অন্তর্বর্তী সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কারকাজ করুক, গত ১০ মাস আগেও এমনটি চাইতেন ৫৯ শতাংশ মানুষ। ১০ মাস পরে এই হার কমে দাঁড়ায় ১৯ শতাংশে—এ ধরনের তথ্যই উঠে এসেছে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) এক গবেষণায়।
আজ শনিবার রাজধানীর গুলশানে গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে এ তথ্য জানায় বিইআই। ‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জনমানুষের ভাবনা ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক এই গবেষণার সময়কাল ছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত।
গবেষণাপত্রের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন বিইআইয়ের উপপরিচালক সামিউল হক। তিনি জানান, গবেষণার জরিপে তাঁরা উত্তরদাতাদের নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন করেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১২ শতাংশ উত্তরদাতা নির্বাচনের পক্ষে মত দেয়। এই হার জুলাই ২০২৫–এ হয় ২৪ শতাংশ।
২০২৪ সালের নভেম্বরে সংস্কার ও নির্বাচনকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেয় ২৯ শতাংশ উত্তরদাতা। তবে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সংস্কার ও নির্বাচনকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেয় ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা।
গবেষণায় উত্তরদাতাদের মতামত গ্রহণ করা হয় জরিপ, আলোচনা, সংলাপ ও সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে। এতে ঢাকাসহ ১২টি জেলার ১ হাজার ৫০০ মানুষের অংশ নেন। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক ও ব্যবসায়ী সমাজ, নারী ও যুবসমাজের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মী।
অন্তর্বর্তী সরকার জন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন অনুযায়ী কতটা কাজ করতে পারছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা ‘মাঝামাঝি’ বলে মত দেয়। এ ছাড়া ২১ দশমিক ৩ শতাংশ কম, ১৭ দশমিক ২ শতাংশ অনেক কম, ২ দশমিক ৫ শতাংশ অনেক বেশি এবং ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ বেশি বলে মত দেয়।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব নয়। সফল ও টেকসই উত্তরণের জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাতারাতি সংস্কার ও পরিবর্তন আশা করাটা অতিরিক্ত হবে বলে গোলটেবিল আলোচনায় মন্তব্য করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের একজন সিনিয়র পলিটিশিয়ান বলে গেলেন যে আমরা ঈশান কোণে কালো মেঘ দেখতে পাচ্ছি। আমি কিন্তু ঈশান কোণে কোনো মেঘ দেখতে পাই না। কারণ, বাংলাদেশের যে পলিটিক্যাল কালচার, আমাদের যে নির্বাচনী হিস্ট্রি, এগুলো যদি আমরা একটু বিশ্লেষণ করি, এখান থেকে আমরা ওভারনাইট, বৈপ্লবিক পরিবর্তন আশা করাটা আমাদের জন্য অতিরিক্ত আশা করা। সে জন্য ঈশান কোণে আমি কোনো মেঘ দেখতে পাই না।’
দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয় বলে উল্লেখ করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতিতে যুক্ত করার কারণেই শিক্ষায় ধস নেমেছে। রাজনীতিতে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। শত বছর পার হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা কোনো বর্ষীয়ান বিজ্ঞানী তৈরি করতে পারিনি; বরং আমরা শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ নিয়ে গর্ব করছি।’
আলোচনায় স্বাগত ও সমাপনী বক্তব্য দেন বিইআইয়ের প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রদূত (অব.) এম হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ‘গবেষণায় আমরা আমাদের মতামত উপস্থাপন করিনি। মানুষের যেই প্রত্যাশা ও মতামত, তাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। মানুষের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা রয়েছে। তারা পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে চায়।’
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহ, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য গঠন) মনির হায়দার, গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান প্রমুখ।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা।