো লজ্জা পাচ্ছে যে উপত্যকার সবাই, বুড়ো ও যুবক, সবাই তার নারী হয়ে ওঠার খবরটি জেনে যাবে। তাই সে স্বামীর দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে ইঙ্গিত করেছিল; স্বামী ইশারা বুঝতে পেরেছিল ও আপেলকে নিজের মতো একা ছেড়ে দিয়েছিল।
এক মাস পরে যখন বিষয়টি প্রায় বিস্মৃত হয়েছে, তার বাবা একটি মাটিভর্তি পাত্রে একটি লাল পতাকা লাগানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু আপেল তার কাছে ছুটে গেছে, দুই চোখ থেকে অশ্রু ঝরাতে ঝরাতে বলেছে, ‘বাবা, আমি এটা চাই না।’ বাবা বিষয়টি বুঝতে পারেননি। স্পষ্ট বিভ্রান্তি নিয়ে তিনি আপেলকে জিজ্ঞেস করেছেন, ‘তুমি বলতে চাইছ তুমি বিয়ে করতে চাও না?’
আপেল যখন তার বাবার প্রশ্নের জবাব দিয়েছে, বাবা বুঝতে পারেননি সে কী বলতে চাইছে, যদিও তিনি আপেলকে বলতে শুনেছেন, ‘আমি বিয়ে করতে চাই, কিন্তু পতাকা চাই না।’ কথাগুলো বলার সময় আপেলের কান্না আরও বেড়ে গিয়েছিল।
তার বাবা হাততালি দিয়ে বললেন, ‘খোদা ছাড়া অন্য কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই।’ কিন্তু আপেল কেন এমন করছে? পতাকা ওড়ানো ছাড়া বিয়ে হওয়া কীভাবে সম্ভব হবে? আপেলের দাদি, তার মা, সব খালা-ফুফি আর এই মরূদ্যানে জন্ম নেওয়া প্রত্যেক নারীর বিয়ে হয়েছে পতাকা ওড়ানোর মাধ্যমে। তাদের কাউকে পতাকা ওড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝানো হয়নি, কিন্তু তারা নিজেদের মুখের মতোই ভালো করে জানত যে পতাকাই সম্ভবত বিয়ে হওয়ার একমাত্র উপায়। প্রকৃতপক্ষে, এই মরূদ্যানই একমাত্র জায়গা, যা তাদের মেয়েদের বিয়ের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কোনো ঘটকের ওপর নির্ভর করেনি। সেই হিন্দের ওপর তো নয়ই, যে যতগুলো মিলন ঘটিয়েছিল, তার চেয়ে বেশি বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে, আর যে ঘটক বিয়ের সময় প্রত্যেক কনে সম্পর্কে এমনভাবে গুণগান গায়, যেন তারা সর্বগুণসম্পন্নার প্রতীক; যে ঘটক বিয়ের প্রত্যেক পাত্রকে তার সময়ের উজ্জ্বল চাঁদ, একজন অশ্বারোহী হিসেবে বর্ণনা করে। মেয়েটিকে বর্ণনা করা হয় এক মোহনীয় কালো চামড়ার নিষ্পাপ পাত্রী হিসেবে, আর পাত্রের গুণ হিসেবে বলা হয় সে দশটি উটের মালিক। মরূদ্যানের পরিবারগুলো সহজেই ঘটকের এসব কথার সঙ্গে একমত হয়, আর ঘটক হিন্দ জোরালোভাবে কসম কেটে নিশ্চিত করে এসবই সত্য। বিয়ের রাতে বাইরে থেকে চিৎকার শোনা যায়। তা ছাড়া অনেক অপরিচিত মানুষ এই মরূদ্যানে আসে। তারা তাদের কাফেলা থামিয়ে দেয়, তাদের উটগুলোকে কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি খেতে ছেড়ে দেয়। অবশ্যই, এত অল্প সময়ের মধ্যে কারও মাথায় বিয়ের চিন্তা আসে না, কিন্তু উপত্যকার ছাদগুলোর ওপরে উড়তে থাকা পতাকাগুলো পুরুষদের হৃদয়কে সুড়সুড়ি দেয়, বিয়ে করতে তাদের এই মরূদ্যানে ফিরে আসতে প্রলুব্ধ করে।
নিজের বিয়ের জন্য আপেল লাল পতাকা ওড়াতে রাজি হয়নি, যদিও তার বাবা পতাকাটি একটি টিনের ক্যানের বালুতে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যে ক্যানের চকচকে শরীর মরিচা পড়ে নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। কাজটি তিনি আপেলকে না জানিয়েই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপেল আকাশের তারাদের সঙ্গে জেগে থেকে তার পতাকা পাহারা না দিয়ে একটি রাতও পার হতে দেয়নি। সে বাবার ওড়ানো পতাকা টেনে নামিয়ে ফেলছে, তারপর হাঁটু গেড়ে বাবার পায়ে চুমু খেয়েছে, কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, ‘আমি চাই না।’ তার বাবা তার প্রত্যাখ্যানের রহস্য বুঝতে পারেননি, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করলেন একটি দুর্ভাগ্য তার মেয়ে আপেলকে এই প্রজন্মের মরূদ্যানের আইবুড়ি হিসেবে বেছে নিয়েছে।
বদনাম তার মায়ের কানে ফিসফিসি করতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু কীভাবে? কারণ, মরূদ্যানের অন্য সব মেয়ের মতো আপেলও দিনে অথবা রাতে কখনো বাড়ি থেকে বের হয় না। কখনো যদি এই মেয়েরা তাদের ঘর থেকে বের হয়, তাহলে তারা বোরকায় ঢাকা থাকে, তাদের মুখ ঢাকা থাকে আর তাদের সঙ্গে কেউ না কেউ থাকে। দিন পার হতে থাকে, বাড়িতে আপেল তার বাবাকে সাহায্য করে ভেড়ার চামড়া রং করতে, কুয়ো থেকে পানি আনতে, ঝাড়ু দিতে ও রান্না করতে। এরপর সে তার তাঁতে বসে উটের পশম দিয়ে একটি মোটা গালিচা বুনতে আরম্ভ করে। আপেল নিজেকে নিয়ে ভাবে, ভাবতে থাকে কেন সে বিয়ে করা ও নিজের একটি ঘর হওয়ার তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করছে। এ ছাড়া আপেল খুব বাচ্চা ভালোবাসে, সব সময় চেয়েছে তার অনেকগুলো বাচ্চা হবে। আপেল যখন নিজের কাছে সত্যিই কারণটি জানতে চাইল, সে আবিষ্কার করল উত্তরটি আসলে খুব সহজ: একটি পতাকা ও নিজের বাড়ির ছাদে একটি বিয়ের পতাকা উড়ছে, এটি চিন্তা করলে সে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ বোধ করে। বাবাকে যখন সে এই কারণটি জানাল, তার বাবার কুঁচকে যাওয়া মুখ মসৃণ হয়ে গেল, তার মনে আশা জেগে উঠতে আরম্ভ করে। আর দেরি না করে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন, আপেলের এক ব্যাচেলর চাচার বাড়ির ছাদে পতাকা ওড়ানোর জন্য রওনা দিয়েছেন। যাওয়ার সময় খুশিমনে মেয়েকে বললেন, ‘তুমি আনন্দ করো, চিন্তা নেই, আমাদের ছাদে পতাকা উড়বে না, কিন্তু তোমার চাচার দরজায় যে পাত্র কড়া নাড়বে, তাকে এখানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’ আর আপেলকে বিস্মিত করে দিয়ে, আপেল নিজেকে আবিষ্কার করল, অবিচলভাবে সে পিতার প্রস্তাবে অসম্মতি জানাচ্ছে। এভাবে একের পর এক অসম্মতির কারণে আপেলের বিয়ের পতাকা আর ওড়ানো হয় না। এত দিনে লাল পতাকা, যেটি বিশ বছরের কম বয়সীদের জন্য ব্যবহার করা হয়, সেটি তার পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। এরপর আসে নীল পতাকা, যেটি তিরিশ বছর পর্যন্ত পাত্রীদের জন্য ব্যবহার করা যায়, আর তারপর সবশেষে আসে হলুদ পতাকা। আপেল ভাবল, ‘আল্লাহর ইচ্ছায়, আমার বিয়ে হবে নীল পতাকার ছায়ায়।’
কিন্তু আপেল তা করেনি। দিনগুলো চলে যেতে থাকে, কখনো আর ফিরবে না বলে। আপেলের বয়সের সঙ্গে নীল পতাকাও মিলিয়ে যেতে লাগল। সে ছাদের ওপর পতাকা ওড়াতে দিতে অসম্মতি জানিয়েছে। যখনই সে মরূদ্যানের মাটির ঘরগুলোর পাশ দিয়ে যায় ও রঙিন পতাকাগুলোকে বাতাসের সঙ্গে খেলতে দেখে, তখন সে মনে মনে হাসে, বলে, ‘পাগল, বোকা মেয়েগুলো!’ কিন্তু তবু আপেল সেই মেয়েটিকে হিংসা করে, যখন সে বিয়ের জন্য কোনো মেয়ের হাতে মেহেদি লাগিয়ে দেয়, যখনই সে কোনো মেয়েকে একটি রাজকন্যার মতো আসরে বসে থাকতে দেখে, তার সম্মানে সবাইকে গান গাইতে, নাচতে ও তাকে ঘিরে থাকতে দেখে। যখনই সে একটি নবজাতকের কান্না শুনতে পায়, তখনই সে দৌড়ে সেই বাড়িতে যায়, শিশুটিকে কোলে তুলে নেয়, শিশুর চোখে কাজল এঁকে দেয়, চুবচুব করে তেল মাখিয়ে দেয়, আর তার ইচ্ছা করতে থাকে, এটি যদি তার নিজের রক্তমাংসের হতো।
আপেলের বিয়ের পয়গাম নিয়ে উড়তে পারত যে লাল পতাকা, সেটি উড়ে চলে গেছে; এরপর নীলও হাতছাড়া হয়েছে, যখন সে লাফিয়ে তিরিশ পেরিয়ে গেল। যদিও আপেল এমনভাবে কাঁধ ঝাঁকায়, যেন সে মোটেই তোয়াক্কা করে না, কিন্তু এখন সে বিষণ্নতা ব্যাপারটি বুঝতে ও অনুভব করতে আরম্ভ করেছে। আগে কখনো সে বাবাকে সাহায্য করা ও ঘরের কাজ করা নিয়ে নিজেকে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখেনি। কিন্তু এখন যখন তাঁতের সামনে বসে, সে একঘেয়েমি ও বিরক্তি নিয়ে তাঁত বোনে। নিজেকে সে বারবার জিজ্ঞেস করে, ‘কেন আমি বিয়ে করতে রাজি হচ্ছি না? আমি চাই একটি স্বামী আমার মাথার মুকুট হোক, বাচ্চারা আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াক। সুন্দর পোশাক, ফিরোজা পাথর ও ভারী গালিচাগুলো আমি লুকিয়ে রেখেছি আমার বিয়ের দিনের জন্য।’ আপেল মুখ ঘুরিয়ে তাকায়, বসার ঘরের দেয়ালে খেজুরগাছের একটি ডালের ছায়া দেখতে পেল। নামাজের কাপড়ের পাশে রাখা তার মায়ের পোশাকটি দেখতে পেয়েছে। আর হঠাৎ, সে যা দেখতে পেয়েছে, তার জন্য তার হৃদয় আর্দ্রতায় কোমল হয়ে গেল, সে অনুভব করল এবার সে উত্তরটি খুঁজে পেয়েছে। কণ্ঠস্বর উঁচু করে বলল, ‘আমি এই মরূদ্যান ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না।’ সে তার বাবার কাছে ছুটে গেল, বলল, ‘আমি আপনাকে অথবা এই মরূদ্যান ছেড়ে যেতে চাই না।’
মেয়ের কথা শুনে এত দিনে তার বাবার মুখ থেকে দুশ্চিন্তার বলিরেখাগুলো মিলিয়ে গেল, বললেন, ‘আপেল, খোদা রহমত দান করুন, তুমি যেন কোনো দিন আমার চোখের সীমানা ছেড়ে চলে না যাও। তোমাকে বিয়ে করতে আসা লোকটি যদি আমাদের মরূদ্যানের বাইরের হয়, তাকে আমি তিনটি উট দেব আর তোমার জন্য আমাদের মরূদ্যানে একটি ঘর বানিয়ে দেব।’
তার বাবা উঠে দাঁড়ান, বিছানার নিচে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে আপেলের বানানো একটি তালপাতার ঝুড়ি টেনে বের করেন। ঝুড়ির ভেতর থেকে যখন হলুদ পতাকার একটি অংশ বের হয়েছে, আপেল তার বাবার কাছে দৌড়ে গেল, বাবার হাতে চুমু খেলো, আর সে কাঁদতে থাকে ও ফোঁপাতে থাকে, তার মাথা প্রায় শরীর থেকে ছিঁড়ে গিয়ে দেয়ালে আছড়ে পড়তে প্রস্তুত হয়েছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর গুঙিয়ে কাঁদতে থাকে, কারণ আবার সে পতাকা ওড়ানোর ব্যাপারে অসম্মতি প্রকাশ করেছে। কারণ, সে তার একগুঁয়েমি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারছে না।
একটি নিদ্রাহীন রাতের পরে একটি দিন এল। আপেল নিজেকে মেনে নিতে বাধ্য করেছে, সে তার বাবার কাছে ছুটে গিয়েছিল তাকে খবরটি জানাতে। কারণ, তার বাবার কুঁচকে যাওয়া মুখমণ্ডলে যে দুঃখ ও যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠেছিল, সেটি দেখে তার মনে মায়া জেগেছিল। কিন্তু যখনই সে তার বুড়ো বাবার কাঁপতে থাকা হাতে হলুদ পতাকাটি দেখেছে, তখনই সে বাবার পায়ে পড়ে গেছে, সে আবারও ক্ষমা চেয়েছে আর আবারও সে পতাকা ওড়ানোর বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে।
এরপর আপেল এমনভাবে বদলে গেল, যেন সে একটি কালো রোগে আক্রান্ত হয়েছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি করে ভ্রু কুঁচকাতে আরম্ভ করেছে। সে আরও রোগা হয়ে গেছে এবং আরও দুঃখী। তার মা যখন সকালে শুভেচ্ছা জানান, তখন সে বিরক্ত হয়, আর সন্ধ্যায় যখন তার বাবা শুভেচ্ছা জানান, সে বিরক্ত হয়। কিন্তু কখনোই সে বিরক্তিকে তার অভ্যন্তরের সেতু পার হতে দেয় না।
এক সন্ধ্যায়, আপেল তাঁতে বসে ছিল, তার হাতে সুতো ধরা। নিজেকে সে আবার সেই প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করল, যা সে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ভেবে এসেছে, নিশ্বাস আটকে রেখে সে একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর এইবার, সে সত্যিকারের উত্তরটি ধরতে পেরেছে, এটি এত সহজ ছিল: আমার ভয় ছিল বাড়ির ছাদে পতাকাটি হয়তো মাসের পর মাস উড়তে থাকবে, হয়তো কেউ আসবে না; আমি পড়ে থাকব বিক্রির জন্য ফেলে রাখা খাসির মাংস অথবা পুরোনো খেজুরের মতো। আর এই প্রথমবারের মতো আপেল নিজের ভয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে সক্ষম হলো, আপনমনে বিড়বিড় করে বলল, ‘আমার বাড়ির ছাদে পতাকা ওড়ানো হলে সেটি দেখে হয়তো কেউই আসবে না। আসা–যাওয়ার পথে মরূদ্যানের সবাই পতাকা দেখবে, তারা আমার জন্য দুঃখিত হবে। কারণ, আমি একটি বিক্রির অযোগ্য পণ্য।’ আবার সে নিজেকে দোষারোপ করে, নিজের কাছে পরাজিত ও হতাশ হয়ে বলল, ‘কিন্তু এই সহজ, স্পষ্ট কারণটি খুঁজে পাওয়া এত কঠিন হলো কেন, এর জন্য আমার চল্লিশ বছর লেগে গেল?’ আপেল নিজেকে আবিষ্কার করে বিছানার নিচে ঝুঁকে পড়তে ও সাবধানে ঝুড়িটিকে টেনে বের করতে, নিশ্চিত করল তার মায়ের যেন ঘুম ভেঙে না যায়। আপেল ঝুড়ি থেকে সেই পতাকাটি বের করল, যেটি মরু অঞ্চলের কোনো বাড়িরই প্রয়োজন নেই। সিঁড়ি বেয়ে সে ছাদে উঠে গেল, যখন তার মা, বাবা ও গোটা মরূদ্যান গভীর ঘুমে নিমগ্ন। এটি হচ্ছে সেই সময়, যখন সবাই নিশ্চিত হয়ে গেছে যে বিয়ে চিরদিনের মতো আপেলকে ছেড়ে চলে গেছে। কারণ, হলুদ পতাকাও তার জন্য খুব শিগগিরই বাতিল হয়ে যাবে এবং এরপর কেউ তার জন্য বিয়ের পথ মেলে ধরবে না। আসলে, মনে হচ্ছে তেমন পরিস্থিতি এত দিনে হয়েই গেছে।
তারার আলোয় আপেল আকাশের দিকে মুখ উঁচু করেছে, খোদাকে ডেকে সাক্ষী হতে আহ্বান করছে। এরপর সে হাঁটু গেড়ে বসে পতাকাটি সঠিক স্থানে বসিয়ে দিল। এই পুরোটা সময় আপেল ভাবতে লাগল মরূদ্যানটি খুব ছোট, এখানে কেবল অল্প কয়েকটি পুরুষ আছে আর এখানে কোনো ঘটক নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপেল সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল, সে বাড়ির দরজায় টোকা পড়ার অপেক্ষায় বসে রইল।
হানান আল-শাইখ ১৯৪৫ সালের ১২ নভেম্বর লেবাননের বৈরুতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি মিসরের কায়রোতে আমেরিকান কলেজ ফর গার্লস থেকে স্নাতক হন। তারপর লেবাননের মর্যাদাপূর্ণ দৈনিক আন-নাহারে কাজ করেন। ১৯৭৫ সালে লেবাননে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে বৈরুত ত্যাগ করে সৌদি আরবে চলে যান। আরব নারীদের সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থা এবং লেবাননের গৃহযুদ্ধ তাঁর লেখার অন্যতম বিষয়।
‘আপেল নামের মেয়েটি’ লেখা হয়েছিল যুদ্ধোত্তর লেবাননী সমাজের নারীজীবনের সংকট ও আধুনিকতার দ্বন্দ্বকে সামনে রেখে। গল্পটি আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে নারীবাদী আরব সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা হিসেবে স্বীকৃত।
বর্তমানে হানান আল-শাইখ সপরিবার লন্ডনে বসবাস করছেন।
• অনুবাদ: লুনা রাহনুমা