শ্রমিকদের টানা কর্মবিরতিতে বরিশালে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অপসোনিন ফার্মার অপসো স্যালাইন লিমিটেড কারখানায় অচলাবস্থা কাটেনি। ৪৪৪ জন শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করার প্রতিবাদে গত ১ নভেম্বর থেকে এ কর্মবিরতি চলছে। শ্রমিকদের দাবি, তাদের চাকরি ফিরিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। কারখানাটির অচলাবস্থা কাটাতে গত বুধবার মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে সভা ডেকেছিল বরিশাল শ্রম অধিদফতর। কিন্তু সেখানেও বিষয়টির সমাধান হয়নি। শ্রমিকরা আন্দোলনেই আছেন।
কারখানার মালিকপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের ঘানি টেনে কোনোভাবেই লাভে যেতে না পারায় ইনজেকশন সিরিঞ্জ উৎপাদন বন্ধ করে গত ২৯ অক্টোবর ৪৪৪ শ্রমিককে ছাঁটাই করে কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে চাকরি হারানো শ্রমিকরা লাগাতার আন্দোলন করে যাচ্ছেন। শ্রমিক আন্দোলনের কারণে স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬৫ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে অপসোনিনকে। আন্দোলন আরও দীর্ঘায়িত হলে স্যালাইন উৎপাদনও বন্ধ করে সেখানে কর্মরত আরও পাঁচ শতাধিক শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেবে কর্তৃপক্ষ। এমনকি শ্রমিক আন্দোলন থেকে মুক্তি পেতে যান্ত্রিক যুগে প্রবেশেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মালিকপক্ষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পর থেকে চলা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে আছে নগরী। কাজ ফিরে পেতে প্রতিদিন দিনভর নগরের প্রধান সড়কের একটি বগুড়া রোড অবরোধ করে কারখানার সামনে বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকরা। দিন শেষে রাতভর একই কায়দায় কারখানা মালিকপক্ষের শ্রমিকরা সড়ক আটকে রাখে পাহারার নামে। এতে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন ওই সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারীরা। সড়ক অবরোধ করায় বিকল্প পথ ব্যবহারে যানজটের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও। তবে শ্রম দফতরের দাবি, আইন মেনেই শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হয়েছে। এখানে মানবিক দিক বিবেচনায় আনা হয়নি।
অচলাবস্থা কাটাতে জেলা শ্রম ক্রাইসিস প্রতিরোধ কমিটির সভায় শ্রমিকদের দুই দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় কোনও ধরনের সমাধান ছাড়াই সভা শেষ হয়। যার কারণে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন শ্রমিকরা। এ নিয় গত বুধবার বিকালে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। সভায় শ্রম অধিদফতরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান, জেলা বাসদের সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী, মহানগর বিএনপির এক নম্বর যুগ্ম আহবায়ক আফরোজা খানম নাসরিন, অপসো স্যালাইন ফার্মার পক্ষে আবু সাইদ, অনিন্দ কুমার সরকার, অপসোনিনের আইনজীবী আবু রায়হান, শ্রমিকদের পক্ষে ইমাম হোসেন খোকন, ওমর তমাল ও জাহাঙ্গীর আকন বক্তব্য রাখেন।
সভায় অপসো স্যালাইনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত তিন বছর ধরে ইউনিটটি লোকসানে রয়েছে। তাই ইউনিটটি বন্ধ রাখা হয়েছে। নগরীর জাগুয়ায় একটি কারখানা করা হচ্ছে। সেখানের ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। সেই কারখানা চালু করা হলে শ্রমিকদের কাজ দেওয়া হবে।
শ্রমিকনেতারা দাবি করেন, নোটিশ ছাড়া ৪৪৪ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। তাদের বকেয়া পাওনা দেওয়া হয়নি। তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। মানবিক দৃষ্টিতে শ্রমিকদের চাকরিতে বহালের দাবি করেন তারা। এ ছাড়া শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের একটি প্রশংসাপত্র, নতুন কারখানায় নিয়োগে অগ্রাধিকার এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য মালিকপক্ষকে বলেছি আমরা। তবে শ্রমিকরা চাকরি ফেরত পাওয়ার দাবিতে অনড় আছেন। মালিকপক্ষ বলছেন তা সম্ভব নয়। এজন্য সমাধান হয়নি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপসো স্যালাইনের এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে ওই সিরিঞ্জ উৎপাদন কারখানার কাজ শুরু হয়। ওই সময় প্রতিদিন এক কোটি সিরিঞ্জ উৎপাদন হতো। ধীরে ধীরে মেশিনের কর্মক্ষমতা কমতে থাকে। এমনকি কাঁচামালের দামও বেড়েছে। এখন মাসে ২০ লাখ সিরিঞ্জ উৎপাদন হচ্ছে না। দেশে একাধিক কোম্পানি সিরিঞ্জ উৎপাদনে চলে আসায় প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না অপসোনিন। বর্তমানে অপসোনিনের একটি সিরিঞ্জ বিক্রি করতে হয় সর্বনিম্ন ২৫ টাকায়। কিন্তু একই মানের ওই সিরিঞ্জ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে ১৫ থেকে ১৭ টাকায়। এতে অপসোনিনের উৎপাদিত সিরিঞ্জের মূল্য ২৫ টাকার নিচে বিক্রি করলে ২৫ পয়সাও লাভ থাকে না। আবার নতুনভাবে মেশিন এনে কাজ শুরু করাও সম্ভব নয়। এরপরও শ্রমিকদের কথা বিবেচনায় এনে কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন লোকসান গুনে আসছিল। কিন্তু কোনোভাবেই লাভ দূরের থাক সমান সমানও করতে পারছে না। এজন্য ওই প্রকল্প বন্ধ করে সেখানে কর্মরতদের ছাঁটাই করা হয়। শ্রম আইন মেনেই তা করা হয়েছে। শ্রম আইনে একমাসের বেতন দেওয়ার নিয়ম থাকলেও সেখানে তিন মাসের বেতন দেওয়া হচ্ছে শ্রমিকদের। অযথা আন্দোলন করছেন তারা। একটি পক্ষ তাদের স্বার্থে এ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। যেখানে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের অংশগ্রহণ খুবই কম।
তিনি বলেন, ‘আন্দোলনে বড় সমস্যা হচ্ছে স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ থাকা। স্যালাইন বিভাগে বর্তমানে সাড়ে ৫শ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। তাদের কাজে যোগদান করতে দেওয়া হচ্ছে না। এতে প্রতিদিন ৬৫ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে লোকসানের মাত্রা প্রতিদিন বাড়তে থাকবে। শেষে অপসোনিন কর্তৃপক্ষ স্যালাইন উৎপাদনও বন্ধ করে দেবে। এ ছাড়া আগামীতে সব ধরনের উৎপাদনে যান্ত্রিক যুগে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এজন্য চায়না ও জাপানের সঙ্গে কথা চলছে। শ্রমিক কমিয়ে যন্ত্রের মাধ্যমে উৎপাদন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এতে এ ধরনের আন্দোলন থেকে রক্ষা মিলবে।’
স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনের কারণে গত ১৩ দিন ধরে বিক্রি একেবারেই বন্ধ। এ মাসে কর্মচারীদের বেতন থেকে শুরু করে দোকান ভাড়া দিতে সমস্যায় পড়তে হবে। এ আন্দোলন কবে শেষ হবে তা কেউ বলছেন না। বিষয়টি জেলা প্রশাসকসহ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন তারা।
বগুড়া রোডে রয়েছে সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, অক্সফোর্ড মিশন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মল্লিকা কিন্ডারগার্টেনসহ সাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অবরোধের কারণে ওসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও স্কুলে যেতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এক শিক্ষার্থীরে অভিভাবক মোসলেহ উদ্দিন বলেন, ‘এভাবে দিনের পর দিন সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন সভ্য কোনও দেশে আছে কিনা আমার জানা নেই। আমরা এখন সবার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি। আমার ছোট মেয়েটি স্কুলে যেতে ভয় পায়। সে আন্দোলনের কারণে স্কুলে যায় না।’
ওএসএল ফার্মা লিমিটেডের শ্রমিক-কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ইমন হাসান আলী জানিয়েছেন, গত ২৯ অক্টোবর ঢাকা থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১১০০ শ্রমিকের এই কারখানার অর্ধেক শ্রমিক অর্থাৎ প্রায় পাঁচশ জনকে ছাঁটাই করা হয়। এই ছাঁটাই সম্পূর্ণ শ্রমিকবিরোধী। এ ধরনের ট্রেড ইউনিয়ন বিরোধী আচরণ শ্রম আইন অনুযায়ী অসৎ শ্রম আচরণের আওতায় পড়ে। ৫ আগস্টের পর শ্রমিক আন্দোলনের ফলে অপসোনিন গ্রুপের তিন কারখানায় সহস্রাধিক শ্রমিকের চাকরি স্থায়ী করা হয়। যাদের মধ্যে অনেকে এই ছাঁটাইয়ের আওতায় এসেছে। স্থায়ী শ্রমিকের পরিবর্তে মালিকপক্ষ অস্থায়ী শ্রমিক দিয়ে কারখানা চালাতে চান।’
বরিশাল আঞ্চলিক শ্রম দফতরের সহকারী পরিচালক শেখ মো. সেলিম আহমেদ বলেন, ‘অপসোনিন কোম্পানি সিরিঞ্জ উৎপাদনে দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের ঘানি টেনে আসছে। এ অবস্থায় তারা কোনোভাবেই লাভের মুখ না দেখায় শ্রম আইন মেনে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের ছাঁটাই করেছেন। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় বিষয়টি ঠিক হয়নি। কিছু লিকেজ তো থাকেই, তবে সে লিকেজ ধরার মতো না।’